কথায় যুক্তি আছে। মাঠ ফাঁকা পেলেও গোল দেওয়ার বেলায় তাহলে শর্ত প্রযোজ্য। অনেককে বলতে শুনি, নির্বাচনের আগে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করতে হবে। আরিফ সাহেবকে প্রশ্ন করলে বললেন, ‘খেলব আমরা, ভোট দেব আমরা, তাহলে তাঁরা “লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড” কেন চান? খেলাটা তো ভোটারদেরই হওয়ার কথা। তাই না? ওই যে কথায় কথায় বলে না, জনগণই সব ক্ষমতার উৎস। খেলাটা জনগণই জমাতে বা ভন্ডুল করে দিতে পারে।’

আমি বলি, ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ছাড়াও তো অনেক খেলা হয়। হয় না? “ইমপসিবল ক্লাইম্ব রেস” নামে মোটরবাইকের রেস হয় পাহাড়ে। যেখানে লেভেল বলতে কিছু নেই! কী বলেন, ভাই?’

আরিফ সাহেব এমনভাবে তাকালেন যে কথা আর বাড়ালাম না। আর কিছুক্ষণ কথা বললে তিনি হয়তো অন্য লেভেলে চলে যাবেন! তার আগেই কেটে পড়লাম।

কেটে পড়ে আর যাবই–বা কোথায়! খেলা তো হবেই। আমি ফুটবল বিশ্বকাপের কথা বলছি। প্রতি চার বছর পর পর বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষের নাগরিকত্ব পাল্টে যায়। যাকে বাংলাদেশি হিসেবে চিনতাম, সে পরিচয় দেয় হয় আর্জেন্টাইন বা ব্রাজিলিয়ান হিসেবে। কী মুশকিল!

কয়েক বছর আগে আমাদের পাড়ার এক চাচা ঘোষণা দিয়েছিলেন, এই বিশ্বকাপে তাঁর দল না জিতলে নিজের মাথার সব চুল ফেলে দেবেন। তাঁর দল যেদিন হেরে গেল পরদিন থেকে সবাই চাচাকে খুঁজতে লাগল। কদিন পর চাচার চাঁদবদনটা দেখা গেল। যে–ই কথা সে–ই কাজ। মাথার চুল কামিয়ে বিপক্ষ দলের তারকা খেলোয়ারের মতো ‘লুক’ নিয়েছেন চাচা। জানা গেল, মাথার খুশকি নিয়ন্ত্রণে আসছিল না বলেই নাকি শখের চুল ফেলার অভিনব ঘোষণাটা তিনি দিয়েছিলেন! আদতে ফুটবল বিশ্বকাপের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্কই নেই!

আবার রাজনীতির মাঠে প্রবেশ করি। একজন মানুষের সব বিষয়ে জ্ঞান থাকবে, এমনটা আশা করার কোনো কারণ নেই। তবে কিছু বিষয়ে ন্যূনতম জানা–বোঝা না থাকলে সমস্যাই বটে। বিশেষ করে যখন ওই বিষয় সংশ্লিষ্ট একটা কাজে কেউ অংশ নিতে যাচ্ছেন। এক জনদরদি (যিনি অনেক বিদ্যালয় কমিটির সভাপতি এবং নিজে বিদ্যালয়ের বারান্দা মাড়াননি কোনো দিন) প্রধান অতিথি হিসেবে গেলেন আন্তবিদ্যালয় ফুটবল খেলা দেখতে। খেলা শুরুর একটু পর তিনি দাঁড়িয়ে হাত ইশারা করে খেলা বন্ধ করতে বললেন। খেলোয়াড়দের প্রশ্ন করলেন, ‘বাবারা, তোমরা ২২ জন মিলে একটা বল নিয়ে কী করতে চাইতেছ?’

একজন বলল, ‘কেন চাচা, গোল করতে!’

তখনই তিনি রেগে গেলেন, ‘আমারে বেকুব পাইছ? এই বলটাই তো গোল! চারকোনা বা তিনকোনা হইলে না তোমরা গোল করতে পারতা। আর আমার তো খুবই লজ্জা লাগতেছে। আমি অত্র এলাকার বিশিষ্ট মানুষ। আমি বাঁইচা থাকার পরও ২২ জন মানুষ একটা বল দিয়ে খেলবে কেন? আমাদের কি এতই অভাব?’

নেতার এক চামচা স্লোগান ধরল, ‘সামনে আছে অমুক ভাই, খেলা এখন জমুক ভাই!’

আরেক চামচা বলল, ‘বল দাও মোদের বল দাও, না থাকলে অমুক ভাই রে কল দাও।’

আকাশ-পাতাল কাঁপিয়ে এই স্লোগান পৌঁছে গেল ঘরে ঘরে। রেফারি অনেকক্ষণ পর প্রধান শিক্ষকের কানে কানে জানতে চাইলেন, ‘স্যার, খেলা হবে?’

প্রধান শিক্ষক মাইকে ঘোষণা দিলেন, ‘এবার খেলা হবে।’

দর্শকও তালি দিয়ে সমস্বরে বলে উঠল, ‘খেলা হবে!’