তুরস্কের এক প্রান্তে ইস্তাম্বুলকেন্দ্রিক অটোমান শাসক যখন মিত্রশক্তির সঙ্গে সেভ্রেস চুক্তি করতে বাধ্য হন, তখন অপর প্রান্ত আঙ্কারায় মোস্তফা কামাল পাশা তাঁর নতুন রাজনৈতিক সংগঠনের অবস্থান দৃঢ় করতে থাকেন। তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ ও চিন্তাভাবনা জনগণের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। দ্বৈত শাসনাধীন তুরস্কের জনগণ অটোমান শাসকের পরিবর্তে মোস্তফা কামাল ও তাঁর রাজনৈতিক দলের প্রতি আস্থাশীল হয়ে ওঠে। ক্রমেই বিশ্বব্যাপী ইস্তাম্বুলকেন্দ্রিক অটোমান সাম্রাজ্য অর্থাৎ সালতানাতের পরিবর্তে আনাতোলিয়ার আঙ্কারাকেন্দ্রিক গ্র্যান্ড ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি তুরস্কের প্রতিনিধিত্ব করতে থাকে। এভাবে ধীরে ধীরে পুরো তুরস্ক মোস্তফা কামাল ও তাঁর গ্র্যান্ড ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির অধীনে আসতে থাকে। ১৯২২ সালের নভেম্বরে গ্র্যান্ড ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি অটোমান সুলতান ষষ্ঠ মেহমেদকে পদচ্যুত করে অটোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটায়। অটোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটালেও খিলাফত বহাল রাখা হয়। নতুন নিয়ম অনুযায়ী খলিফার ধর্মীয় ক্ষমতা বাদে কোনো রাজনৈতিক, বিচারিক ও সামরিক ক্ষমতা ছিল না। শেষ অটোমান সুলতান ষষ্ঠ মেহমেদের ভ্রাতুষ্পুত্র আবদুল মজিদকে নামমাত্র খলিফা নিযুক্ত করা হয়। পরবর্তীকালে ‘খলিফা’ পদটিও বিলুপ্ত করা হয়।

১৯২৩ সালের ২৯ অক্টোবর গ্র্যান্ড ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি তুরস্ককে একটি প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করে। এই ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে তুরস্ক একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়। নবগঠিত প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন মোস্তফা কামাল। এ বছর যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালিসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে তুরস্কের ‘ল্যুজান’ চুক্তি সম্পাদিত হয়। এই চুক্তিতে গ্র্যান্ড ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি তুরস্কের প্রতিনিধিত্ব করে। এই চুক্তির ফলে সেভ্রেস চুক্তি অকার্যকর হয় এবং তুরস্কের পুরো অঞ্চলে সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।

মোস্তফা কামাল প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে তুরস্কে ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম চালান এবং তুরস্ককে একটি পশ্চিমা ভাবধারার ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে পরিণত করেন। তিনি সব রাষ্ট্রীয় কার্যকে ধর্মীয় প্রভাবমুক্ত করেন। এ ছাড়া নারীশিক্ষার অগ্রগতি, বহুবিবাহ বাতিল, নারীদের বিবাহবিচ্ছেদ ও উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা, নারীদের ভোটাধিকার প্রদান, নারী ও পুরুষের পোশাকের পরিবর্তন এবং তুর্কি ভাষায় আরবি বর্ণমালার পরিবর্তে লাতিন বর্ণমালার আলোকে নতুন তুর্কি বর্ণমালার প্রবর্তনসহ অনেক সংস্কার করেন। এসব সংস্কার সাধন করতে গিয়ে দেশের ভেতরে ও বাইরে প্রচণ্ড প্রতিরোধের মুখোমুখি হন তিনি।

মোস্তফা কামাল তুরস্কের ইয়ালোভা অঞ্চলে ভ্রমণের সময় অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ১৯৩৮ সালের ১০ নভেম্বর ৫৭ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত তাঁর মৃতদেহ আঙ্কারার নৃতাত্ত্বিক জাদুঘরে রাখা হয় এবং মৃত্যুর পঞ্চদশ বার্ষিকীতে তাঁকে আঙ্কারার আনিতকাবিরে সমাহিত করা হয়। মৃত্যুর আগে তিনি তাঁর সব স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি রিপাবলিকান পার্টির অনুকূলে দান করে যান।