যে কার্ড ফুটবলের লাল কার্ডের চেয়েও মারাত্মক

আঁকা: সব্যসাচী মিস্ত্রী

বিশ্বকাপ ফুটবল দেখছিলাম টিভিতে। মারাত্মক ফাউল করল এক খেলোয়াড়, রেফারি স্যাঁৎ করে পকেট থেকে একটা হলুদ কার্ড বের করে দেখিয়ে দিল তাকে। খেলোয়াড়ের হয়তো হলুদ কার্ডে মন ভরছিল না, তাই সে কিছুক্ষণ পর আবার ফাউল করল! রেফারি তাকে আবার হলুদ কার্ড দেখাল। দুটি হলুদ কার্ড পাওয়ায় তার হয়ে গেল একটা লাল কার্ড। রেফারি হলুদ কার্ডের থেকে বেশি উঁচুতে হাত উঠিয়ে লাল কার্ড দেখাল তাকে। খেলোয়াড় খুশিমনে বেরিয়ে গেল মাঠ থেকে; মনে হলো তার জীবনের লক্ষ্যই ছিল আজকের ম্যাচে লাল কার্ড পাওয়া। আমিও ওই খেলোয়াড়ের মতো বেরিয়ে এলাম, মাঠ থেকে নয়, বাসা থেকে।

রাস্তায় নেমেই গলির মুখে স্যাটেলাইটের দুই ডানার মতো গোঁফওয়ালা এক লোক পথ আটকে ধরল, ‘আরে, তুই মামুর না?’

: হ্যাঁ, আমি মামুর, তবে আপনি কে ভাই? চিনলাম না তো!

: আরে আমি শাহিন, তোর সঙ্গে স্কুলে পড়তাম, তুই আমাকে চিনতে পারছিস না! কী আজব। তুই সত্যিই মামুর তো?

আমি পকেট থেকে ন্যাশনাল আইডি কার্ড বের করে শাহিনকে প্রমাণ দিলাম যে আমি সত্যিই মামুর। কিছুক্ষণ সুখ-দুঃখের কথা বলে ‘কাজ আছে, আবার পরে দেখে হবে’ বলে হনহন করে চলে গেল শাহিন, তবে যাওয়ার আগে তার ভিজিটিং কার্ডটা আমার হাতে ধরিয়ে দিতে ভুলল না। ইদানীং সে নাকি পড়াশোনার পাশাপাশি একটা ই-কমার্স সাইটও চালাচ্ছে!

শাহিন চলে যাওয়ার পর সামনের মোবাইল ফোনের পার্টসের দোকানটায় ঢুকলাম। এই ফাঁকে বলে রাখি, আমি এখনো সেই পুরোনো আমলের একখানা আনস্মার্টফোনই ব্যবহার করছি। সেই মোবাইল ফোনের মেমোরি কার্ডটা নষ্ট হয়ে গেছে, পাল্টাতে হবে। নির্দিষ্ট দোকানে ঢুকে মেমোরি কার্ড দিলাম দোকানদারকে, সঙ্গে দিলাম ওয়ারেন্টি কার্ডটাও। ওয়ারেন্টি কার্ড দেখে দোকানদার আগেরটা বদলে নতুন একটা মেমোরি কার্ড দিলেন। সেটা নিয়ে বের হতেই দেখি প্রেমিকা মেসেজ দিয়েছে, ‘পুলে দেখা করো এক ঘণ্টা পর, জরুরি!’

ফোনে ব্যালান্স ছিল না, তাই রিচার্জের দোকান থেকে রিচার্জ কার্ড কিনে তাকে রিপ্লাই দিলাম, ‘আচ্ছা জান, আসতেছি।’

প্রেমিকা জরুরি তলব করেছে, তার মানে সাংঘাতিক কিছু ঘটেছে। এত জরুরি তলব দেওয়া মানে নিশ্চয়ই আমি কিছু একটা ভুলে গেছি। জন্মদিন? অ্যানিভার্সারি? হবে কিছু একটা, মনে করতে পারছি। এখন উপায় একটাই, গিফট নিয়ে যেতে হবে। নইলে তার রাগ ভাঙানো দুষ্কর হয়ে যাবে।

কাছেই একটা এটিএম বুথ ছিল, ভেতরে ঢুকে এটিএম কার্ড দিয়ে কিছু টাকা উঠিয়ে রওনা দিলাম শপিং মলের দিকে। পছন্দ করে ওর প্রিয় রঙের একটা সুন্দর স্কার্ফ কিনলাম। দাম দেওয়ার সময় দোকানের একটা মেম্বারশিপ কার্ড দেখালাম, বেশ ভালো একটা ডিসকাউন্টও দিল ওরা।

বাসে উঠে রওনা দিলাম পুলের দিকে। কোনোমতে একটা সিটে বসার পরই দেখি, জানালা দিয়ে একটা কাগজ এসে আমার কোলে পড়ল। সর্বরোগ নিরাময়ের ‘মহৌষধ’-এর কার্ড! একটু পর কন্ডাক্টর এসে ভাড়া চাইল, আমি স্টুডেন্ট আইডি কার্ড দেখিয়ে হাফ ভাড়া দিলাম তাকে। সে গজগজ করতে করতে চলে গেল।

গন্তব্য আসতেই নেমে গেলাম বাস থেকে। পুল হলো পার্কের ভেতরের ছোট্ট একটা কাঠের ব্রিজ। সেই ব্রিজে গিয়ে দেখি প্রেমিকা এখনো আসেনি। সময় কাটাতে আশপাশ দেখতে শুরু করলাম। সামনের হিজলগাছের নিচে চার তরুণ কার্ড খেলছে। ওদের খেলা দেখতে দেখতে খেয়াল করলাম, প্রেমিকা আসছে। হাসিমুখে তার দিকে প্যাকেটে মোড়ানো স্কার্ফটা এগিয়ে দিলাম। সে গম্ভীর মুখে সেটা নিয়ে তার ভ্যানিটি ব্যাগের ভেতর থেকে একটা খাম বের করে আমাকে দিয়ে, ‘বাই, পরে কথা হবে, পিংকি বাইরে রিকশায় বসে আছে। তাই থাকতে পারছি না’ বলে আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই হনহন করে চলে গেল।

সে চলে যেতেই খামের মুখটা ছিঁড়লাম। ভেতর থেকে যেটা বেরোল, সেটা হলো আমার প্রেমিকার বিয়ের কার্ড!