আমরা এমন একটা দেশে থাকি, যেখানে আগাগোড়া ভালো মানুষের ছড়াছড়ি। ডানে তাকালে ভালো মানুষ, বাঁয়ে তাকালেও ভালো মানুষ। এমন ভালো মানুষ না থাকলে আর কাদের কী হতো জানি না, কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের খুব অসুবিধা হতো।
না না, মজা করছি এমন ভাবার কোনো কারণ নাই। আশপাশে তাকান, আপনিও বুঝবেন।
এই যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহামান্য প্রক্টর সাহেব। খুব অবাক হই ওনার মতো ভালো মানুষ দেখে। একদম মাটির মানুষ, কোনো প্যাঁচগোছ নাই কথায়। কিছুদিন আগে উনি বলেছেন, রাতে মেয়েদের বাইরে থাকার কী দরকার? ওনার বাসার মেয়েরা ১০টার মধ্যেই ঘরে ঢুকে যায়। আর ছেলেদের সঙ্গে আবার মেয়েদের তুলনা হয় নাকি! ছেলেমানুষ রাতে একটু রাস্তায় হেঁটে বেড়াবে, একটু ধুম মাচালে স্টাইলে বাইক চালাবে, একটু মব করবে, এ আর এমন কী।
কিন্তু বিশ্বাস করবেন না, একদল ওনাকে নিয়ে যা-তা বলছে। না, আমি বুঝতে পারছি না। উনি কি কাহাকে গালি দিয়াছেন?
মেয়েমানুষ, হাঁটাহাঁটি করলে শরীরের ওপর চাপ পড়বে না? উনি ভালো চান বলেই তো রাত ১০টার ভেতর ঘরে যেতে বলেছেন। আসলেই তো, এত রাতে মেয়েদের বাইরে থাকা স্বাভাবিক না। যদি কুকুর কামড়ে দেয়?
আর ধরেন, কুকুরও কামড়াল না। কিন্তু ভালো মানুষের ভালোর দামটা তো মেয়েরা দিতে পারবে না। তখন কী হবে?
তাই সমাধান একটাই: ঘরের মেয়ে ঘরে ফিরে যাবে। তার যতই কাজ থাকুক, যতই পড়াশোনা থাকুক, যতই গবেষণা থাকুক, যতই রাত জাগার প্রয়োজন হোক।
রাস্তা নিরাপদ করা গেল না? সমস্যা নাই।
ক্যাম্পাস নিরাপদ করা গেল না? তাতেও সমস্যা নাই।
অন্তত খাঁচায় আটকে রেখে তো নিরাপদ রাখা গেল!
অবশ্য সেখানেও কিছু শর্ত আছে। খাঁচা একবার বন্ধ হলে যত যা-ই হোক, খাঁচা খুলবে না। তাতে দূর থেকে ফিরে সারা রাত যদি বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় মেয়েদের, থাকবে!
এখানে আমি ভদ্রলোকের দোষ দেখি না। আপনারাই জানেন না, হলের তালাগুলো ভোরের আলো না দেখলে খুলতেই চায় না।
অবশ্য যদি আবার আন্দোলন করতে মেয়েদের লাগে, তখন আলাদা কথা। তখন সেই মেয়েরাই তালা ভেঙে বেরিয়ে পড়বে দেশের স্বার্থে। দেশের জন্য মেয়েদের নিয়ে এটুকু ঝুঁকি তো নিতেই হবে! তখন ভালো মানুষেরাই হাততালি দেবে।
আমার মতে, মেয়েদের জন্য অন্য এলাকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা ছোট্ট শাখা করা হোক। মহিলা শাখা। অবরোধবাসিনীরা নাহয় ওখানেই সুখে-শান্তিতে থাকবে।
চারপাশটা উঁচু দেয়াল দিয়ে আটকানো থাকবে। গেট থাকবে। গেটে তালা থাকবে। তালার দায়িত্বে থাকবে আরও কয়েকজন ভালো মানুষ। আর আমাদের অবরোধবাসিনীরা সেখানে প্রজাপতির মতো বদ্ধ বাগানে উড়বে।
বদ্ধ হলেও বাগান তো!
রাত-দিন যেটাই হোক, অন্তত নিরাপদে তো থাকবে।
মহাশয় বিষয়টি বিবেচনায় আনবেন বলেই আমার বিশ্বাস।
আগুন যদি নেভানো না যায়, তাহলে অন্তত আগুনের কাছে না যাওয়াই ভালো। প্রক্টর মহাশয় নিশ্চয়ই এই মহৎ চিন্তা থেকেই এসব বলেছেন।
তাই আপনারা ওনাকে ভুল বুঝবেন না।
উনি বড্ড ভালো মানুষ।
একদম মাটির মানুষ।