সিচ্যুশনটা বোঝার চেষ্টা করেন

কার্টুন: সৌখিন

আগের দিন করা টেস্টগুলোর রিপোর্ট দেখাতে ডাক্তারের কাছে যাব। ডাক্তার সময় দিয়েছেন রাত ৮টা। ঢাকার জ্যামের কথা চিন্তা করে বেশ আগেভাগেই রওনা করলাম।

নামার সময় রিকশাওয়ালা মামাকে ২০০ টাকার একটা নোট দিলাম। তিনি পুরোটাই রেখে দিলেন।

সে কী! ভাড়া প্রায় ডাবল?

আমার রাগী চেহারা দেখে মামা বলে উঠলেন, 

‘দ্যাখেন মামা, রাগ কইরেন না। অনেক দূর ঘুইরা আছি। তার ওপর বৃষ্টি। এক নাকের ওপর হাত দিয়া অন্য নাকে শ্বাসটান দ্যান, দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন। আমার ‘সিচ্যুশনটা’ বোঝার চেষ্টা করেন। দেখবেন রাগ নাইমা যাইবো। গেলাম।’

বলেই রিকশা টান দিলেন।

কাঁটায় কাঁটায় তখন ৮টা। ডাক্তার এখনো আসেননি। ডাক্তার আসেননি ভালো কথা; কিন্তু ডাক্তারের চ্যালা কাম ডান হাত, মানে কম্পাউন্ডারেরও ডেস্ক খালি।

এই বয়সে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করার কোনো মানে নেই। জায়গা খুঁজে বসলাম।

মিনিট বিশেক রিল দেখে একটা রিল ফরোয়ার্ড করতে গিয়ে ‘ফরোয়ার্ড’–এ তাকিয়ে দেখি ডাক্তার তখনো আসেননি। তবে আশার কথা, কম্পাউন্ডার এসেছে।

ভাবগতিক দেখে মনে হচ্ছে বাসায় ঝগড়া করে খুব বাজেভাবে হেরে গেছে। আমি সামনে গেলেই একটা ঝাড়ি দেবে। কাছাকাছি গিয়ে এক হাত দূরে দাঁড়িয়ে আগে দু-একটা কাশি দিলাম। কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। কাছে গিয়ে এবার জোরে কাশি দিলাম।

‘আরে আরে! কী সমস্যা? রোগ আমারেও বান্ধাই দিবেন নাকি?’

‘ইয়ে মানে... ডাক্তার কখন আসবে?’

‘জানি না।’

‘ফোন দেন না একটা? আমাকে ৮টায় আসতে বলেছিলেন। এখন ৮টা ৪০ বাজে।’

‘ফোনে ব্যালেন্স নাই।’

মুখে যে কথাগুলো এল, মুহূর্তেই গিলে ফেললাম। এক নাকের ওপর হাত দিয়ে অন্য নাকে শ্বাসটান দিলাম। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম, ‘আমার সিচুয়েশনটা বোঝার চেষ্টা করেন। আমি থাকি ঢাকার বাইরে। এসেছি শুধু এই ডাক্তারের জন্য।’

মনে হলো কম্পাউন্ডারের মন খানিক গলেছে। ফোন বের করে বললেন,

‘বিশ টাকা দেন, ফ্লেক্সি!’

মন চাইল হাসান মাহমুদ হয়ে একটা ফার্স্ট বল করে নাক ফাটিয়ে দিই। তা না করে মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ হয়ে বললাম, ‘ডাক্তারের নম্বর দেন, আমি কল দিচ্ছি।’

এর মধ্যেই কম্পাউন্ডারের ফোন বেজে উঠল, ‘হ্যালোওও... কী? হ, টাকা আছে ফোনে! ক্যা? আপনি নিজে ফোন দিতে পারেন না? আপনাকে ক্যান ফোন দিয়া মনে করাইতে হইবো যে আসেন, রোগীরা অপেক্ষা করতেছে?’

বিশ্বাস করেন রাসেল ভাই, ডাক্তার আসিবার পূর্বেই রোগীর কম্পাউন্ডারের ওপর হইতে রাগ চলিয়া গেল!

যেমন কম্পাউন্ডার, তেমন তাঁর ডাক্তার!

রাত ততক্ষণে ৯টা। কেন যে গ্রামের ডিসপেনসারির চিকিৎসা ফেলে এখানে এলাম! নাচার হয়ে এখন নিজেকেই শাপসাপান্ত করছি।

হঠাৎ পাশে হুইলচেয়ারে বসে থাকা এক বয়স্ক দাদি ইশারা করে ডাকলেন। কাছে যেতেই ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘দেশ স্বাধীন হইছে কত বছর হইলো?’

