এ কী করলেন রিয়াদ!

আঁকা: রাজীব

আপনারা আমাকে চিনবেন না (কী করে চিনবেন, বলুন? আমি নিজেই মাঝেমধ্যে চিনতে পারি না আমাকে), আমার নাম রিয়াদ। অপরিচিত মানুষের দেওয়া খাবার খাবেন না—এমন নিষেধাজ্ঞা বিভিন্ন স্থানে দেখা যায়, তবে অপরিচিত মানুষের গল্প শুনবেন না, এমন সাইনবোর্ড কোথাও নেই। তাই আপনাদের গল্পটা বলছি।

একটু আগে স্বেচ্ছায় বিপদ ডেকে এনেছি আমি (সেটা কী তা পরে জানতে পারবেন)। এবং এখন টের পাচ্ছি বিপদ একা আসেনি, তার মিউচুয়াল ফ্রেন্ডদেরও ডেকে আনছে। ভিতু মানুষ হিসেবে বেশ সুখ্যাতি আছে আমার। এতগুলো বিপদ দেখে ভয়টা যেন বেড়ে গেছে আরও। আমার বান্ধবী তরু (যদিও তাকে বান্ধবী বলা ঠিক হচ্ছে কি না, সে ব্যাপারে সন্দেহ আছে) কোথায় আমাকে সান্ত্বনা দেবে, তা না। বাদাম খেতে খেতে বলল, ‘মুখটা তেলাপিয়া মাছের মতো বানিয়ে রেখেছিস কেন! বল তো, কোন তিনটি কারণে তোর মুখে হাসি নেই?’

অনলাইন নিউজ পড়ে তরুর ভাষাও হয়ে গেছে ওই রকম। সহজভাবে ‘কী বললি তুই’ বলে না ও, ঘুরিয়ে বলবে, ‘এ কী বললি তুই (হাসিসহ)?’ ওর মুখে হাসি থাকেই, কিন্তু আমার হাসি আসবে কী করে? এমনিতেই আমি স্বল্পভাষী এবং স্বল্পহাসি। এর পেছনে আমার বাবার হাত আছে (তাঁকেই তো বেশি ভয় পাই)। হাসলেই আমার এক পাশের ভাঙা দাঁতটা বেরিয়ে আসে, যেটা বাবার হাতে চড় খেয়েই ভেঙেছিল। আমার মনে হয়, বাবার হাতটা আইনের হাতের মতোই শক্তিশালী। মনে রাখার মতোই একটা চড় দিয়েছিলেন সেদিন। অপরাধ তেমন কিছু না, বাথরুমের কল বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছিলাম। তাতেই যে আঘাত হানলেন, একেবারে ছিটকে বাড়ি খেলাম চেয়ারের কোনায়। চেয়ারের কিছু হয়নি, ভেঙেছিল শুধু দাঁতটাই। ভাঙা দাঁতের একাংশ একটা আংটির বাক্সে যত্ন করে সাজিয়ে রেখেছিল আমার বোন। কয়েক দিন আগে চোর এসে আলমারির টাকাপয়সা, গয়নার সঙ্গে সেই আংটির কৌটাটাও নিয়ে গেছে। দেশের কী অবস্থা, একটা ভাঙা দাঁতও নিরাপদে রাখা যায় না।

শুধু বাবা নয়, ভয় আমি মাকেও পাই। তবে মা আর যা-ই করুন, চড় মারেন না। তবে এখন মনে হচ্ছে তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে তরুর নাম লিপিবদ্ধ করতে হবে এই তালিকায়। কারণ, ইদানীং ওকেও ভয় পাচ্ছি আমি। একটু আগে যা করল এবং এখন যা করছে তাতে ভয় না পেয়ে উপায় কী!

