default-image

দুর্ভাগ্যবশত প্রফেসর কুগেলমাসের দ্বিতীয় বিয়েটাও সুখের হলো না।

‘আমি নতুন কাউকে চাই, আমার চাই প্রেম, রোমান্স।’ ব্যক্তিগত মনোচিকিৎসককে বললেন কুগেলমাস।

‘দেখুন, এতে আপনার সমস্যা বাড়বে বৈ কমবে না। আমি তো আর জাদুকর নই, চিকিৎসক। আপনার সমস্যাগুলো খুলে বলুন। তারপর দেখি দুজন মিলে কোনো সমাধান বের করতে পারি কি না।’

‘তাহলে জাদুকরই খুঁজে বের করি গে।’ বলে ডাক্তারের চেম্বার থেকে বেরিয়ে গেলেন কুগেলমাস।

কদিন পরেই প্রফেসরের বাড়িতে ফোন এল, ‘হ্যালো, কুগেলমাস! আমি পার্সকি দ্য গ্রেট।’

‘কে?’

‘আপনি নাকি জীবনে রোমান্স আনতে একজন জাদুকরকে খুঁজছেন?’

‘হুঁশ্শ্! আস্তে।’

পরদিনই কুগেলমাস ব্রুকলিনের একটি ভাঙাচোরা বাড়িতে উপস্থিত হলেন। বেঁটে, চিকনমতো একটা লোক তাঁকে অভ্যর্থনা জানাল।

‘আসুন, কুগেলমাস, আমিই পার্সকি। বসুন। চা খাবেন?’

‘না। আমার চাই ভালোবাসা।’

একটু পরেই পার্সকি একটা সস্তা কাঠের আলমারি নিয়ে এল। বলল, ‘ঢুকে পড়ুন।’

‘মানে?’

‘আমি যদি এই আলমারির ভেতর একটি উপন্যাসসহ আপনাকে আটকে আলমারিতে তিনটি টোকা দিই, আপনি বইটির মধ্যে ঢুকে যাবেন।’

‘পাগল নাকি?’ অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে বললেন কুগেলমাস।

‘সত্যি বলছি। কাকে চাই আপনার? ওফেলিয়া? টেম্পল ড্রেক নাকি “ওয়ার অ্যান্ড পিস”-এর নাটালিয়া?’

‘এমা বোভারি। ফ্লোবার্টের উপন্যাসের নায়িকা।’

default-image

‘ওকে!’

কিছুক্ষণ পরেই কুগেলমাস পৌঁছে গেলেন এমা বোভারির বাড়ি। সামনে দাঁড়ানো অনিন্দ্যসুন্দরী এমা অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তাঁর দিকে।

‘তুমি কে?’

‘আমি সিডনি কুগেলমাস। সিটি কলেজের প্রফেসর।’

এমা ও কুগেলমাস ওয়াইন পান করলেন। তারপর দুজন ঘুরতে বেরোলেন ফ্রান্সের গ্রামাঞ্চলে।

‘আমি জানতাম কেউ আসবে, এই ডাহা গেঁয়ো জীবন থেকে উদ্ধার করবে আমাকে।’ কুগেলমাসের হাত ধরে বলল এমা।

বাড়ি ফিরে এমাকে গভীরভাবে চুমু খেলেন কুগেলমাস। তারপর এমার গাল দুটো ধরে হঠাৎ চেঁচিয়ে বললেন, ‘পার্সকি, আমাকে সাড়ে তিনটায় বাড়ি ফিরতে হবে।’

পরক্ষণেই কুগেলমাস ফিরে এলেন ব্রুকলিনে।

‘কি, বলেছিলাম না?’ বিজয়ীর হাসি হেসে বলল পার্সকি।

এরপর প্রায় প্রতিদিনই পার্সকির জাদুর আলমারিতে ঢুকে এমার সঙ্গে সময় কাটাতে লাগলেন কুগেলমাস।

‘আচ্ছা, পার্সকি, এমাকে বাইরে নিয়ে আসা যায় না?’