সারছে!

আমি একটা স্মার্ট শিক্ষিত মেয়ে; কিন্তু মুখে মুখে বিয়োগফল পারি না—এটা কিছুতেই ধরা দেওয়া যাবে না। একটু সাইড হয়ে তাড়াতাড়ি মোবাইলে হিসাব করে বললাম, ‘৫৫ বছর প্রায়। কিন্তু এই প্রশ্ন…?’

দাদির সিনা হঠাৎ টানটান হয়ে গেল।

তাঁর সামনে বসে আগে থেকেই গল্প করতে থাকা দুই মুরব্বির দিকে তাকিয়ে বললেন,

‘সেই ৫৫ বছর আগে দ্যাশ স্বাধীন হইছে, কই! এখনো তো ডাক্তারের সিরিয়ালটাই ঠিক হয় নাই!’

এরপর শুরু হলো দাদির একক বক্তৃতা।

দাদি একের পর এক দেশ ও জাতিসংক্রান্ত দুর্দান্ত সব প্রশ্ন তুলে মুরব্বিদের কাবু করে ফেলছেন। সম্ভবত বাক্‌যুদ্ধে জিতে যাবেন। মনে হলো ডাক্তার না এলেও আজকে অন্তত একটা বিতর্ক প্রতিযোগিতা দেখে যেতে পারব।

এদিকে ঘড়িতে তখন ১০টা ১৫।

কম্পাউন্ডার ঝিমানো শুরু করেছেন। বসে থাকতে না পেরে আমি শুরু করেছি পায়চারি।

হঠাৎ কম্পাউন্ডারের চিৎকার ‘আইতাছে! আইতাছে!’

আমি দৌড়ে গিয়ে চেম্বারের দরজার সামনে দাঁড়ালাম।

দেখি, ডাক্তার হেলেদুলে আসছেন। সিরিয়াল অনুযায়ী অবশেষে ভেতরে ঢুকলাম।

রিপোর্ট দেখে স্যার বললেন, ‘তেমন কিছুই করার নেই।’

হায় হায়!

আমি কি তাহলে আর আমাদের মাঝে বেশিদিন নেই?

নারী এশিয়া কাপ ক্রিকেট ফাইনাল পর্যন্ত টিকব, নাকি তার আগেই জিন টাপাক ডামডাম?

‘স্যার! আমার হাতে আর কয় দিন আছে? কী এমন সমস্যা? সত্যিটা বলেন!’

স্যার অবাক হয়ে তাকিয়ে বললেন,

‘আরে না! টেস্ট দেওয়ার মতো কিছু পাচ্ছি না। এ মাসের টার্গেটটা বোধ হয় ফুলফিল হবে না। আপনার স্পন্দন একটু কম, কিছু গ্যাসের সমস্যা আছে। নার্ভ উত্তেজিত হয় এমন কাজ করবেন। যেমন বাংলাদেশের ক্রিকেট খেলা দেখতে পারেন। সংসদ অধিবেশন দেখতে পারেন, ঢাকার জ্যামে বসে থাকতে পারেন।’

কলিজা যেন প্রাণ ফিরে পেল। মৃত্যুর দুয়ার থেকে এভাবেও কামব্যাক করা যায়? এমন প্রত্যাবর্তন আর্জেন্টিনা ছাড়াও সম্ভব?

চেম্বার থেকে বের হওয়ার সময় মনে হলো, স্যার আমাকে এত ভালো ভালো কথা বললেন, আমারও বিনিময়ে ভালো কিছু বলা উচিত।

উত্তেজনায় সিনেমার নায়িকাদের মতো ঘাড় ঘুরিয়ে বললাম,

‘স্যার, আপনার পেট অনেক ফুলে আছে। আমারও এমন হয়। গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ নিয়মিত খাবেন আর সকালে খালি পেটে মেথি খাবেন। আশা করি, এই সাজেশনে ঠকবেন না। আসি’  বলেই মুচকি হেসে বের হয়ে এলাম। ডাক্তার চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে র‌ইলেন।

দরজার বাইরেই একজন জিজ্ঞাসা করল,

‘ভিতরে কীসের ডাক্তার?’

ইস! এতক্ষণে খেয়াল হলো, ডাক্তারের ডিপার্টমেন্টটাই তো জানা হয়নি!

সাইনবোর্ডের দিকে তাকালাম,

‘লিভার, গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ।’

আমি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম।

তিনি নিজেই গ্যাস্ট্রোর ডাক্তার।

 রিকশাওয়ালা মামা ঠিকই বলেছিল—

সিচুয়েশন বুঝতে আমার সব সময়ই যে কেন দেরি হয়!