শিরোনামের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া বেশ কঠিন। বিশেষ করে এই অঞ্চলে। বিশ্বাস করুন, এই প্রশ্ন নিয়ে অনেক দিন ধরেই আমি গলদঘর্ম পরিস্থিতিতে আছি। কিন্তু কাউকে যে জিজ্ঞেস করব, তারও উপায় নেই। জিজ্ঞেস করে আবার প্যাঁচে পড়ে যাই কি না, সেই ভয় তো আছে!
নামের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয় শৈশব থেকে। মা–বাবা একটা নাম দেন আমাদের সঙ্গে পরামর্শ না করেই। ‘গ্যাদা’ অবস্থা থেকেই এ অঞ্চলের প্রতিটি শিশু তাই বঞ্চনার শিকার হয়। ‘কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন’—এমন কথা তো এমনি এমনি সৃষ্টি হয়নি। বাংলা বা ইংরেজি ব্যাকরণে আমাদের হাতেখড়ি হয় একসময়। আমরা বুঝতে শিখি নামের মাহাত্ম্য। নিজেদের নাম নিয়ে আমাদের আদিখ্যেতাও বাড়ে। সেই সঙ্গে ক্লাসের সহপাঠীদের বিকৃত নামে ডাকার একটা চলে আমরা কখনো কখনো গা ভাসাই।
তবে বয়সে বড় হতে হতে আমরা বুঝে যাই—কার নামে কী বলতে হবে, কার নামে নয়। স্কুল বা কলেজের যে শিক্ষক প্রয়োজনে আপনার মা–বাবা অবধি যেতে পারেন বা আপনাকে টিসি দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারেন, তাঁর নামে আপনি অযাচিত বিশেষণ বা বিশেষ্য পদ যুক্ত করতে ভয় পান। একই অবস্থা আপনার সহপাঠীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। নতুন নতুন নামের অত্যাচারে তারাই জর্জরিত হয়, যারা খতরনাক নয়, গোবেচারা ধরনের। এখানেও তাই ‘চাকরি’ টিকিয়ে রেখেই নাম ডাকা হয়। জীবনের সেই পর্যায়ের জন্য ‘চাকরি’ শব্দটির নানান পরিভাষা আপনি বের করে নিতে পারেন।
এবার আসা যাক পেশাগত জীবনে। ধরুন, আপনি একটা চাকরি করেন। অফিস ধরনের একটা জায়গায় নিশ্চয়ই যেতে হয়। সেখানে গিয়ে কি যারতার নাম ধরে ডাকতে পারেন? পদে বড়দের নামের আগে বা পরে সম্মানসূচক একটা কোনো বিশেষণ লাগাতে হয় কি? বসের নাম আর বেয়ারার নাম মিলে গেলে কি বেয়ারাকে নাম ধরে ডাকতে অস্বস্তিতে ভোগেন? না ভুগে তো আর উপায় নেই। আবার ধরুন, বড় কর্তার কিছু বিষয় আপনার ভালো লাগে না, কিন্তু মিটিংয়ে জীবনের মায়া অগ্রাহ্য করে কি তার প্রত্যক্ষ অনুবাদ করেন? বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিশ্চয়ই ভাবানুবাদের চর্চায় গা ভাসাতে ইচ্ছা করে! যাতে সাপও না মরে, লাঠিও না ভাঙে!
