বাবার ছবি আমার আরাধ্য কল্পনা

তাঁরা বাবাকে দেখেছেন ঘরের দেয়ালে টানানো ছবিতে, মায়ের বর্ণনায় কল্পিত অবয়বে। তাঁরা কেউ বাবাকে হারিয়েছেন মাতৃগর্ভে থাকতে, কারও বাবা মারা গেছেন তাঁদের জন্মের পরই। বাবার সঙ্গে তাঁদের কোনো স্মৃতি নেই। অনুভবে থাকা বাবাকে নিয়ে এমন চার সন্তানের লেখা ছাপা হয়েছে ছুটির দিনের মূল রচনায়। এখানে পড়ুন খান মোহাম্মাদ মৃদুলের লেখাটি।

তারুণ্যে আমার মা ও বাবা। বাবা আমার কাছে শুধুই ছবির মানুষ।

বাবা শব্দটা শুনলেই আমার চিন্তার জগৎ স্থির হয়ে আসে। কোনো কিছুই ভাবতে পারি না, কল্পনা করতে পারি না, এমনকি ওই চেহারাটাও হুট করে চোখের সামনে ভেসে ওঠে না। বাবার সঙ্গে আমার কোনো স্মৃতি নেই। আমি চাইলেই হুট করে বাবাকে নিয়ে কিছু বলতে পারি না, লিখতে পারি না। বাবা আমার কাছে কেবল একটা শব্দ। কেবল এক না জানা, না পাওয়া আর না বুঝতে পারা ভালোবাসার সংকেত–চিহ্ন। বাবাকে নিয়ে আমি যতটুকু জানি, তা–ও জেনেছি বয়স হওয়ার পর।

আমার বয়স তখন সবে আড়াই। ১৯৯৭ সাল। বাবার ফুসফুসে ক্যানসার ধরা পড়ল। চিকিৎসার জন্য বাবাকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হলো। তিনি সবাইকে ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ঢাকায় গিয়ে বক্ষব্যাধি হাসপাতালে ভর্তি হলেন। দীর্ঘদিন তাঁর চিকিৎসা চলল সেখানে। এরপর তিনি ফিরে এলেন। নিথর, নিস্তব্ধ। বাবা হারিয়ে গেলেন আকাশের উল্টো পিঠে।

আমি কখনো জানলাম না বাবা কেমন হয়, বাবার আদর কেমন হয়, বাবা শাসন করলে কেমন লাগে, বাবার ওপর রাগ, অভিমান করার অনুভূতি কেমন হয়! শুধু বড় হওয়ার পর জেনেছি, বাবা নামের এই ছাদটা মাথার ওপর না থাকলে জীবনের রং হয় প্রচণ্ড রকম নীল।

আমাদের মাথার ওপর থেকে ছাদ সরে গেল। সেই ছাদহীন আকাশের নিচে আমাদের মা অত্যন্ত কষ্ট করে, দিনরাত এক করে আমাদের বড় করেছেন। মা আমাদের সব সময় বলেন, ‘তোর বাবা খুব সাদাসিধে জীবন যাপন করতেন। তিনি নিজের মতো থাকতেন। কারও ধার যেমন তিনি ধারতেন না, তেমনি কখনো কাউকে তাঁর নিন্দা করতেও শুনিনি। তোরা বড় হয়ে যেন তোর বাবার মতো হবি।’

অথচ আমি যখন ভাবি, আমাকে বাবার মতো হতে হবে, তখন আমার খুব কান্না পায়। বুঝতে পারি না, বাবার মতো হওয়া মানে আসলে কেমন হওয়া। কী করতেন বাবা। কীভাবে কথা বলতেন তিনি। কীভাবে হাঁটতেন। কীভাবে চিন্তা করতেন। তিনি কী গান গাইতে পারতেন? কবিতা পছন্দ করতেন বাবা? তিনি কী ভরা বর্ষণে নৌকার ছইয়ের নিচে শুয়ে আকাশ দেখেছেন কখনো? এসব কি ভালো লাগত তাঁর। জানি না। জানা হয়ে ওঠেনি কখনো। নিজের সঙ্গে তাই কখনোই কোনোভাবে মেলাতে পারি না বাবাকে।

মায়ের কাছে শুনেছি, আমি সব সময় বাবার কোলে উঠতে চাইতাম। বাবা তখন অসুস্থ ছিলেন। তাঁর বুকে তখন প্রচণ্ড ব্যথা। তিনি হাঁটতে গেলেও ভীষণ কষ্ট হতো। তিনি আমাকে কোলে নিতে পারতেন না। তাই আমার আঙুল ধরে আমাকে নিয়ে হাঁটতেন যতটা পারা যায়। এই না পাওয়া, এই অপ্রাপ্তির কোনো নাম দেওয়া যায়? বাবার কোলে ওঠার সৌভাগ্য যে ছেলের হয়নি, তার কাছে জীবনের স্রোত কতটা নির্মম, তা বলাই বাহুল্য।

বাবা মারা যাওয়ায় সংসারে টানাপোড়েন শুরু হলো আগের চেয়ে বেশি। মা সেলাই মেশিনের কাজ জানতেন ভালোই। তিনি টুকটাক কাজ করতেন বাড়িতে থেকেই। বাবার বড় বোন আমাদের একমাত্র ফুফু কিছু টাকা দিতেন প্রতি মাসে। তাই দিয়ে মা রীতিমতো যুদ্ধ করে আমাদের তিন ভাইবোনকে পড়ালেখা শিখিয়েছেন। ভাইয়া আর আপুর সঙ্গে বাবার বেশ স্মৃতি থাকলেও আমার কাছে মা–ই আমার বাবা এবং মা। আমি আমার মায়ের কাছেই আমার বাবার গায়ের গন্ধ খুঁজি। আমার মায়ের কণ্ঠে তাঁকে শুনতে পাই। আমাদের কোনো অর্জনে মায়ের হাসিকেই আমার বাবার মুখের হাসি মনে করি। মা যখন সামনে এসে দাঁড়ান, তার আনত মুখখানি, সহজ সারল্যে ভরা অবয়বখানা তখন মনে হয় একই সঙ্গে আমার বাবা এবং মা—দুজনই দাঁড়িয়ে আছেন।

একটা জীবনে আমি অনেক কিছুই হয়তো অর্জন করব, অনেক আনন্দে থাকার সৌভাগ্য হয়তো হবে। সবাইকে বলতে পারার মতো একটা ছোট্ট গল্পও হয়তো তৈরি হবে আমার। অথচ আমার এই সমস্ত প্রাপ্তি, অপ্রাপ্তির মাঝে শুধু এটুকুই আফসোস থাকবে, হারিয়ে যাওয়া সেই মানুষটা আর কোনো দিনই জানবে না, তাঁর ছোট্ট সেই ছেলেটা তাঁকে কতটা ভালোবাসে। মস্তিষ্কের নিউরনে কোনো স্মৃতি না থাকার পরও সেই ছোট্ট ছেলেটা তাঁকে প্রতিটা মুহূর্তে কতটা অনুভব করে। তাঁকে কোনো দিন বলা হয়ে উঠবে না—বাবা, আমি তোমাকে ভালোবাসি।