default-image

একদিকে অ্যাপলের টিম কুক, অন্যদিকে ফেসবুকের মার্ক জাকারবার্গ। ‘প্রাইভেসি’ নিয়ে দুই প্রধান নির্বাহীর মধ্যে শীতল লড়াইটা অনেক দিনের। সে লড়াই এবার বোধ হয় চূড়ান্ত পরিণতির দিকে এগোচ্ছে।

ঘটনা হলো, শিগগিরই আইফোনের জন্য আইওএস ১৪-এর নতুন সংস্করণ ছাড়বে অ্যাপল। সে অপারেটিং সিস্টেমে নামানো কোনো অ্যাপ যদি ব্যবহারকারীর তথ্য পর্যবেক্ষণ বা ট্র্যাক করতে চায়, তবে আগে সে ব্যবহারকারীর কাছ থেকে আলাদা করে সুনির্দিষ্ট সম্মতি নিতে হবে। এটা তো স্বাভাবিক যে ব্যক্তিগত তথ্য বেহাত হওয়ার ভয়ে বেশির ভাগ ব্যবহারকারী সে সম্মতি জানাবেন না।

ডিজিটাল মাধ্যমে ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা নিয়ে যাঁরা দীর্ঘদিন ধরেই সোচ্চার, তাঁরা এখন সন্তুষ্ট হতেই পারেন। তবে পুরোপুরি সন্তুষ্ট হবেন কি না, চলুন তা নিয়ে আলোচনা করা যাক। অ্যাপলের এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি বোধ হয় ফেসবুকেরই হবে। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালসহ বেশ কিছু সংবাদপত্রে গোটা পৃষ্ঠাজুড়ে বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে দুশ্চিন্তার কথাও জানিয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমটি। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য, অ্যাপলের উদ্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের।

কীভাবে কাজ করবে অ্যাপলের হালনাগাদ

আইফোন ব্যবহারকারীরা তাঁদের মুঠোফোনে আইডেন্টিফায়ার ফর অ্যাডভার্টাইজার (আইডিএফএ) ব্লক করার অপশন পাবেন। আইডিএফএ হলো, প্রতিটি স্মার্টফোনের অনন্য নির্দেশক। এই নির্দেশক ব্যবহার করে বিপণনকারীরা বুঝতে পারেন তাঁদের প্রচারিত বিজ্ঞাপন কতটা কার্যকর হলো। অর্থাৎ, সঠিক মানুষের কাছে সঠিক বিজ্ঞাপন পৌঁছাল কি না, ব্যবহারকারী সে বিজ্ঞাপন দেখলেন কি না, ক্লিক করলেন কি না, বিজ্ঞাপন দেখে কোনো পণ্য কিনলেন কি না, তা জানা কঠিন হয়ে যাবে।

আরও সহজভাবে বললে, এখন অনলাইনে যেমন প্রতিটি মানুষের আগ্রহ ও প্রয়োজনের ওপর নির্ভর করে সুনির্দিষ্ট বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়, গুগলে বাইসাইকেল লিখে খুঁজলে ফেসবুকে বাইসাইকেলের বিজ্ঞাপন দেখায়, অ্যাপলের হালনাগাদের পর সেটা সম্ভব না-ও হতে পারে। এতে মানুষের কাছে বিজ্ঞাপন যাবে ঠিকই, তবে বিজ্ঞাপনের খরচ বেড়ে যাবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য ব্যাপারটা কঠিন তো বটেই। তখন যাঁরা বাইসাইকেল কিনতে চান, তাঁদের কাছেও বিজ্ঞাপন যাবে, যাঁদের প্রয়োজন নেই, তাঁদের কাছেও যাবে। অনেকটা রাস্তার মোড়ে বিলবোর্ড বিজ্ঞাপনের মতো।

আইওএসের হালনাগাদ নিয়ে টিম কুকের টুইট

বিজ্ঞাপন

বিপদটা ফেসবুকের যেমন, খুদে ব্যবসায়ীদেরও তেমন

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্ভাব্য গ্রাহকের কাছে পৌঁছানো এখন ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ের জন্য অপরিহার্য বলা যেতে পারে। তা ছাড়া করোনাকালে অনলাইনে কেনাকাটা বেড়েছে বলে একাধিক প্রতিবেদন পাওয়া যায়। আর কেনাকাটার কাজ এখন কম্পিউটারের চেয়ে স্মার্টফোনেই বেশি সারছেন ভোক্তারা। অ্যাপলের উদ্যোগের ফলে এই ভোক্তাদের লক্ষ্য করে ডিজিটাল মাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রচার তুলনামূলক কঠিন হবে। আবার মোবাইল গেমিং খাতের জন্যও দুঃসংবাদ। বিশেষ করে বিনা মূল্যে যে গেমগুলো খেলা যায়, সেগুলোর নির্মাতাদের আয়ের প্রধান উৎস বিজ্ঞাপন। এখন তাদের ‘ইন-অ্যাপ পারচেজ’ ব্যবসায়িক মডেলে এগোতে হবে। অর্থাৎ, খেলা যাবে বিনা মূল্যেই, তবে গেমে বিশেষ কোনো দক্ষতা বা উপাদান চাইলে তা অর্থ খরচ করতে হবে। গেমনির্মাতারা অবশ্য এরই মধ্যে সেদিকে এগোনো শুরু করে দিয়েছেন।

default-image

এদিকে ফেসবুকে ব্যবহারকারীদের শনাক্ত করার বিকল্প পদ্ধতি দেখাতে চায় অ্যাপল। অ্যাপ নির্মাতাদের নতুন একটি এপিআই ব্যবহারের জন্য উৎসাহিত করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এপিআইটি সেই ২০১৮ সালেই প্রকাশ করে তারা। সেটাতে কোনো ব্যবহারকারী বিজ্ঞাপনে ক্লিক করলে বিজ্ঞাপনদাতা জানতে পারবেন, তবে ব্যবহারকারী বা ডিভাইস-নির্দিষ্ট কোনো তথ্য তাঁরা পাবেন না। ফেসবুক যদি অ্যাপলের এপিআই ব্যবহার করতে রাজিও হয়, তবু বিশাল ঝক্কির ব্যাপার। সব অংশীদারদের নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে রাজি করাতে হবে, নতুন প্ল্যাটফর্মে আনতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, প্রতিষ্ঠান দুটির দ্বৈরথ মাথায় রেখে প্রিয় পাঠক, আপনিই বলুন, অ্যাপল কি ফেসবুককে সব তথ্য দেবে? আর অ্যাপলের কাছে এভাবে জিম্মি হতে রাজি হবে ফেসবুক? অবশ্য অ্যাপল যদি নিজ উদ্যোগ থেকে সরে না আসে, ফেসবুকের কাছে বিকল্প আর কীই–বা আছে!

সূত্র: ইনকরপোরেটেড ম্যাগাজিন

মন্তব্য করুন