আমাকে চুপচাপ থাকতে দেখে তরু আবার বলল, ‘চল, তোদের বাসায় যাই।’

এ কী বলল তরু! আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম ওর দিকে। কী একটা নিরীহ চেহারা, কিন্তু কথাবার্তা কত ভয়ংকর! কথা খুঁজে না পেয়ে বাদাম ছিলতে শুরু করলাম আমি। ধমক দিল তরু।

: এত শৈল্পিকভাবে বাদাম ছিলছিস যে মনে হচ্ছে কোনো প্রদর্শনীতে বিপুলসংখ্যক দর্শক এই বাদাম ছিলা কার্যক্রম উপভোগ করছে। ওঠ, বাসায় চল।

: বিয়ে করা পর্যন্ত কথা ছিল (বলেছিলাম না, বিপদের কথা পরে জানবেন), সেটা করেছি। বাসায় যাওয়ার কথা তো আগে বলিসনি।

: এখন বললাম। রাজনীতি আর বিয়ে, এসব ক্ষেত্রে শেষ কথা বলে কিছু নেই।

: মানে কী? বাসায় গিয়ে কী হবে?

: তোর মা-বাবার সঙ্গে দেখা করব। এমবিএ করে বাসায় জানিয়েছিস। বিয়ে করে জানাবি না কেন? তা ছাড়া আমরা তো সুপারস্টার না যে বিয়েটা গোপন করতে হবে। দুজনই বেকার। মা-বাবা ছাড়া আমাদের আর কে আছে, বল? চল চল চল।

: গিয়ে কী বলব?

: বলবি যে তুই আর আমি আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে করেছি। ও, আমি কিন্তু তাঁদের ‘আব্বু-আম্মু’ বলে ডাকব না। হুট করে অপরিচিত একজনকে ‘বাবা-মা’ ডাকা যায় নাকি?

: কী ডাকবি?

: সেটা দেখা যাবে। আমার নানি তো এতগুলো বছর ‘অ্যাই শুনছ’ বলেই কাটিয়ে দিল। ডাকাডাকি কোনো সমস্যাই না। দরকার হলে রিয়াদের আব্বু, রিয়াদের আম্মু বলে ডাকব। তোর কোনো সমস্যা?

ভিলেনের মতো হাসতে লাগল তরু। আমার মনে হলো, হাসিটা বেশ সন্দেহজনক। হিন্দি সিরিয়ালে নায়ককে চেয়ারের সঙ্গে বেঁধে রেখে ডায়লগ দেওয়ার সময় ভিলেন অনেকটা এভাবেই হাসে। ভিলেনের তো নানা মতলব থাকে, তরুর মতলবটা কী? বিয়ে করে ফেলেছি এটাই তো একটা দুঃসাহসিক ব্যাপার! এখনই সেটা গণমাধ্যমে (আমার মা ও বোন প্রত্যেকেই একেকটা স্বতন্ত্র গণমাধ্যম) জানাতে হবে কেন? লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করে একজন নিরপেক্ষ এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তির মাধ্যমে বিষয়টা না জানালে তো পারিবারিক কলহের জেরে যেকোনো কিছু ঘটতে পারে। সেদিনও পত্রিকায় দেখলাম, পারিবারিক কলহের জের ধরে পিতার হাতে পুত্র খুন! ঝুঁকি নেওয়া কি ঠিক হবে?

তরু হেসে বলল, ‘অবশ্যই ঠিক হবে।’

কী বিপদ! একে তো বোঝানোই যাচ্ছে না যে আমার মা-বাবা অত্যন্ত রাগী। না বলে বাইরে বিরিয়ানি খেয়ে বাসায় ফিরলেই মা খেপে যান। আর আমি তো বিয়ে করে বসে আছি। মাকে তবু ম্যানেজ করা যায়। মায়ের প্রধান প্রশ্ন ‘ভাত খেয়েছিস?’ এর সমাধান হলেই তিনি খুশি। চাকরি পাওয়ার পর যদি বলি, ‘মা, আমার চাকরি চলে গেছে।’ শুনে মা বলবেন, ‘বলিস কী…আচ্ছা দুপুরে ভাত খেয়েছিস তো?’

কিন্তু বাবা! তাঁকে কীভাবে বোঝাব? বাবা ভীষণ রাগী এবং তারচেয়েও বেশি কৃপণ! সামান্য পানি অপচয়ের জন্য আজও আমি দাঁত বের করে হাসতে পারি না, আর আজ বেকার হয়ে বিয়ে করে ফেলেছি! বাকি জীবনে কি আর হাসতে পারব? নাকি কবুল বলার পরে কাজিসহ তোলা সেলফিটাতেই আটকে থাকবে আমার জীবনের শেষ হাসি?

তরু উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘দ্যাখ, তুই না গেলে আমি একাই যাব। গিয়ে যদি বলি, আমরা বিয়ে করেছি কিন্তু তুই স্বীকার করার সাহস পাচ্ছিস না, তাহলে কিন্তু আরও বাজে হবে ব্যাপারটা। সুপারস্টাররাও কিন্তু পরে বিপদ ঠেকাতে পারেনি। তুই তো বেকার, সুপারস্টার না।’

আমি সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালাম। তরুকে এখন বাসমালিক সমিতির সভাপতি মনে হচ্ছে, যাঁর কথায় চালকেরা বাস ছাড়ে, আবার বন্ধও করে দেন। আর নিজেকে মনে হচ্ছে লক্করঝক্কর মার্কা লোকাল বাস। কী আর করা, আমরাও বাসে উঠে পড়লাম। কে জানে, হয়তো আমরাই প্রথম বাংলাদেশি দম্পতি, যারা বিয়ে করে লোকাল বাসে উঠে বাসায় যাচ্ছে।

বাসার দরজা খুলতেই মনে হলো বাবা, মা, বোন আমার অপেক্ষাতেই ছিল। আমি ভাঙা গলায় তরুকে দেখিয়ে বললাম, ‘মা, ও তরু। আমরা কিছুক্ষণ আগে বিয়ে করেছি।’

একটা অস্ফুট আওয়াজ বেরোল বোনের গলা থেকে। বাবা আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে রইলেন যেন তিনি বাবা নন, এক্সমেনের সাইক্লপ্‌স। এখনই তাঁর দুচোখের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাব আমি, আর সেই ছাই দিয়ে বাসন মাজবে বুয়া…হঠাৎ মা বললেন, ‘চাকরিবাকরি নাই, রোজগার নাই, নবাবজাদা বিয়ে করেছে! এখন খাবি কী?’

: ইয়ে মা, আমরা খেয়ে এসেছি…

আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই প্রচণ্ড জোরে গালের ওপর আঘাত হানল কিছু একটা। ছিটকে গিয়ে চেয়ারের সঙ্গে ধাক্কা খাওয়ার পর বুঝলাম, বাবা আবার চড় দিয়েছেন। এক বা একাধিক দাঁতও পড়েছে বোধ হয়। চোখে অন্ধকার দেখছি, ফলে নির্দিষ্ট সংখ্যা বলা যাচ্ছে না। আড়চোখে দেখলাম, বোন ঘরের দিকে ছুটল। বোধ হয় দাঁত সংরক্ষণের জন্য কৌটা আনতে গেছে। কী কপাল আমার, কোথায় দই-মিষ্টি খাব তা না, চড় খেয়ে বসে আছি। নাহ্, চড় দেওয়াটা বাবার ফ্যাশন হয়ে গেছে; চড়ফ্যাশন। আজ একটা জবাব দিতেই হবে। ঘুরে দাঁড়ালাম। বাবা ঝাড়ি দিয়ে বললেন, ‘লাইট জ্বালিয়ে ঘর লক করে রেখে গেছিস কেন গাধা? ঘর থেকে বের হওয়ার সময় লাইট নেভানোর কথা মনে থাকে না? গত মাসে বিল কত হয়েছে, জানিস?’

আমি জানতাম। কিন্তু এখন কিছুতেই মনে পড়ছে না। যে চড় খেয়েছি মনে থাকার কথাও না। তরুর দিকে এগিয়ে গেলেন বাবা। আমি ঠেকাতে গেলাম। এ কী! মাখনের মতো নরম কণ্ঠে বাবা জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কী করো, মা?’

: জি, ডেন্টাল কলেজ থেকে পাস করেছি মাত্র।

: গুড। বাসায় একজন ডেন্টিস্ট থাকা ভালো। প্রায়ই কাজে লাগে।

আমি গালে হাত দিয়ে তরুর দিকে তাকালাম। ও মুখ টিপে হাসছে! কী আশ্চর্য! আমি তো দেখি সত্যি সত্যি বিপদ ডেকে এনেছি! না না, আসলে বিপদই আমাকে ডেকে এনেছে!