‘ভেবে দেখি।’

তারপর একদিন কুগেলমাস তাঁর স্ত্রীকে বললেন, ‘বোস্টনে আমার একটা সেমিনার আছে। সোমবার ফিরব।’

পার্সকির কথামতো এমা ও কুগেলমাস একে অন্যকে জড়িয়ে চোখ বন্ধ করে ১০ পর্যন্ত গুনলেন। চোখ খুলেই তাঁরা নিজেদের আবিষ্কার করলেন একটি হোটেলের সামনে যেখানে কুগেলমাস আগেই রুম ভাড়া করে রেখেছিলেন।

খুশিতে চকচক করে উঠল এমার দুচোখ, ‘কী সুন্দর! ঠিক যেমনটি আমি স্বপ্নে দেখতাম। অ্যাই, চলো না, আমাকে শহরটা ঘুরে দেখাও।’

default-image

সারাটা উইকএন্ড দুজন একসঙ্গে ঘুরলেন, শপিং করলেন, ডিনার খেলেন দামি রেস্তোরাঁয়।

নতুন জামা-জুতোর বাক্সপেটরা নিয়ে, কুগেলমাসকে চুমু খেয়ে এমা ঢুকল জাদুর আলমারিতে। কিন্তু পার্সকি তিনবার টোকা দেওয়ার পরও এমা দাঁড়িয়ে রইল। পার্সকি আরও জোরে টোকা দিল, কিন্তু এমা উধাও হলো না।

‘বুঝতে পারছি না কোথায় গলদ হচ্ছে।’ মাথা চুলকে বলল পার্সকি, ‘তুমি আপাতত ওকে নিয়ে যাও। আমি পরে ভেবে বের করছি।’

কুগেলমাস এমাকে হোটেলে রেখে বাড়ি ফিরে গেলেন। পরের শুক্রবার স্ত্রীকে আরেকটি সেমিনারের কথা বলে কুগেলমাস গেলেন এমার কাছে। তাঁকে দেখেই কেঁদে উঠল এমা। ‘হয় আমাকে বিয়ে করো নয়তো বইয়ের ভেতর ফেরত পাঠাও। সারা দিন বসে টিভি দেখতে ভাল্লাগে না। সিনেমার এক পরিচালকের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে। সে বলেছে, তার পরের সিনেমায় আমাকে নেবে।’

দুপুরেই কুগেলমাস ছুটলেন পার্সকির কাছে।

‘কিছু একটা করো জলদি। হোটেলের বিল তো মনে হচ্ছে একটা দেশের বাজেট। এভাবে আর কত দিন চলব বউয়ের কাছ থেকে পালিয়ে? তার ওপর সাহিত্যের এক শিক্ষক ক্লাসে পড়াতে গিয়ে উপন্যাসে আমার আসা-যাওয়া টের পেয়ে গেছে। আমাকে হুমকি দিচ্ছে, আমার বউকে বলে দেবে।’ ডুকরে কেঁদে উঠলেন কুগেলমাস।

‘কান মলেছি। আর কোনো দিন বউকে ঠকাব না।’ জোরে নিঃশ্বাস ফেলে বললেন কুগেলমাস।

কদিন বাদে পার্সকি ফোন করল কুগেলমাসের কাছে, ‘এমাকে নিয়ে এসো। আলমারি ঠিক হয়ে গেছে।’

কোনো ঝামেলা ছাড়াই এমা বিদায় নিল। কোনা চুম্বন ছাড়াই, কিন্তু কুগেলমাসের দেওয়া উপহারগুলো নিতে ভুলল না।

‘কান মলেছি। আর কোনো দিন বউকে ঠকাব না।’ জোরে নিঃশ্বাস ফেলে বললেন কুগেলমাস।

তিন সপ্তাহ পরেই কুগেলমাস আবার হাজির পার্সকির বাড়ি।

‘দোস্ত, আর একবার। “পোর্টনয়স কমপ্লেন” বইটা তো তুমি পড়েছ, তাই না?’

‘২৫ ডলার লাগবে। আরও বেশি নিতাম। কিন্তু গতবারের হয়রানির কারণে কিছু কম রাখছি। আমার কিন্তু অনেক দিন প্র্যাকটিস নেই।’

‘তুমি অনেক ভালো।’ বলে আলমারিতে ঢুকলেন কুগেলমাস।

আলমারিটা বন্ধ করে ‘পোর্টনয়স কমপ্লেন’-এর একটা কপি ওপরে ছুড়ে মারল পার্সকি। সঙ্গে সঙ্গে আলমারিটা বিকট শব্দে ফেটে পড়ল এবং পার্সকি সেখানেই অক্কা পেল। কুগেলমাস জানতেই পারলেন না কী ঘটেছে। অনেকক্ষণ পর তিনি বুঝলেন, তিনি আসলে ‘পোর্টনয়স কমপ্লেন’ বা অন্য কোনো উপন্যাসে নয়, বরং স্প্যানিশ ব্যাকরণের একটি বইয়ের ভেতরে আটকা পড়েছেন।

ইংরেজি থেকে অনূদিত

উডি অ্যালেন: মার্কিন চলচ্চিত্র নির্মাতা, লেখক ও অভিনয়শিল্পী (জন্ম: ১৯৩৫)

বিজ্ঞাপন
একটু থামুন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন