default-image

না, না, না। আপনারা পরবর্তী যে বাক্যের কথা মনে মনে ভাবতে চাইছেন, আমি সে পথ মাড়াতেও চাইছি না। তেলের দামে আগুন কেন—সেই প্রশ্নের জবাব আমি প্রশাসনের বা অন্য কারও কাছে চাইব না। আমি বলব না যে, ‘প্রশাসন, জবাব চাই।’

আগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে জবাব চাইতে শুনেছি। কিন্তু আমজনতার অন্যতম অংশ হিসেবে আমি এখন আর কারও কাছে জবাব চাই না। হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন। ‘পাই না, তাই খাই না’ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আমি আর জবাবের আশায় থাকি না। আর কোনো বিষয়ে জবাব না চাইতে চাইতে অভ্যাসও বদলে গেছে। আর জানেনই তো, মানুষ অভ্যাসের দাস।

যাক গে। ধান ভানতে শিবের গীত গাওয়ার কোনো অর্থ নেই। তার চেয়ে বরং কারও কাছে জবাবের আশা না করে আসুন, নিজেরাই প্রশ্নের উত্তর খুঁজি। নিজে প্রশ্ন করে নিজেরাই উত্তর খুঁজে বের করার আলাদা মজা আছে। এতে নিজেকে একটি স্বাধীন ও পরিপূর্ণ সত্তা হিসেবে ভাবার কিঞ্চিৎ অবকাশ পাওয়া যায়। বাস্তবে হোক বা না হোক, কল্পনার জগতে সুপারম্যানের মতো উড়তে বা ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে আকাশ–কুসুম ভাবতে তো আর পয়সা, টাকা বা ডলার বা বিটকয়েন—কিছুই লাগে না।

এবার আসা যাক ভোজ্যতেলের দামের প্রসঙ্গে। পরিস্থিতি কেমন, তা ঝালিয়ে নেওয়া যাক। সংবাদপত্রের খবর অনুযায়ী, বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বেড়েই চলেছে। গত ১০ বছরের মধ্যে নাকি সর্বোচ্চ দাম উঠেছে। তেল আমদানি ও বাজারজাতকারী শীর্ষস্থানীয় একটি কোম্পানি গত সপ্তাহে এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) নির্ধারণ করেছে ১৪০ টাকা, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বলে জানিয়েছে বিপণনকারী। শুধু বোতলজাত সয়াবিন তেল নয়, খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দামও বলে চড়া। আর সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) বলছে, গত বছরের এ সময়ের তুলনায় সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে ১৯ থেকে ২৬ শতাংশ।

শুধু তা-ই নয়। শোনা যাচ্ছে, বিশ্ববাজারেও নাকি তেলের দাম বাড়তি। বিশ্বের অবস্থা পর্যালোচনা ও কার্যকারণ খুঁজে বের করার মতো সময় ও সাহস আমার নেই। আমি ঘরকুনো মানুষ। ঘরই আমার ‘পিতিবি’। এর চেয়ে বরং দেশের অবস্থা বিবেচনায় নেওয়া যাক।

বিজ্ঞাপন
তেলের প্রয়োজনীয়তা ও জীবনের নানা অলিগলিতে এর প্রভাব সম্পর্কে আরও অনেক উদাহরণ দেওয়া যাবে। কিন্তু এত কিছু লেখার জন্য পর্যাপ্ত সময় দরকার। তা আমার নেই। সুতরাং নিজ দায়িত্বে বুঝে নিতে হবে।

এ দেশে তেল একটি মহার্ঘ্য বস্তু। তেল ছাড়া রান্না করা অসম্ভব নয়, তবে কিছুটা কঠিন। অন্তত আমাদের জীবনাচরণ মাথায় নিলে সেটি মানতেই হবে। তেল যদি আমরা বেশি বেশি খেতে না–ই পারি, তবে অন্যদের তেল দেব কীভাবে? বাঙালি তাই তেলভক্ত। আমিও বেশ কিছুটা। মুড়িতে তেল বেশি না হলে আমার গলা শুকনো শুকনো লাগে, মুড়ি আর গলা বেয়ে নামে না। অন্যান্য খাবারের কথা না হয় পরে বলা যাবে।

মনে রাখবেন, তেল না খেলে অন্যকে সুচারুভাবে তেল মালিশ করাও সম্ভব হয় না। আর এখন চলছেই তেল মালিশের যুগ। প্রখর রোদ বা ঝিম ঝিম বৃষ্টির মধ্যে রিকশাচালক বা অটোরিকশাচালককেও কখনো কখনো তেল দিতে হয়। নইলে বিরান মরুভূমির মধ্যে পানির আশায় দাঁড়িয়ে থাকা মুসাফিরের মতো অবস্থা মেনে নিতে হবে। এমনকি পরিবারের ক্ষেত্রেও তেল গুরুত্বপূর্ণ। বেকার ছেলেমেয়েদের জন্য মাসের হাতখরচ বাগানো আটলান্টিক সাঁতরে পাড়ি দেওয়ার মতো বিষয়। সেই খরচের পরিমাণ বাড়ানো আরও দুরূহ। সত্যি করে বলুন তো, বাড়তি টাকা চাইতে গেলে মুরুব্বিদের কি পটাতে হয় না? সেক্ষেত্রে তেল কি লাগে না? আশা করি, ইতিবাচক উত্তর দেবেন।

পেশাজীবনে তেল আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কখনো কখনো জীবনরক্ষাকারী পানির চেয়েও বেশি। এ প্রসঙ্গে তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে বানরের ওপরে ওঠার গাণিতিক সমস্যাটির কথা মনে পড়ে যায়। তফাত হলো, ওই গাণিতিক সমস্যায় বানরের নিচে নামার হিসাবও কষতে হয়। কিন্তু আপনার হাতে, মুখে ও অতি অবশ্যই মাথায় যদি তেলতেলে অবস্থা বিদ্যমান থাকে, তবে আপনার নিচে নামার হিসাব নিয়ে ভাবতেই হবে না। আপনি নিশ্চিন্তে ঊর্ধ্বগামী হতে পারবেন। মহাকাশই তখন হবে আপনার সীমানা। আর যদি তা না হয়, তবে কি হতে পারে—সে বিষয়ে আমার একজন প্রিয়ভাজনেষু একটি ‘রিমিক্স’ উক্তি দিয়েছেন। তা হলো—‘ভ্রমর–ফুলে মিলন হবে; কিন্তু ফল হবে না, ফল হবে না, ফল হবে না…’!

তেলের প্রয়োজনীয়তা ও জীবনের নানা অলিগলিতে এর প্রভাব সম্পর্কে আরও অনেক উদাহরণ দেওয়া যাবে। কিন্তু এত কিছু লেখার জন্য পর্যাপ্ত সময় দরকার। তা আমার নেই। সুতরাং নিজ দায়িত্বে বুঝে নিতে হবে। বুঝুন, বুঝুন, বোঝা প্র্যাকটিস করুন।

এত আলোচনায় এটুকু স্পষ্ট যে, এ দেশে তেলের চাহিদা অনেক বেশি। পড়াশোনা যখন করতাম, তখন চাহিদাবিধির সঙ্গে কিছুটা ‘হাই–হ্যালো’ সম্পর্ক হয়েছিল। সেই বিধি অনুযায়ী, ‘অন্যান্য অবস্থা’ যদি অপরিবর্তিত থাকে, তবে কোনো নির্দিষ্ট সময়ে পণ্যের দাম কমলে তার চাহিদার পরিমাণ বেড়ে যায়। আর দাম বাড়লে চাহিদার পরিমাণ কমে যায়। তাই বলে ভাববেন না, দাম বাড়লেই এ দেশে তেলের চাহিদা কমে যাবে। কারণ ওই ‘অন্যান্য অবস্থা’। সেগুলোর মধ্যে আছে ক্রেতার অভ্যাস, পছন্দ ও রুচি। আচ্ছা, আপনারা কি মনে করেন, তেলের ব্যাপারে আমাদের পছন্দ, অভ্যাস বা রুচির কোনো পরিবর্তন হবে? এই উত্তরেই কিন্তু তেলের দাম সর্বোচ্চ হওয়ার রহস্য লুকিয়ে আছে।

সমস্যা হলো, এত কথা লিখছি ঠিকই, কিন্তু আমি আদতে ভয়ে আছি। কখন পরিবারের সদস্যরা আমাকে তেল কিনতে বাজারে পাঠায়, কে জানে! দাম শোনার পর মানিব্যাগের হাপিত্যেশে জ্ঞান ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। হয়তো ‘…আমি জ্ঞান হারাব, মরেই যাব, বাঁচাতে পারবে নাকো…’!

একটু থামুন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন