পোল্যান্ডের ১৭ বছর বয়সী এক ইহুদি তরুণ হার্শাল গ্রিন্সজপ্যান তখন ফ্রান্সে পড়ালেখা করছিলেন। তিনি খবর পান পোল্যান্ড সীমান্তে তাঁর মা-বাবা মারা গেছেন। মা-বাবা হত্যার প্রতিশোধ নিতে নভেম্বরের ৭ তারিখে হার্শাল প্যারিসে নিযুক্ত এক জার্মান কূটনীতিককে গুলি করেন। দুই দিন পর ওই কূটনীতিক মারা যান। এই মৃত্যুর খবর হিটলারের কাছে পৌঁছালে তাঁর নির্দেশে প্রচারণামন্ত্রী জোসেফ গোয়েবলস সেদিনই ইহুদিদের বিরুদ্ধে হিংসাত্মক প্রতিশোধের আহ্বান জানান।

৯ নভেম্বর রাতে হিটলারের গোপন পুলিশ বাহিনী ‘গেস্টাপো’র প্রধান পুরো পুলিশ বাহিনীকে একটি টেলিগ্রাম পাঠিয়ে জানান, দ্রুততম সময়ে ইহুদিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হবে। পুলিশ বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়, তারা যেন এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করে। পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিসকে আগুন নেভানো থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়।

সেই রাতে জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার ইহুদিদের জীবনে নেমে আসে এক ভয়ংকর দুর্যোগ। দুই দিন দুই রাত ধরে চলা সহিংসতায় ইহুদিদের প্রায় সাড়ে সাত হাজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়। ভেঙে ফেলা হয় ইহুদিদের ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল। ধ্বংস করা হয় অনেক সম্পদ। এক হাজারের বেশি ইহুদি উপাসনালয় পুড়িয়ে দেওয়া হয়। আবার ধ্বংসপ্রাপ্ত উপাসনালয়গুলোর ধ্বংসস্তূপ ইহুদি সম্প্রদায়কেই পরিষ্কার করতে বলা হয়। হত্যা করা হয় প্রায় ১০০ ইহুদিকে, গ্রেপ্তার করা হয় প্রায় ৩০ হাজার জনকে। এ সবকিছুই ঘটে সরকারের ছত্রছায়ায়। গণহত্যা শেষে এর একটি কাব্যিক নাম দেওয়া হয়, যা হলো ‘ক্রিস্তালনাহ্‌খত’ বা ‘ভাঙা কাচের রাত’।

এই নাম জার্মানিতে ইহুদি অস্তিত্বের চূড়ান্ত বিনাশের প্রতীক। এই গণহত্যা নাৎসিশাসিত জার্মানিতে ইহুদিদের বেঁচে থাকা অসম্ভব করে তোলে। নাৎসি সরকার ১৫ নভেম্বর থেকে ইহুদিদের স্কুলে যেতে বাধা দেয় এবং নভেম্বরের শেষের দিকে স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে কারফিউ আরোপের অনুমতি দেয়। ডিসেম্বরের মধ্যে ইহুদিদের জার্মানির বেশির ভাগ প্রকাশ্য স্থানে যাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ও যুদ্ধ চলাকালীন হিটলারের অধীনস্ত জার্মান নাৎসি বাহিনী ইউরোপের ইহুদি জনগোষ্ঠীর অর্ধেকের বেশি অংশকে হত্যা করে। এই সংখ্যা আনুমানিক ৬০ লাখ। এ ছাড়া সোভিয়েত যুদ্ধবন্দী, কমিউনিস্ট মতাবলম্বী, সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠী, শারীরিক–মানসিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মতাদর্শের প্রায় ৫০ লাখ মানুষকে হত্যা করা হয়।