default-image

গাধা নিয়ে এর আগে আমি অনেকবার লিখেছি। কেন লিখব না। সক্রেটিস বলেছেন, নো দাইসেলফ। নিউটন বলেছেন, তিনি নাকি জ্ঞানসমুদ্রের তীরে নুড়ি কুড়িয়েছেন মাত্র। কাজেই গাধা নিয়ে আমি আরও লিখব। কিন্তু এবার আর লিখতে চাইনি। পাঠক সচেতন হয়েছেন। একই বিষয় নিয়ে বারবার লিখলে তাঁরা আপত্তি তুলতেই পারেন। কিন্তু না লিখে পারলাম না। কারণ, কদিন পরই যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন। তাতে ডেমোক্র্যাটদের প্রতীক গাধা। অতএব গাধা মোটেও হেলাফেলার বিষয় নয়।

গাধারা কি হাসির পাত্র? বিজ্ঞানীরা বলেন, গাধার গাধামি নিয়ে যত গল্প প্রচলিত আছে, তার মূলে আছে গাধা সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের অভাব। গাধা প্রাগৈতিহাসিককাল থেকেই জানমাল বহন ও গাড়ি টানার কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ঘোড়ার মতো গাধারা দ্রুতগামী নয় বটে, কিন্তু তারা দীর্ঘজীবী, ঘোড়ার চেয়ে কম ব্যয়বহুল, বেশি ধৈর্যশীল, খারাপ রাস্তায় বেশি চটপটে। গাধার সমস্যা হলো, নিজের ভালোটাও সে বেশ বোঝে। গাধাকে ভয় দেখিয়ে বা জোর করে এমন রাস্তায় নিয়ে যাওয়া যাবে না, যে রাস্তায় যাওয়াটাকে গাধা নিজে মনে করে বিপজ্জনক। কিন্তু ঘোড়া এই কাজটা সহজেই করে ফেলে। আসলে গাধা যথেষ্ট বুদ্ধিমান, সতর্ক, বন্ধুবৎসল, আমুদে এবং শেখার ব্যাপারে আগ্রহী।

বিজ্ঞাপন

গাধাপুরাণ: গাধা মিসরীয় দেবতা সেথ-এর প্রতীক। গ্রিক দেবতা ডায়োনিসাসের প্রতীক গাধা। গ্রিক পুরাণে আছে, সংগীত প্রতিযোগিতায় রাজা মাইডাস অ্যাপোলোর বিরুদ্ধে ও প্যানের পক্ষে রায় দেন। তারই শাস্তি হিসেবে রাজার কান দুটো গাধার কানে পরিণত হয়।

হিব্রু বাইবেলে অনেকবার গাধার কথা উল্লেখ আছে। সুসমাচারে দেখা যায়, যিশু গাধায় চড়ে জেরুজালেমে গিয়েছিলেন। ভারতীয় গল্পে দেখা যায়, এক গাধা চিতাবাঘের পোশাক পরে হাজির হয়, কিন্তু গাধার ডাকের কারণে ধরা পড়ে যায় ও অপদস্থ হয়। ঈশপের গল্পে গাধাটি পরেছিল সিংহের পোশাক।

জার্মান প্রবাদ: গাধা সিংহের সাজে সাজতে পারে, কিন্তু তার কান দুটো সে ঢাকতে পারবে না।

ইংরেজি প্রবাদ: ঘোড়ার লেজ হওয়ার চেয়ে গাধার মাথা হওয়া ভালো।

গাধা হয়ে যে ঘর থেকে বেরিয়েছে, ঘোড়া হয়ে সে ফিরতে পারবে না।

যে ঘোড়া তোমাকে ছুড়ে ফেলে দেয়, তাতে চড়ার চেয়ে যে গাধা তোমাকে ঘরে ফিরিয়ে আনবে, তাতে চড়া ভালো।

হুমায়ুন আজাদের প্রবচন: আমরা প্রশংসা করি সিংহের, কিন্তু পছন্দ করি গর্দভকে।

গাধা নিয়ে কৌতুকগুলো আমাদের বেশির ভাগেরই জানা। যেমন—

: বাবা, গাধারা কি বিয়ে করে?

: হ্যাঁ বাবা, গাধারাই বিয়ে করে।

একটা কৌতুক পেলাম ইন্টারনেটে। একজন শপিং মলের মালিক বিজ্ঞাপন দিলেন, তিনি গাধা বিক্রি করবেন। একজন সম্ভাব্য ক্রেতার সঙ্গে তাঁর চুক্তি হলো। তিনি গাধার দাম হিসেবে ৬ হাজার টাকা নিয়ে নিলেন। গাধা হস্তান্তরের দিন দেখা গেল গাধাটা মৃত। ক্রেতা বললেন, আমি তো মৃত গাধা নেব না। বিক্রেতা বললেন, অসুবিধা নেই। ৬ হাজার টাকা আমি তোমাকে ফেরত দেব। আপাতত খরচ করে ফেলেছি। দাঁড়াও, এই মরা গাধাটা দিয়েই টাকাটা তুলে ফেলব। কী করে? আমি হলাম শপিং মার্কেটের মালিক। আমি র‌্যাফল ড্র করব। তিনি বিজ্ঞাপন দিলেন, র‌্যাফল ড্র। র‌্যাফল ড্র। র‌্যাফল ড্র। টিকিট মাত্র দুই টাকা। পুরস্কার একটা গাধা। তিনি ৪ হাজার টিকিট বিক্রি করলেন। তাঁর হাতে এল ৮ হাজার টাকা। সেখান থেকে তিনি তাঁর গাধার প্রথম ক্রেতাকে ৬ হাজার টাকা দিয়ে দিলেন। ক্রেতাটি বললেন, আপনার কোনো অসুবিধা হলো না? আপনার গাধা তো মরা। শপিং সেন্টারের মালিক বললেন, না, ৩ হাজার ৯৯ জনই কোনো আপত্তি করেননি। খালি একজন আপত্তি করেছিলেন। যিনি লটারিতে জিতেছিলেন। আমি তাঁকে তাঁর দুই টাকা ফেরত দিয়েছি।

বিজ্ঞাপন

এবার আরেকটা গল্প। একটা গাধা একটা গর্তে পড়ে গেছে। তাকে যে–ই দেখতে আসে, সে–ই তার গায়ে এক বালতি আবর্জনা ফেলে। গাধা তাতে আনন্দিত হয়ে একটা নাচ দেখায়। তাতে উৎসাহিত হয়ে আরও আরও লোক আসে। আর ময়লা ফেলে। এভাবে গর্তটা গেল ভরে। আর গাধা বেরিয়ে এল গর্ত থেকে।

গল্পের উপদেশ: জীবন সারাক্ষণই তোমার গায়ে ময়লা ছুড়ে মারছে। তোমার নীতি হবে, সেই ময়লাটা ঝেড়ে ফেলে তাতেই আনন্দ খুঁজে নেওয়া। শেষ পর্যন্ত দেখবে, তুমি গর্ত থেকে বেরিয়ে আসছ।

এই উপদেশ নিয়েই তো বেঁচে আছি। কাজেই দেখতে পাচ্ছেন, গাধাকে যত বোকা ভাবা হয়, গাধা তত বোকা নয়।

আনিসুল হক: সাংবাদিক ও সাহিত্যিক

মন্তব্য পড়ুন 0