এ এক অদ্ভুত যাতনা। সাপকেও দুধ-কলা খাওয়াতে হয়, আবার লাঠিও শক্ত করতে হয়। দুটোতেই খাটুনি আছে। এত খাটুনির পেছনে কথা একটাই—নাম বললে যে চাকরি থাকবে না।
মুখে যতই আমরা ইউরোপ-আমেরিকার কথা বলি, কাজে ঠিক ততটা নয়। পেছনে যতই নিন্দামন্দ করুন, শক্তিমানের সামনে কিছু বলার সাহস আমাদের কারোরই খুব একটা নেই। তখন একটা পিচ্ছিল ভাব আমাদের মনে চলে আসে। আমাদের সৎ সাহসের সঙ্গে ন্যাপথলিনের বেশ মিল আছে, দুটোই আপনাতে উবে যায়। এটা অবশ্য দোষের কিছু নয়। ‘চাকরি’ বাঁচলে জীবন বাঁচে, তা চাকরি শব্দের যে সমার্থক শব্দই আপনার বেলায় খাটুক না কেন। তার ওপর আবার এ দেশের সর্বাধিক প্রচলিত ও আত্মস্থকৃত প্রবাদ হলো, ‘চাচা, আপন প্রাণ বাঁচা।’ আর জীবন বাঁচানো অবশ্যই পুণ্যের কাজ, নিজের হলে তো কথাই নেই।
আশা করি, এতক্ষণে বুঝে গেছেন, কেন এ দেশে নাম বললে চাকরি থাকে না। এরপরও না বুঝে থাকলে আবার স্কুলে যাওয়া শুরু করুন অথবা প্রাত্যহিক জীবনের কোনো অনিয়ম দেখে জোরসে প্রতিবাদ করতে থাকুন। জানাবোঝার ঘাটতি পূরণে এই পন্থা কাজে দিতে পারে। আমার যা মনে হয়, তা হলো—এ দেশে আসলে নাম ধরে কিছু বললেই নামের মালিক একটা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে যান। তাঁর অনুভূতি আঘাতপ্রাপ্ত হয়।
এবার ব্যক্তিগত জীবনে আসা যাক। চাইলেই কি বর্তমান প্রেমিক–প্রেমিকার সামনে প্রাক্তনের নাম নিতে পারবেন? বুকে হাত দিয়ে বলুন তো! কি, বুক ধড়ফড় করছে? ধুকপুকানি বেশি হলে আর উত্তর দিতে হবে না, বাদ দিন।
মনুষ্যজীবনের আর একটি অধ্যায়ই বাকি থাকল। তা হলো দেশ, জাতি, সরকার, রাষ্ট্র ইত্যাদি ইত্যাদি। এখানেও ‘নাম বললে চাকরি থাকবে না’ পরিস্থিতি প্রবলভাবে বিরাজমান। প্রাবল্য এতটাই বেশি যে চাপ নেওয়া যায় না আসলে। টাল খেয়ে যেতে হয়। তবে এই অনুচ্ছেদে আমি বেশি কথা বলতে চাই না। কারণ, চাকরি ও জীবন—দুই–ই আমার খুব পছন্দের। আপনাদের কিছু বোঝাতে গিয়ে তাতে আমি ছন্দপতন ঘটাতে চাই না।
আশা করি, এতক্ষণে বুঝে গেছেন, কেন এ দেশে নাম বললে চাকরি থাকে না। এরপরও না বুঝে থাকলে আবার স্কুলে যাওয়া শুরু করুন অথবা প্রাত্যহিক জীবনের কোনো অনিয়ম দেখে জোরসে প্রতিবাদ করতে থাকুন। জানাবোঝার ঘাটতি পূরণে এই পন্থা কাজে দিতে পারে।
আমার যা মনে হয়, তা হলো—এ দেশে আসলে নাম ধরে কিছু বললেই নামের মালিক একটা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে যান। তাঁর অনুভূতি আঘাতপ্রাপ্ত হয়। চুলকানি বা মাথাব্যথা—কোনো কিছুর মলমই তাতে প্রলেপ হতে পারে না। সমাজের জন্য এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি খুবই ক্ষতিকর। আর সে জন্যই নাম নেওয়া ব্যক্তির ‘চাকরি’ নিয়ে টান দেওয়া হয়। অনেকটা ‘হীরক রাজার দেশে’ সিনেমার সেই সংলাপের মতো করে বলতে হয়—‘চাকরি ধরে মারো টান, প্রজা হবে খান খান’।
এই অবস্থা আমাদের দেশে অনেক দিন ধরেই চলছে। এখন আমার ভয় হলো, আমাদের মতো অভাগাদের না আবার গণহারে ‘অনোম্যাটোফোবিয়া’ হয়ে যায়। অনোম্যাটোফোবিয়া যাদের হয়, তাদের নির্দিষ্ট শব্দ বা নামে ভীতি জন্মে যায়। ওই সব শব্দ বা নাম শুনলেই তখন ভয় পেতে থাকে ভুক্তভোগীরা। করোনা টেস্টের মতো আমাদের সবারও এই ফোবিয়ার টেস্ট করা তাই অতীব জরুরি। এতে কাদের কাদের মেরুদণ্ড লেজে পরিণত হয়েছে, সেই সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
যাহোক, অনেক কথা হলো। এখন চুপ যাই বরং। কোনোভাবে বেফাঁস নাম বা শব্দ মুখ দিয়ে বের হয়ে গেলে আমার আবার ‘চাকরি’ নিয়ে টানাটানি হতে পারে। কোনো চাচার নয়, নিজের প্রাণ বাঁচানোই আমার মূল লক্ষ্য কিনা!
আচ্ছা, আমারও কি অনোম্যাটোফোবিয়া হয়ে গেল নাকি? কে জানে!