চেয়ার গরম

‘দূর থেকে এই চেয়ারটিকে দেখতে খুব আরামদায়ক মনে হলেও বাস্তবে এটি মোটেও আরামদায়ক নয়। এই চেয়ারে বসলে আমি প্রতিমুহূর্তে অনুভব করি যে আগুনের তপ্ত হিট বা তাপ আসছে! হাসার কিছু নেই। আমি যা অনুভব করি, তা বলি।’

জাতীয় সংসদের সমাপনী অধিবেশনে (১ মে ২০২৬) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন এ কথা। তাঁর এই ভাষণ নিয়েই অনুসন্ধানে নেমেছে রস+আলো। আর তাতেই কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে পাওয়া গেছে বিশাল একটা অজগর সাপ (রস+আলো প্রতিবেদক স্বপ্নযোগে সমস্ত প্রমাণ ও দলিল হাতে পেয়েছেন)।

দলিলের তথ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারের জন্য বাজেট ছিল মাত্র দুই হাজার টাকা। চেয়ার-ক্রয় কমিটি চেয়ার কেনার জন্য প্রথমে যায় জার্মানি, পরে আমেরিকায়। ২১ সদস্যের এই কমিটির যাতায়াত, থাকা-খাওয়া এবং তাদের শ্যালক-শ্যালিকাদের জন্য শ্যাম্পু-সাবান-জুতা-স্যান্ডেল ইত্যাদি ক্রয় বাবদ খরচ হয় ৯ কোটি ৭৭ লাখ টাকা মাত্র। তাঁরা ফিরে রিপোর্ট দেন, চেয়ার একটা পাওয়া গেছে। মনমতো না হলেও চলে আরকি। তবে চেয়ার যদি কিনতেই হয়, কেনা উচিত চায়না থেকে। শুধু তলায় লিখে দিতে হবে, মেড ইন সুইজারল্যান্ড। এতে সবারই লাভ।

তাঁর এই ভাষণ নিয়েই অনুসন্ধানে নেমেছে রস+আলো। আর তাতেই কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে পাওয়া গেছে বিশাল একটা অজগর সাপ (রস+আলো প্রতিবেদক স্বপ্নযোগে সমস্ত প্রমাণ ও দলিল হাতে পেয়েছেন)।

শেষমেশ চায়নাতেই অর্ডার দেওয়া হলো। চীনা কোম্পানি যখন শুনল মেড ইন সুইজারল্যান্ড লিখে দিতে হবে, আর দাম হবে ১০ লাখ (কিন্তু বিল করতে হবে ৫ কোটি ৫৫ লাখ), তারা ভাবল, চেয়ারটাকে এয়ারকন্ডিশনড করে দেওয়া যাক। শীতের সময় চেয়ারটি হবে আগুনের মতো গরম, আর গরমের সময় চেয়ার থেকে বের হবে এসির মতো ঠান্ডা বাতাস!

যথাসময়েই চেয়ারটা বাংলাদেশে ল্যান্ড করল। সমস্যা হচ্ছে, চেয়ারের সাথে যে ম্যানুয়াল, সেটা চায়নিজ ভাষার। প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চেয়ার-অফিসার চায়নিজ জানেন না। ভদ্রলোক আন্দাজে যে মোডেই দেন না কেন, চেয়ার শুধু গরমই হয়, ঠান্ডা হয় না!

এই পুরো ঘটনাটাই ইন্টেরিম আমলের। বিদায়বেলায় আমেরিকার সঙ্গে চুক্তি, ইউনূস স্যারের ভিআইপি প্রটোকল, তাঁর শতকোটি টাকার কর মওকুফ, বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতিসহ হাফ ডজন স্পেশাল ব্যবস্থা নিয়ে সবাই ব্যস্ত থাকায় চেয়ারের এই ত্রুটি তখনকার মতো চাপা পড়ে যায়।

তারপর সেই ঐতিহাসিক কামব্যাক!

বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে আরাম করে চেয়ারটাতে বসতেই তারেক রহমান টের পেলেন, চেয়ার ধীরে ধীরে আগুনের মতো গরম হয়ে উঠছে! তিনি বিস্মিত গলায় চেয়ার-অফিসারকে বললেন, চেয়ার তো গরম!

অফিসার মিনমিনে গলায় বললেন, ‘চেয়ারের ফাংশনই এ রকম। আসলে স্যার, এই চেয়ারে যে বসবে, তার সবকিছুই হবে গরম। তার চা গরম, ভাব গরম, কথা গরম, কার্যক্রম গরম।’

তারেক রহমান ভাবলেন, হবে হয়তো! আর ঠিক এই কারণেই জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি বললেন, চেয়ারটা আসলে আরামদায়ক না, তলা দিয়ে আগুনের হিট বের হয়!

শুনে প্রথমে সবাই হেসে উঠল। তারেক রহমান বললেন, ক্যা বারে, হাসেন ক্যা। যা সত্য, তা–ই তো কোলাম। এটা শুন্যা হাসা লাগবি?

চুমু-শফিক ভাবলেন, আজ থেকেই হটব্যাগের সেঁক দিতে হবে। আগে থেকেই অভ্যাস রাখা ভালো। আর নাহিদ সাহেব ভাবলেন, এই চেয়ার আমার সাইজের না। আমি দুবাই থেকে ঠান্ডা চেয়ার আনাব। ডাবল এক্সএল সাইজ।

অফিসার মিনমিনে গলায় বললেন, ‘চেয়ারের ফাংশনই এ রকম। আসলে স্যার, এই চেয়ারে যে বসবে, তার সবকিছুই হবে গরম। তার চা গরম, ভাব গরম, কথা গরম, কার্যক্রম গরম।’

রুমিন ফারহানা বলতে চাইলেন, আমরা কি ৩০০ জন হামের রোগীর সামনে কথা বলছি, নাকি মাননীয় সংসদ সদস্যের সামনে! চেয়ার তো গরম হচ্ছে ক্ষমতার গরমে! কিন্তু সড়কমন্ত্রী তখন মাইক ছাড়াই বলে বসলেন, চান্দা তো হয় জোর কইরা নিলে, আপসে আপ যা আয়ে গা, তা চান্দা নাহি হো গা। চান্দার গরম গরম না।  শুনে চেয়ার আরও গরম বলে মনে হলো তারেক রহমানের। সংসদে তখন হট্টগোল। বিরোধীরাও কী একটা কার্ড বানিয়ে এনেছে, দেখাতে লাগল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহকে উঠতে হলো। তিনি মাইক ছাড়াই বলতে লাগলেন, ইন্টেরিমের সময় তিনটা কথা ছিল, সংস্কার, বিচার, নির্বাচন—বিদেশ থেকে কিছু শ্বেতশুভ্র বড় ভাই বুদ্ধিজীবী মাথায় টুকরি নিয়ে কিছু সংস্কার আনেন, অলীক প্রস্তাব, নাম বলতে চাই না...তারেক রহমানের চেয়ার যে গরম, সেই আসল কথাটাই সবাই ভুলে গিয়ে নিজ নিজ এজেন্ডা সামনে আনতে লাগল! হাসনাত তার জন্য সরকারি ট্যাকায় ইউএনওর গাড়িটা বরাদ্দ চাইতে খালি গলায় চিক্কুর পাড়তে উঠলে মাননীয় স্পিকার বললেন, এইটা তো শাহবাগ না, সুগন্ধার সামনের ফুটপাতও না... রুমিন বললেন, ছুডু ভাই, গাড়ি নিয়া কী করবা, ত্যাল পাইবা কই? ক্যান, অকটেন কার্ড দিব না? ফজলুর রহমান ওই রাজাকারের বাচ্চারা বলে ওঠার পর হইচইয়ে চেয়ার আরও গরম হয়ে উঠতে লাগল। তারেক ভাবলেন, নিজের চেয়ার নিজেকেই ঠান্ডা করতে হবে।

চেয়ারবিষয়ক বক্তব্যের কয়েক দিন পরের কথা। নির্ধারিত সময়ের ১৫ মিনিট আগেই তারেক রহমান তাঁর কার্যালয়ে ঢুকলেন। এই ১৫ মিনিটের মধ্যেই চেয়ারের টেম্পারেচার অ্যাডজাস্ট করতে হবে। নিজেই করবেন। কিন্তু ম্যানুয়াল খুলতেই তিনি হতভম্ব, হিজিবিজি চায়নিজ লেখা!

তৎক্ষণাৎ জাইমাকে ভিডিও কল, ‘মা, তুমি চায়নিজ জানো?’

‘বাবা, ম্যানুয়ালটার ছবি তুলে এআইকে দাও। এক সেকেন্ডে ইংলিশ করে দেবে।’

তাই তো! তারেক রহমান ছবি তুলে এআইকে দিলেন। এআই সঙ্গে সঙ্গে ইংলিশ করে দিল। এবার তিনি টেম্পারেচার অ্যাডজাস্ট করতে পারলেন। অবশ্য প্রথমে চেয়ারটা বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। পরে আধা ঘণ্টা ধস্তাধস্তির পর চেয়ারের তাপমাত্রা কক্ষ তাপমাত্রার কাছাকাছি এসেছে।

চেয়ার ঠান্ডা হয়েছে শুনে খলিলুর রহমান বললেন, তাহলে কি আপনি দুইবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী না, এই কথাটা মানছেন? না ভুলে যাচ্ছেন? আপনাকে একটা কথা কই। চেয়ার যে মেড ইন চায়না, এইটা যেন আমেরিকানরা কিছুতেই না জানে। তাদের ধারণা, এইটা আমেরিকান চেয়ার। চুক্তিমতে আমরা নতুন মেড ইন ইউএসএ চেয়ার অর্ডার করে দেব।

তারেক রহমান চেয়ার-অফিসারকে ডেকে সব বুঝিয়ে দিলেন। অফিসার বললেন, এটা আমিও পারতাম। তবে স্যার আমি তো চেয়ারে বসে ট্রায়াল দিতে পারি না। তাই বুঝতেও পারি না কতটা গরম বা ঠান্ডা হয়েছে!

চেয়ার ঠান্ডা হয়েছে শুনে খলিলুর রহমান বললেন, তাহলে কি আপনি দুইবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী না, এই কথাটা মানছেন? না ভুলে যাচ্ছেন? আপনাকে একটা কথা কই। চেয়ার যে মেড ইন চায়না, এইটা যেন আমেরিকানরা কিছুতেই না জানে। তাদের ধারণা, এইটা আমেরিকান চেয়ার। চুক্তিমতে আমরা নতুন মেড ইন ইউএসএ চেয়ার অর্ডার করে দেব।

রসরচনা হিসেবে এটি প্রকাশিত হলে ইন্টেরিম মুখপাত্র প্রতিবাদ করেন: ইন্টেরিম চেয়ার কিনতে কাউকে বিদেশে পাঠায় নাই। অতএব, দুর্নীতির প্রশ্নই ওঠে না। হামের টিকা কেনার টাকা নাই, চেয়ার কিনবে কি মাফলার বেইচা!