মাত্র ১৬ বছর বয়সে বৈরাম খাঁ সম্রাট বাবরের রাজদরবারে যোগ দেন। মোগল সাম্রাজ্যের প্রতি অনুগত থেকে তিনি সম্রাট বাবরের বিশ্বস্ত হয়ে ওঠেন। বাবরের মৃত্যুর পর তিনি সম্রাট হুমায়ুনের রাজদরবারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। হুমায়ুনের মৃত্যুর পর তিনি কিশোর সম্রাট আকবরের অভিভাবক হিসেবে আভির্ভূত হন।

পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধে আফগানদের সেনাপতি হিমুর উত্থান ছিল নাটকীয়। প্রথম জীবনে তিনি ছিলেন একজন মুদিদোকানদার। ‍সুরি বংশের শাসক শের শাহর শাসনামলে তিনি প্রথমে দিল্লির হাটবাজার পরিদর্শক হিসেবে এবং পরবর্তী সময়ে পাঞ্জাবের গভর্নর নিযুক্ত হন। শের শাহ মৃত্যুবরণ করলে তাঁর পুত্র ফিরোজ শাহ সিংহাসনে আরোহণ করেন। কিন্তু শের শাহর ভাগনে আদিল শাহ তাঁকে হত্যা করে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। সিংহাসনে আরোহণের পর আদিল শাহ ভোগবিলাসে মেতে ওঠেন। ফলে আঞ্চলিক গভর্নররা তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসেন। তখন আদিল শাহ হেমচন্দ্র হিমুকে রাজসভার উজির হিসেবে নিযুক্ত করে বিদ্রোহ দমনের দায়িত্ব দেন। হিমু একে একে বিদ্রোহী গভর্নরদের দমন করেন।

এমন সময় আদিল শাহ সম্রাট হুমায়ুনের মৃত্যুসংবাদ পান। তখন আদিল শাহ হিমুকে দিল্লি ও আগ্রা অভিযানে পাঠান। হিমু বিনা বাধায় আগ্রা দখল করে দিল্লির দিকে অগ্রসর হন। এরপর তিনি দিল্লির মোগল শাসক তারদী বেগকে পরাজিত করে দিল্লি দখল করেন। দিল্লির মসনদে আরোহণ করে তিনি ‘বিক্রমাদিত্য’ উপাধি গ্রহণ করেন, তাঁর নাম হয় ‘হেমচন্দ্র বিক্রমাদিত্য’।

বৈরাম খাঁ হিমুর দিল্লি বিজয় মেনে নিতে পারেননি। অন্য সভাসদদের নিষেধ সত্ত্বেও তিনি সম্রাট আকবরের পক্ষ থেকে হিমুর বিরুদ্ধে যুদ্ধের ফরমান জারি করেন। তিনি বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সৈন্য জোগাড় করে পদাতিক, অশ্বারোহী ও তিরন্দাজ বাহিনী গঠন করেন। সম্রাট আকবর ও বৈরাম খাঁ তাঁদের অপেক্ষাকৃত দুর্বল বাহিনী নিয়ে দিল্লির দিকে অগ্রসর হন। হিমু তাঁর হস্তীবাহিনীসহ বিশাল বাহিনী নিয়ে এগিয়ে আসেন পানিপথের দিকে। দুই বাহিনী ঐতিহাসিক পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। অপেক্ষাকৃত দুর্বল বাহিনী হওয়ায় বৈরাম খাঁ কৌশলে হিমুর বিশাল বাহিনীকে পরাজিত করার পরিকল্পনা করেন।

মোগল বাহিনী তিন ভাগে ভাগ হয়ে যুদ্ধ করতে থাকে। যুদ্ধের প্রথম দিকে মোগল বাহিনী হিমুর বাহিনীকে দুই দিক থেকে অগ্রসর হয়ে ঘিরে ফেলার চেষ্টা করে। কিন্তু হিমুর বাহিনী মোগলদের আক্রমণ ব্যর্থ করে দেয়। একপর্যায়ে হিমুর বাহিনীর আক্রমণে মোগলরা বিধ্বস্ত হয়ে পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়। তখন বৈরাম খাঁ তিরন্দাজ বাহিনীকে নির্দেশ দেন হিমুকে তিরবিদ্ধ করতে। হিমুর সর্বাঙ্গ বর্ম দ্বারা আবৃত থাকায় শুধু চোখে তিরবিদ্ধ করা সম্ভব ছিল। কিন্তু তিনি বেশ দূরে থাকায় কাজটি কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে।

বৈরাম খাঁ কৌশলে হিমু ও তাঁর হস্তীবাহিনীকে সামনে এগিয়ে আসতে বাধ্য করেন। তখন মোগল বাহিনী হিমুকে উদ্দেশ্য করে ক্রমাগত তির নিক্ষেপ করতে থাকে। একটি তির হিমুর চোখে বিদ্ধ হলে তিনি হাতির পিঠ থেকে নিচে পড়ে যান। হিমুর এ অবস্থা দেখে তাঁর বাহিনী দিশাহারা হয়ে পড়ে। তখন কেউ যুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য এগিয়ে না আসায় হিমুর বাহিনীর মধ্যে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। ফলে অল্প সময়ের মধ্যে হিমুর বাহিনী আকবরের বাহিনীর কাছে পরাজিত হয়।

এই যুদ্ধে উভয় পক্ষের প্রায় পাঁচ হাজার সৈন্য নিহত হন। আহত হিমু মোগল বাহিনীর হাতে বন্দী হন। বৈরাম খাঁ চেয়েছিলেন, সম্রাট আকবর নিজ হাতে হিমুর শিরশ্ছেদ করবেন। কিন্তু সম্রাট আকবর আহত শত্রুকে আঘাত করতে রাজি না হলে বৈরাম খাঁ নিজেই তাঁর শিরশ্ছেদ করেন।

পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধে পরাজয়ের কিছু দিনের মধ্যে আদিল শাহর পতন ঘটে। ফলে ভারতবর্ষে মোগলরা সহজেই তাদের সাম্রাজ্য বিস্তার ঘটাতে সক্ষম হয়। পানিপথের প্রথম যুদ্ধের মাধ্যমে ভারতবর্ষে মোগল শাসনের সূচনা হয়েছিল এবং পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধে জয়লাভের মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষে মোগল শাসন পূর্ণতা পায়।