ঘুষ খাওয়ার নয়া সমীকরণ

আঁকা: সৌখিন

ঘুষ খাওয়া একসময় ছিল লুকোচুরির বিষয়। এখন দিন বদলেছে। ঘুষ আর শুধু টাকা নেওয়ার ব্যাপার নয়; এটি হয়ে উঠেছে একধরনের সম্পর্কের সমীকরণ। এখানে দুই পক্ষ থাকে—এক পক্ষ দেয়, আরেক পক্ষ নেয়। মাঝখানে থাকে ফাইল, টেবিল, স্বাক্ষর ও অদৃশ্য এক সেতু।

তবে ঘুষের সম্পর্কও সব সময় মসৃণ থাকে না। তাই ঘুষের জগতে টিকে থাকতে চাইলে কিছু ‘ডু’ আর ‘ডোন্ট’ মনে রাখা জরুরি।

যা করবেন—

১. ঘুষের আগে সম্পর্ক বুঝুন:

প্রথম দেখাতেই ঘুষের কথা বলা ঠিক নয়। আগে বুঝুন সামনের মানুষটি কোন গোত্রের। তিনি কি ‘চা-নাশতা’ পর্যায়ের, নাকি সরাসরি ‘ফাইল দ্রুত চলবে’ পর্যায়ের? কারণ, ভুল মানুষকে ভুল অঙ্কের প্রস্তাব দিলে সম্পর্ক শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যেতে পারে।

২. নিজের রেট সম্পর্কে পরিষ্কার থাকুন: 

ঘুষের জগতে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো রেটের স্বচ্ছতা নেই। কেউ বলেন, ‘যা খুশি দেন।’ আবার পরে বোঝা যায়, তাঁর ‘যা খুশি’ কথাটির ন্যূনতম মূল্যও আপনার মাসিক বেতনের চেয়ে বেশি। তাই আগে থেকেই হিসাব পরিষ্কার রাখা ভালো।

৩. সরাসরি কথা বলবেন না: 

অভিজ্ঞ ঘুষগ্রহীতা কখনো বলেন না, ‘টাকা দেন।’ তিনি বলেন, ‘ব্যাপারটা একটু দেখবেন তো।’ এই ‘দেখবেন’ শব্দটির ভেতরেই অনেক সময় পুরো অর্থনীতি লুকিয়ে থাকে।

৪. পুরোনো সম্পর্ককে সম্মান করুন:

যিনি একবার আপনার কাজ করেছেন, তাঁকে ভুলে যাবেন না। ভবিষ্যতে আবার দেখা হতে পারে। ঘুষের দুনিয়ায় নেটওয়ার্কিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আজ আপনার একটি ফাইল, কাল তাঁর একটি সুপারিশ—এভাবেই সম্পর্ক টিকে থাকে।

৫. হিসাব রাখুন: 

অবশ্যই নিজের কত টাকা কোথায় গেল, তা মনে রাখার অভ্যাস করুন। তবে সমস্যা হলো, এই হিসাব লিখে রাখাও বিপজ্জনক। তাই অনেকে নাকি হিসাব রাখেন শুধু স্মৃতিতে। আর স্মৃতির সবচেয়ে সুবিধা হলো প্রয়োজনে বলা যায়, ‘মনে নেই।

যা করবেন না—

১. অতিরিক্ত ঘুষ খাবেন না:

ঘুষেরও একটি সীমা থাকা দরকার। কারণ, অতিরিক্ত খেলে বদহজম হতে পারে। তবে এই বদহজমের লক্ষণ পেটব্যথা নয়, হঠাৎ সম্পদের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া।

২. ঘুষ খেয়ে কাজ ভুলে যাবেন না:

ঘুষ নেওয়ার পর কাজ না করলে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। দাতা তখন ভাবেন, ‘টাকা তো গেল, কাজ গেল কোথায়?’ এটি ঘুষের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় ভুল–বোঝাবুঝি।

৩. সহকর্মীর সঙ্গে নিজের ঘুষের তুলনা করবেন না:

‘সে এত নিল, আমি এত কম কেন?’ এই প্রশ্ন কর্মক্ষেত্রে অশান্তি তৈরি করতে পারে। ঘুষের ক্ষেত্রেও তুলনা বিষের মতো। বিশেষ করে যখন জানা যায়, পাশের টেবিলের লোকটি একই ফাইল থেকে আপনার দ্বিগুণ নিয়েছেন।

৪. ঘুষের বিষয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করবেন না:

‘আজ জীবনের প্রথম বড় অর্জন’ লিখে ছবি দেওয়া ঠিক হবে না। মানুষ ভুল বুঝতে পারে। বিশেষ করে ক্যাপশনে ‘পরিশ্রমের ফল’ লিখলে পরিশ্রমটি আসলে কার—এই প্রশ্ন উঠতে পারে।

৫. ঘুষকে ভালোবাসা ভাববেন না:

কেউ টাকা দিলেই সে আপনাকে ভালোবাসে—এমন ধারণা করা ভুল। সে হয়তো আপনাকে ভালোবাসে না; সে শুধু তার ফাইলটিকে খুব ভালোবাসে। আর ফাইলের ভালোবাসা শেষ হলে সম্পর্কও শেষ।

৬. নতুন ঘুষের জন্য পুরোনো ঘুষ ভুলে যাবেন না:

আজ যে কাজটি বিনা প্রশ্নে করে দিলেন, কাল সেটির জন্য আবার নতুন করে দরদাম করলে পুরোনো সম্পর্কের প্রতি অবিচার হতে পারে। তাই ঘুষের সম্পর্কেও ধারাবাহিকতা প্রয়োজন।

শেষ পর্যন্ত ঘুষের সম্পর্কও অন্য সব সম্পর্কের মতো—হিসাব থাকে, রেট থাকে, ভুল–বোঝাবুঝি থাকে; শুধু পার্থক্য একটাই—এখানে ব্রেকআপ হলে ফাইলটাই সবচেয়ে বেশি কাঁদে।