default-image

করোনাভাইরাসে সংক্রমণের নানা লক্ষণ নিয়ে বহু কথা হয়ে গেছে। আক্রান্ত হওয়ার পর প্রকাশিত লক্ষণ ও আক্রান্ত হয়ে কোভিড মুক্তির পর থেকে যাওয়া প্রভাব নিয়ে রচিত হয়েছে ভূরি ভূরি লেখা। কিন্তু ভাবুন একবার, ২০২০ সালের এই মহামারি নিয়ে বিজ্ঞানী মহল সচেতন হওয়ার বহু আগেই কবির খাতায় তার তাবৎ উপসর্গ, বিশেষত কোভিড মুক্তির পরবর্তী প্রভাবগুলো সবিস্তার লেখা আছে। কেমন অহেতুক লাগছে তো? লাগুক, সবকিছুর হেতু লাগবে কেন?

সুনীলের নিখিলেশকে মনে আছে? মানে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতার সেই নিখিলেশ, যে জীবন বদল করে একটা কাণ্ড ঘটিয়েছিল। যেনতেন ব্যাপার নয়, জীবন বদল একেবারে। বাক্স বা বাসা বদল হলেও একটা কথা ছিল। বাসা বদলেই তো কত হুজ্জত থাকে, থাকে ‘ধুর ছাই’ বলে সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে গোঁজ হয়ে বসে থাকার আশঙ্কা। তবু বাসা বদলাতে হয়, জীবনের জটিল সব প্রয়োজনে। সে যাক। যার খুশি বাসা বদলাক। কিন্তু জীবন বদল? কেমন কিন্তু কিন্তু লাগে। কনডেন্সড মিল্কের চা থেকে শুরু করে হাঁটার ভঙ্গি পর্যন্ত সব তো বদলাতে হবে তবে। তবে? কেমন ঘোর লেগে যায়।

যখন দেখি, সুনীল জীবনটিবন বদলের পর হাহুতাশ করে বলছেন, ‘আমার বুকের মধ্যে হাওয়া ঘুরে ওঠে, হৃদয়কে অবহেলা করে রক্ত।’ তখনই ছলাৎ করে ওঠে বুকটা। কেমন সন্দেহ জাগে—সুনীল কি পরিকল্পিতভাবে জীবন বদলালেন তবে? এটা কি প্রকল্প কোনো? বুকের মধ্যে হাওয়া ঘুরে ওঠা সহজ কথা নয়। এই করোনাকালে ভুক্তভোগীমাত্রই জানেন, ‘বুকের মধ্যে হাওয়া ঘুরে’ ওঠা মানে কী। বুকের মধ্যে যখন মনে হয়, অজ্ঞাতে কেউ এসে হাওয়া পাম্প করে দিয়ে গেছে, তখন কী যে রাগ হয়! নিজেকে ফুটবল ভাবতে কারই-বা ভালো লাগে? কিন্তু ভালো না লাগলেও, ফুটবলের মতো গোল হতে না পারলেও কুণ্ডলী পাকিয়ে পড়ে থাকতে হয়।

বিজ্ঞাপন
কিন্তু সুনীল কি কাজটা ঠিক করেছিলেন? জীবন বদল সফল হলে তো নিখিলেশ এই সব লক্ষণ দ্বারা আক্রান্ত হয়ে যেতেন। কী হতো তবে নিখিলেশের? বন্ধু হিসেবে জেনেশুনে এই কাজ করাটা একেবারেই ঠিক হয়নি সুনীলের।

সন্দেহ আরও দানা বাঁধে যখন সুনীল বলেন, ‘নিজের দু’হাত যখন নিজেদের ইচ্ছেমতো কাজ করে, তখন মনে হয় ওরা সত্যিকারের।’ মিলল তো? প্রিয় সুনীল, আপনি কেন শুধু হাতে এসে থেমে গেলেন? পায়ের কথা কি বলতে নেই? করোনায় আক্রান্তমাত্রই জানেন হাত ও পায়ের অসাড় ও নিয়ন্ত্রণহীন অনুভূতির কথা। একটু পরপর নেড়েচেড়ে দেখতে হয়, ওরা আছে কি না। অনেকটা বুকের মতোই ব্যাপার, যা না চাইলেও হাওয়ার দমক দিয়ে বুঝিয়ে দেয়, রাগে বা অভিমানে সে ফুলে উঠেছে, রক্তের বদলে হাওয়ার সঙ্গেই মিতালি তার বেশি এখন।

সঙ্গে খেয়াল করুন, ‘আমি কী রকমভাবে বেঁচে আছি’ কবিতায় সুনীল কী রকমভাবে অনায়াস আবোলতাবোল বকছেন, ‘মৃত গাছটির পাশে উত্তরের হাওয়ায়’ মায়া দেখছেন একবার তো আরেকবার ‘দেয়ালের চুনভাঙা দাগকেও বড় প্রিয় মনে হচ্ছে’ তাঁর। এবং তাঁর মনে পড়ছে ‘পাপ ও দুঃখের কথা’। কী ভয়ানক মিল! সুনীল বলছেন, ‘আমি শ্মশানে গিয়ে মরে যাবার বদলে, মাইরি, ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।’ আহা! কষ্ট হলো খুব। সুনীল হয়তো আইসিইউর কথা বলতে গিয়ে শ্মশান বলে ফেলেছেন। এটা হতেই পারে। এ দুইয়ের মধ্যে তফাত তো শুধু একটা অপ্রত্যাশিত ঘোষণায়। কিন্তু ভাবুন একবার, কী ভয়ানক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গিয়েছেন তিনি। সংজ্ঞা হারিয়ে পড়েছিলেন সুনীল, যাকে বলছেন ঘুমিয়ে পড়া।

আর এই সব লক্ষণ ও উপসর্গের কথা উল্লেখ করে সুনীল হাহুতাশ করছেন এই বলে যে নিখিলেশের সঙ্গে জীবন বদল করে কোনো লাভ হয়নি তাঁর। যাক, এই পর্যায়ে নিখিলেশের জীবন নিয়ে কিছুটা হলেও নিঃসংশয় হওয়া গেল। কিন্তু সুনীল কি কাজটা ঠিক করেছিলেন? জীবন বদল সফল হলে তো নিখিলেশ এই সব লক্ষণ দ্বারা আক্রান্ত হয়ে যেতেন। কী হতো তবে নিখিলেশের? বন্ধু হিসেবে জেনেশুনে এই কাজ করাটা একেবারেই ঠিক হয়নি সুনীলের। নিখিলেশ যে জীবন বদলের ফেরে পড়ে আক্রান্ত হননি, তারই-বা কী নিশ্চয়তা আছে?

তা সুনীল তো একটা অপচেষ্টা করেছিলেন বোঝাই যাচ্ছে। প্রিয় কবি বলে সে না হয় ক্ষমা করা গেল। কিন্তু প্রশ্ন তো আরও বড়। এই যে করোনা ২০২০ সালের মহামারি বলে আমরা জানলাম, তার মূল যে বহু আগে প্রোথিত ছিল, তার এই সবিস্তার প্রমাণপত্রের কী হবে? কী বলবেন সবাই? নিখিলেশকে তবে খুঁজে আনা হোক।

একটু থামুন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন