চার্জারের সাতকাহন

আঁকা: পরিচিত সরকার জয়ীতা

নতুন চার্জার কিনে বাসায় ফিরেই কুদ্দুস সাহেব সেটি হাতে নিয়ে এমন মনোযোগে পড়তে শুরু করলেন, যেন বিসিএস পরীক্ষার প্রশ্নপত্র পেয়েছেন।

স্ত্রী অবাক হয়ে বললেন,

—চার্জার কিনেছ, না জমির দলিল?

কুদ্দুস সাহেব উত্তর দিলেন না। চশমা একটু নামিয়ে চার্জারের গায়ে চোখ বুলিয়ে বললেন,

—আহা! কী সৎ একটা জিনিস!

ছেলে রনি হেসে বলল,

—চার্জার আবার সৎ হয় নাকি?

—অবশ্যই হয়। দেখ না, নিজের সব দুর্বলতাও লিখে রেখেছে। মানুষ হলে লিখত, ‘আমি সব পারি।’ আর কাজের সময় বলত, ‘আসলে পরিস্থিতি...’

তাঁদের কথা শেষ হতেই পাশের বাসার মতিন সাহেব হাজির।

—কী নিয়ে এত গবেষণা?

কুদ্দুস সাহেব চার্জারটা তাঁর হাতে ধরিয়ে দিলেন।

—এটা আসলে মানুষ চেনার বই।

—কীভাবে?

—দেখুন, এখানে লেখা আছে INPUT 100–240V। অর্থাৎ পৃথিবীর যেকোনো ভোল্টেজ সহ্য করতে পারে। অথচ আমাদের অফিসের করিম সাহেবকে একটু উঁচু গলায় কথা বললেই সঙ্গে সঙ্গে সিস্টেম রিস্টার্ট!

মতিন সাহেব হেসে বললেন,

—ঠিকই বলেছেন।

কুদ্দুস সাহেব থামলেন না।

—আবার দেখুন, OUTPUT 65W Max। নিজের সর্বোচ্চ ক্ষমতাটা স্পষ্ট করে লিখে দিয়েছে। কিন্তু আমাদের পাড়ার সেলিম ভাইয়ের গায়ে যদি লেখা থাকত—৬৫০ ওয়াট। কাজের সময় দেখা যেত, তিন ওয়াটও বের হয় না।

রনি বলল,

—কিছু মানুষের গায়ে লেখা উচিত—

Fast Charging.

পাঁচ মিনিট প্রশংসা করলেই আবার চাঙা।

মতিন সাহেব যোগ করলেন,

—আর সমালোচনা করলেই—

Battery Low. Please Connect Ego Charger.

হাসতে হাসতে কুদ্দুস সাহেবের চোখে পানি চলে এল। তিনি আবার পড়তে শুরু করলেন।

—এই যে Made in China লেখা আছে। মানুষ হলে কী লিখত জানেন? Made in Facebook.

বাস্তব জীবনে কিছু না, কিন্তু প্রোফাইলে বিশ্ব বিজয়ী।

রনি বলল,

—বাবা, আর কী লেখা থাকত?

—অনেক কিছু।

Standby Time: অফিসে আট ঘণ্টা।

Working Time: বিশ মিনিট।

Heat Warning: বেতন বাড়ানোর কথা বললেই অতিরিক্ত গরম হবে।

মতিন সাহেব এবার নিজেই যোগ করলেন,

—আর কিছু মানুষের গায়ে লেখা উচিত—

Water Resistant.

স্ত্রীর চোখের জলেও এদের মন নরম হয় না।

এমন সময় রান্নাঘর থেকে কুদ্দুস সাহেবের স্ত্রীর ডাক এল—

—শুনছ, এতক্ষণ ধরে চার্জার নিয়ে কী করছ?

—মানুষের চরিত্র পড়ছি।

—চার্জার দিয়ে?

—হ্যাঁ।

—চার্জার দিয়ে মানুষ চেনা যায়?

কুদ্দুস সাহেব মৃদু হেসে বললেন,

—অবশ্যই। চার্জার অন্তত আগে থেকেই বলে দেয়, সে কতটুকু দিতে পারবে। মানুষ সাধারণত তার উল্টোটা বলে।

স্ত্রী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

—তাহলে আপনার গায়েও একটা লেবেল লাগানো দরকার।

—কী লেখা থাকবে?

—Output: হাজারটা উপদেশ।

Actual Performance: পরে দেখা যাবে।

কুদ্দুস সাহেব  চার্জারটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।তারপর নিজের কপালে আঙুল ঠেকিয়ে বললেন,

—আমার গায়েও একটা লেবেল লাগানো দরকার।

স্ত্রী প্রজ্ঞার ভাব নিয়ে বললেন,

—লাগানো আছে।

—কোথায়?

—বিয়ের দিন থেকেই। শুধু আপনি পড়ে দেখেননি।