পাটওয়ারীর ছাগল, প্রাডো এবং...

কার্টুন এআই

বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে ছাগল যাচ্ছেই না। মতিউর রহমান নামের এক রাজস্ব কর্মকর্তার ছাগল নিয়ে হইচই থেকে সূত্রপাত, তারপর তো পড়ে গেল হাসিনার ফাঁসি-না সরকার। ইতিহাসে তা ছাগল-কাণ্ড বলে অমর হয়ে আছে।

গান্ধীজির ছাগল নিয়ে কথা কম হয়নি। লোকশ্রুতি আছে, গান্ধী যখন দাঙ্গা থামাতে নোয়াখালী আসেন, তখন তাঁর ছাগল চুরি হয়ে যায়। আর তা খেয়ে ফেলে নোয়াখালীর কয়েকজন দুষ্ট লোক। ঐতিহাসিকেরা এই লোকশ্রুতির কোনো সত্যতা পাননি। এটা মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।

কিন্তু সাবেক উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের সঙ্গে খালেদ মুহিউদ্দীনের টক শোতে বিস্তারিতভাবে উঠে এল, তিনি যখন উপদেষ্টা ছিলেন, তাঁর মেয়ের অতি আদরের পোষা ছাগল ধরে নিয়ে গিয়ে খেয়ে ফেলে কতিপয় লোক। দৈনিক ইত্তেফাকের অনলাইনে লিখেছে:

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল জানিয়েছেন, তাঁর ছোট মেয়ের পোষা ছাগল চুরির ঘটনাটি তাঁর জীবনের অন্যতম এক হৃদয়বিদারক ঘটনা। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) রাতে ‘ঠিকানায় খালেদ মুহিউদ্দীন’ নামক টক শোতে অতিথি হিসেবে যুক্ত হয়ে তিনি এই তথ্য জানান।

উপস্থাপক খালেদ মুহিউদ্দীনের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ঘটনাটিকে রাজনৈতিক প্রতিশোধ হিসেবে প্রচার করা হলেও মূলত মজা করার জন্যই ছাগলটি নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তবে রাজনৈতিক প্রতিহিংসাবশত একটি শিশুর পোষা প্রাণী চুরি করে তা খেয়ে ফেলার মতো কাজকে তিনি অত্যন্ত নির্মম ও অমানুষিক হিসেবে উল্লেখ করেন।

টক শোতে মেয়ের সঙ্গে পোষা ছাগলটির গভীর সম্পর্কের কথা তুলে ধরে আসিফ নজরুল জানান, হেয়ার রোডের সরকারি বাসায় একা থাকার কারণে সাড়ে ৯ বছরের ছোট মেয়েটির সঙ্গী হিসেবে তাঁরা ছাগলটি কিনে দিয়েছিলেন। ছাগলটি প্রতিদিন মেয়েটির স্কুলে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকত এবং স্কুল থেকে ফেরার পর তার সঙ্গে খেলাধুলা করত। এমনকি মেয়েটি তার ফোনের ওয়ালপেপারে মায়ের ছবির বদলে ছাগলটির গলা জড়িয়ে ধরে রাখা ছবি ব্যবহার করত।

ছাগলটি চুরি হয়ে যাওয়ার পর শিশুটি প্রচণ্ড ট্রমাটাইজড হয়ে পড়ে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে বমি করে দেয় এবং টানা দেড় দিন কিছু না খেয়ে অত্যন্ত অসুস্থ হয়ে পড়ে। ছাগলটিকে জবাই করে খেয়ে ফেলার বিষয়টি আজও মেয়েটিকে জানানো হয়নি, তাকে বলা হয়েছে যে দরজা খোলা থাকায় ছাগলটি পালিয়ে গেছে; কারণ এই সত্য জানতে পারলে সে আরও বেশি ভেঙে পড়বে। ছাগল কাটার নির্মম বিবরণ দিয়ে তিনি বলেন, অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে প্রথম দফায় ভোঁতা বঁটি দিয়ে কাটা না যাওয়ায় কারওয়ান বাজার থেকে ধারালো বঁটি এনে সেটিকে কাটা হয়, যা অত্যন্ত পিশাচসুলভ আচরণ।

টক শোতে আলোচনা এবং বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, জাতীয় নাগরিক কমিটির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীসহ কয়েকজন এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং এটি আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে একধরনের রাজনৈতিক অসন্তোষ বা প্রতিবাদের অংশ ছিল বলে প্রচার করা হয়েছিল।

আসিফ মাহমুদের বাংলো ও নতুন ছাগল

জানা যায়, ছাগলটি ধরে নিয়ে পাশের আরেকটি সরকারি বাংলোতে রাতের বেলা জবাই করে খাওয়া হয়েছিল। এই ঘটনায় তৎকালীন তরুণ উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ লজ্জিত ও বিব্রত হয়ে আসিফ নজরুলের মেয়ের জন্য পরবর্তী সময়ে আরেকটি নতুন ছাগল কিনে পাঠিয়েছিলেন, যদিও আসিফ নজরুল সেটি ফেরত পাঠিয়ে দেন।

ছাগল-চুরি ছাগল-জবাইয়ের এই হইচইয়ের আগে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী একটা শানদার প্রাডো গাড়িতে চড়ে লংমার্চে বের হন। সেটা কার জানতে চাইলে তিনি বলেন, শুভাকাঙ্ক্ষীর।

যুগান্তরের খবরটি পড়ুন

শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) সকালে ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বর থেকে লংমার্চটি শুরু হয়। এ সময় কালো রঙের একটি টয়োটা প্রাডো গাড়িতে দাঁড়িয়ে নেতা–কর্মীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে দেখা যায় নাসীরুদ্দীনকে। তাঁর হাতে ছিল জাতীয় পতাকা।

এনসিপির এই নেতাকে এমন একটি বিলাসবহুল গাড়িতে দেখে অনেকের মনে প্রশ্ন ওঠে—গাড়িটি কার? এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নাসীরুদ্দীন বলেন, ‘লংমার্চে কীভাবে যাব? এ নিয়ে গতকাল রাতে অনেকেই ফোন করে বলেছেন, “আপনার তো গাড়ি নেই, কীভাবে যাবেন?” তখন এক শুভাকাঙ্ক্ষী জানিয়েছেন, তিনি আমার জন্য গাড়ি নিয়ে আসছেন। আমি তাঁকে বলেছি, “গাড়ি নিয়ে চলে আসেন।”’

তবে গাড়িটি কে দিয়েছেন, তা জানাতে চাননি নাসীরুদ্দীন। তিনি বলেন, ‘কে দিয়েছেন, সেটা বলা যাবে না। তাহলে তাঁর গাড়ি ভেঙে দিতে পারে।’

নাসীরুদ্দীন আরও বলেন, ‘ইনশা আল্লাহ, সবাই দোয়া করবেন, যাতে ভালো একটা গাড়ি কিনতে পারি।’

চ্যানেল ২৪ এর খবর

সম্প্রতি ১১–দলীয় ঐক্যের লংমার্চকে ঘিরে গাড়ি ব্যবহার নিয়ে বিতর্কে জড়ান এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী মো. রাশেদ খান অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের এক নেতার মালিকানাধীন প্রাডো গাড়িতে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ‘লংড্রাইভ’ করেছেন।

৬ সেপ্টেম্বর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে এ অভিযোগ করেন রাশেদ খান।

অন্যদিকে আমজনতা পার্টির তারেক রহমানও দাবি করেন, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী যে গাড়িটি ব্যবহার করেছেন, সেটির মালিক মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়া ওরফে তুষার ভূঁইয়া। একটি ভিডিওতে গাড়িটির মালিকানার প্রমাণ হাজির করার কথাও জানান তিনি।

স্থানীয়ভাবে জানা গেছে, মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়া ওরফে তুষার ভূঁইয়া ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত মাদারীপুর সদর থানা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হন। বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগের দলীয় কর্মসূচিতেও তাঁকে দেখা গেছে এবং দলটির পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

অবশেষে সেই তুষার এখন এনসিপির জেলা আহ্বায়ক

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) মাদারীপুর জেলা আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করেছে। এতে আহ্বায়ক করা হয়েছে দলটির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর গাড়ি ব্যবহার নিয়ে বিতর্কে আলোচনায় আসা মো. মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়া ওরফে তুষার ভূঁইয়াকে।

ছাগল কে?

এখন প্রশ্ন হলো, ছাগল কে?

এটা বলার জন্য মিসেস প্যাকলেটাইডস টাইগার গল্পটিতে যেতে হবে। ব্রিটিশ লেখক এইচ এইচ মুনরো (সাকি)-এর লেখা ‘মিসেস প্যাকলেটাইডস টাইগার’ একটা জনপ্রিয় এবং হাস্যরসাত্মক ছোটগল্প।

মিসেস প্যাকলেটাইড ঠিক করেন, তিনি শিকারি হিসেবে খ্যাতি অর্জন করবেন। তিনি ভারতে যান। একটা হাড়জিরজিরে বাঘ নির্বাচন করেন। একটা ছাগলকে টোপ হিসেবে বেঁধে রাখা হয়।

মাচানে উঠে বসে থাকেন প্যাকলেটাইড। বাঘ এলে তিনি গুলি করেন। গুলির শব্দে দুর্বল বাঘ মারা যায়। গুলি গিয়ে লাগে ছাগলের গায়ে।

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের ছাগল

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের ‘ছাগল’ গল্পে রাজনীতিবিদদের শিকারের টোপ হিসেবে পাড়ার মাস্তানকে ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।

কিন্তু এখন সবকিছু দেখে শুনে মনে হচ্ছে, দেশে এখন ছাগল হলো জনগণ। শুধু দেশেই–বা কেন, পৃথিবীতে ট্রাম্প–পুতিনের আমলে সারা দুনিয়ার সাধারণ মানুষেরাই ছাগলে পরিণত হয়েছে। ৮০০ কোটি মানুষ ক্ষমতাধর রাষ্ট্রপ্রধান, রাজনীতিবিদ, করপোরেট, পুঁজিবাদ, বিশ্বব্যবস্থার লোভের বলি।