আমাকে ক্ষমা করবেন

আঁকা: সৌখিন

বললে হয়তো বিশ্বাস করবেন না, তাও বলি, আমার না মাঝে মাঝেই মনে হয়, আমি বোধ হয় এবার মানুষ হয়ে যাব। রাতে ঘুমাতে গেলেই মনে হয়, মশকজীবনের এটাই বোধ হয় আমার শেষ। সকালে উঠে দেখব, আমি আর পাঁচপেয়ে মশা নই, দুপেয়ে মানুষ হয়ে গেছি। মানুষের শরীর দেখেছেন, ছি! ছি! ছি! দুইটা মাত্র পা। আর ভাঙাচোরো দুইটা জিনিস; ওগুলো নাকি হাত! সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, মানুষের কোনো ডানা নেই। নেই বলেই কি আপনাদের এত রাগ আমাদের ওপর?

আপনাদের মধ্যে যাদের সামান্য বুদ্ধি আছে, তারা হয়তো একটু আগেই খেয়াল করেছেন, আমি বলেছি, আমি পাঁচপেয়ে। আসলে আমাদের থাকে ছয় পা। আমি একটা পা হারিয়েছি আপনাদের জন্যই৷ এই তো কদিন আগে পেট ভরে রক্ত খাচ্ছিলাম এক অফিসফেরত মানুষের গালে বসে। এদের রক্ত খেতে আরাম। অনেক দিন ধরে অফিস করা মানুষেরা আর মানুষ থাকে না, ভেজিটেবল হয়ে যায়। সহজে নড়াচড়া করতে পারে না। থাকে না...সোফায় কাত হয়ে পড়ে থাকে। বসের দেওয়া ডেডলাইনের চাপে লোকগুলো হয়ে যায় আলু। সুগার জমায় রক্তে মিষ্টি ভাবও থাকে প্রচুর। সেটাই খাচ্ছিলাম। অমনি চটাশ করে একটা থাপ্পড় আমার ওপর। পড়ি কি মরি করে উড়লাম। লোকটার স্ত্রী মেরেছে। আমার ধারণা, লোকটার গালে চড় বসাবার মোক্ষম সুযোগ পেয়েই মেরেছে। অথচ এই দাম্পত্য কলহে আমাকে হারাতে হলো একটা পা। এ–ও কি মেনে নেওয়া যায়?

তবে শুধু চড়-থাপ্পড় মারা বা আমাকে ন্যাংড়া বানানোর জন্য নয়; আপনাদের আমি অপছন্দ করি আরও অনেক কারণে। প্রথমত বলি, আমি আপনাদের কাছে কী চাই? সামান্য রক্তই তো! আরে, যে রক্তে আমার পেট ভরেও উপচে পড়ে, তার চেয়ে অনেক বেশি রক্ত হাসপাতালে গিয়ে টিউব ভর্তি করে দেন আপনারা। শুধু একটা সাদা অ্যাপ্রন নেই বলেই কি আমাকে রক্ত দিতে আপনাদের এত আপত্তি?

দ্বিতীয়ত, আমাদের থেকে বাঁচার জন্য কতই না তামাশা আপনাদের! কত রংবেরঙের কয়েল জ্বালান রাতদিন। তাতে যত বাজে ধোঁয়া আপনাদের বুকে যায়, তার চেয়ে কি আমার নেওয়া তিন সিপ রক্ত অনেক বেশি কিছু?

এখন তো আবার কারেন্টওয়ালা ব্যাটও চালান আমাদের দিকে। আমার মায়ের আপন ডিমের তিন ভাইবোনকে চোখের সামনে কারেন্ট খেয়ে মরতে দেখেছি। ভুলে যাব মনে করেছেন এই সব? উঁহু! বাপের, দাদার, ভাইয়ের, বোনের আর আমার ঠ্যাঙের... সবার বদলাই আমি নেব!

এ জন্য প্রতিদিন নিজেকে আমি মোটিভেট করি। নিয়মিত গুন গুন করে গান গাই। বেদনাকে মন খুলে বলি, কেঁদো না!

কিন্তু আপনাদের কথাবার্তা শুনে বুঝতে পারি, আমার এই গান গাওয়া নিয়েও আপনাদের আছে কঠিন আপত্তি। ক্যান রে ভাই, এত জ্বালা কিসের আপনাদের?

বললে হয়তো বিশ্বাস করবেন না, তবু বলি...প্রতিশোধের ব্যাপারে আমি অনেকখানি এগিয়ে গেছি। পানিজমা টবে আমাদের রয়েছে বিখ্যাত ল্যাবরেটরি। সেখান থেকে আমি আমার শরীরে ডেঙ্গুর সিরাম চালান করে নিয়েছি৷ কী যে চনমনে লাগে নিজেকে আজকাল! একটা কামড় আপনাদের গায়ে বসাতে পারলেই একদম জ্বরে ফেলে দেব। তারপর শরীরব্যথা, চোখব্যথা, মাথাব্যথা। বুঝবেন, মশাদের পঙ্গু করার কী মানে; বুঝবেন, আমাদের থাবড়া আর কারেন্টের শক দিয়ে মারলে কী দুরবস্থা হয় আপনাদের!

বললে হয়তো বিশ্বাস করবেন না, তবু বলি...আপনাদের ধন্যবাদও জানাই। এই যে আপনারা টবে, এসিতে, ড্রেনে পানি জমিয়ে আমাদের বংশবৃদ্ধিতে সাহায্য করছেন, এমন অবদান আসলে ভোলার মতো নয়। ওদিকে সিটি করপোরেশনও যখন শাকিব খানের মতো ইয়াব্বড় গান নিয়ে বের হয়, তখন মন খুশিতে ভরে ওঠে। কেরোসিনের ওই ধোঁয়া, বললে হয়তো বিশ্বাস করবেন না, তবু বলছি, কী যে আরাম লাগে! এই ধোঁয়া নাকে ঢুকলেই মাথায় হয় অদ্ভুত ঝিমঝিমানি। সারাটা দিন কী যে আবেশে কাটে! মানুষকেও তখন ভালো লাগে। কারও গালে, কারও কপালে বসে তখন চকাশ চকাশ করে চুমু খাই। একই গান বারবার গাই। একই কথা বলি বারবার। মানুষকে ধরে বলতে ইচ্ছা করে, ভাই, আমি আপনাদের ডেঙ্গু দিচ্ছি, আমাকে ক্ষমা করবেন।

আমার বন্ধু বলে, এটা নাকি নেশা। নেশা হলে নাকি আমি একই গান গাই। একই কথা বারবার বলি। বারবার নাকি ক্ষমা চাই। আপনারাই বলেন, আমি কি একই কথা বারবার বলছি? আমি কি বারবার ক্ষমা চাচ্ছি... কিন্তু আমার বন্ধু বলে যে...