default-image

একটি নদ। নাম তার আন্ধারমানিক। আন্ধারে মানিকের মতোই সে নদে কয়েক কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যেই একদিন জ্বলজ্বল করবে একটি নয়, দুটি নয়, তিন-তিনটি সেতু! কিন্তু আমরা কি এখানেই থেমে যাব? মাথাপিছু সেতু নির্মাণের মতো অতুলনীয় মহাজাগতিক ধারণা কি আমরা প্রবর্তন করতে পারি না?

প্রশ্ন দুটি শুনে দন্ত বিকশিত করার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। আমরা কোনো হাসিতামাশার অবতারণা করতে আসিনি। এসেছি নতুন নতুন ভাবনার উপক্রমণিকা রচনা করতে। দয়া করে, একটু ‘সিরিয়াস’ হোন।

সেতু বিষয়ে জাতি হিসেবে আমাদের বর্তমান অগ্রগতির একটি খণ্ডচিত্র আগে দেখা যাক। প্রথম আলোপ্রকাশিত খবর অনুযায়ী, পটুয়াখালীর আন্ধারমানিক নদের ওপরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) একটি সেতু নির্মাণ করছে। সেতুটির মূল কাঠামোর নির্মাণ শেষ। কিছুদিন পরই এর ফিতা কাটা মানে উদ্বোধন করা হবে। তবে এই সেতু থেকে তিন কিলোমিটার পুবে আরেকটি সেতু নির্মাণের দরপত্র আহ্বান করেছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ)। কারণ, নতুন সেতুটি ভারী যানবাহন চলাচলের উপযোগী নয়। তাই যানবাহনের কাঙ্ক্ষিত অধিক ভার বহনের জন্য আরেকটি শক্তিশালী ও নতুন সেতু দরকার। প্রস্তাবিত সেতুটি নির্মিত হলে পটুয়াখালীর আন্ধারমানিক নদের ওপর মোট সেতুর সংখ্যা হবে ৩। সব কটি সেতু নদের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে। একবার ভেবে দেখুন তো, পাখির চোখে তিনটি সেতু দেখতে পেলে কী অপরূপ দৃশ্যের অবতারণাই না হবে! তখন তো ঠিকই ছবি তুলে ভরিয়ে দেবেন ফেসবুকের দেয়াল।

যদিও বলা হচ্ছে, দুই সরকারি দপ্তরের কাজে সমন্বয়ের অভাব এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চাহিদা শুনেও কানে না তোলার গাফিলতির মাশুল দিতে হচ্ছে ৭৩৫ কোটি টাকা। অঙ্কটা দেখে ও শুনে আপনাদের কাছে অনেক বড় মনে হতে পারে। কিন্তু একবার ভেবে দেখুন, এক নদের ওপর ১০ কিলোমিটারের মধ্যে তিনটি সেতু নির্মাণের পর যে অপরূপ দৃশ্যের অবতারণা হবে, তার শৈল্পিক মূল্য কি শত শত কোটি টাকার চেয়ে কম কিছু?

বিজ্ঞাপন
আপনি ভাবতে পারেন যে এটি ছিল জনগণের টাকা। হ্যাঁ, তা ভাবতেই পারেন। ভাবনায় তো আর ট্যাক্স বসেনি এখনো। কিন্তু এমন অদ্ভুত ভাবনার বিপরীতে বলি, এই ভাষার মাসে বাংলা ব্যাকরণে একটু নজর দিন।

এমন যুক্তিতে যদি বিরক্ত বোধ করেন, তবে আমাকে বলতেই হচ্ছে যে আপনারা শিল্পের সমঝদার নন। এ কারণেই এ দেশে শিল্পের কদর হয় না। পরপর তিন সেতু একটি অতীব উচ্চমানের শিল্পকর্ম। আর তাতে কিছু বেশি বেশি টাকা খরচ হতেই পারে। এর পেছনে সরকারকে আপনার দেওয়া কিছু অর্থেরই তো ব্যবহার হচ্ছে, আর তো কিছু না, নাকি? কিন্তু এলজিইডি ও সওজের কর্মকর্তারা যে মাথার ঘাম নদে ফেলে সম্পূর্ণ সমন্বয়হীনতার একটি নাটক মঞ্চস্থ করে এক মনোলোভা শিল্পকর্মকে নিজেদের মেধা ও মননের বিনিময়ে এ দেশের বুকে ফুটিয়ে তুলছেন, সেটির কি কোনো মূল্য নেই? একটু কৃতজ্ঞতা প্রকাশে বাধা কোথায়?

নাতিশীতোষ্ণ মস্তিষ্কে ভাবুন একবার। এক সেতুতে সাইকেল, মোটরসাইকেল, ছোট গাড়ি বা রিকশার মতো হালকা যান চলছে; আরেকটিতে চলছে ভারী ভারী যান। আরেকটিতে হয়তো একদিন মহাকাশযান চলবে! হয়তো ইলন মাস্কের স্পেসএক্স এসে তাদের মহাকাশযানের জন্য জায়গা বরাদ্দ নেবে আমাদের তৈরি নতুন কোনো শৈল্পিক সেতুতে! ইশ্, ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিচ্ছে, রোমকূপে জাগছে শিহরণ!

অথচ কেউ কেউ বলছেন, এটি রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়। এমন কথার মানে হয়?

আপনি ভাবতে পারেন যে এটি ছিল জনগণের টাকা। হ্যাঁ, তা ভাবতেই পারেন। ভাবনায় তো আর ট্যাক্স বসেনি এখনো। কিন্তু এমন অদ্ভুত ভাবনার বিপরীতে বলি, এই ভাষার মাসে বাংলা ব্যাকরণে একটু নজর দিন। সম্প্রদান কারক আরেকবার পড়ুন। যাকে স্বত্ব ত্যাগ করে কিছু দেওয়া হয়, তাই সম্প্রদান কারক। তা বাপু, স্বত্ব যখন ত্যাগই করছেন, তখন আবার হিসাব চাওয়া কেন?

এই রে, ভুরু কোঁচকাচ্ছেন নাকি? স্বত্ব ত্যাগ করে দেননি? ছি, খুব অন্যায় করেছেন। এমন ভুল আর করবেন না। অযথা সাহসও দেখাতে যাবেন না। বাংলা প্রবাদেই কিন্তু আছে, ‘অতি বাড় বেড়ো না, ঝরে পড়ে যাবে...’। সুতরাং, সাধু-অসাধু, সবাই সাবধান!

এর চেয়ে বরং আসুন, মাথাপিছু সেতু নির্মাণের দাবিতে এককাট্টা হই। শিল্পী পথিক নবী একদা গেয়েছিলেন, ‘আমার একটা নদী ছিল...’। আমাদের না হয় একটা সেতুই হলো! উন্নয়নের মহাসড়কে বাদাম খেতে খেতে দুর্নিবার বেগে এগিয়ে যাওয়ার এ সময়ে এই চাওয়া কি খুব বেশি কিছু?

একটু থামুন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন