জটিল প্রেমতন্ত্র

আঁকা: আসিফ গনি

আজকাল প্রেম করার চেয়ে বোধ হয় দেশে রাজনীতি করা বেশি সহজ। না মানে, তেমন আর কাজ কই! শুধু তো হ্যাঁ-তে হ্যাঁ আর না-তে না মেলানোই। আর মাঝেমধ্যে একটু গলাবাজি করা, হালকা-পাতলা ভাব নিয়ে মারধর দেওয়া।

এদিকে প্রেমিকার সঙ্গে বাক্‌স্বাধীনতাও দূর থেকে আমার দিকে করুণার দৃষ্টিতে তাকায়। মাঝেমধ্যে মনে হয়, আন্দোলন করি, স্লোগান দিই, ‘লড়াই লড়াই লড়াই চাই, লড়াই করে বাঁচতে চাই।’ কিন্তু এই লড়াই কি সেই লড়াই! এই লড়াই মানে দ্য এন্ড।

এগুলা তো আর সহ্য করার মতো না, তাই না? সেদিন আমাকে ফোন করে বলল,

‘ফেসবুকে এটা কী ছবি আপলোড দিসো? ডিলেট করো, সমস্যা হবে। কুইক!’

আরে ভাই, আমার ফেসবুক, আমার ছবি। তুই ক্যান বলবি আমাকে ডিলেট করতে?

মনের ভেতর তখন গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা—সব একসঙ্গে জেগে উঠল। মনে হলো, আজ আর ছাড় নাই। আজকে একটা হেস্তনেস্ত করেই ছাড়ব।

কিন্তু মনের আয়নাঘর থেকে আরেক আমি উঁকি দিয়ে বলল,

‘করো ভাই, তাড়াতাড়ি ডিলেট করো। ছবি দিয়ে কী হবে? আগে পরিস্থিতি শান্ত রাখো।’

আমি ডিলেট করে দিলাম।

এ ঘটনার পর থেকেই বুঝলাম, দেশের রাজনীতিতে বিরোধী দলের ক্যারিশমা থাকলেও আমার প্রেমনীতিতে বিরোধী দলের কার্যকর ক্ষমতা নেই।

আরেক দিন তো সব সীমা পার করে ফেলেছে।

বললাম,

‘বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে যাব।’

বলে,

‘বিয়ের পর বউয়ের সঙ্গে যেয়ো।’

আমি মনে মনে ভাবলাম, এ তো সরাসরি আমার চলাফেরার স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ!

আমার প্রতিবাদী মন তখন স্লোগান দেওয়ার প্রস্তুতি নিল—‘তুমিও জানো, আমিও জানি...’

তারপর থেমে গেল। বাকিটা শেষ করার সাহস হয়নি। কারণ, আমি জানি, রাজনীতিতে স্লোগান দিলে মিছিল হয়, কিন্তু প্রেমে স্লোগান দিলে মেসেজ আসে—‘কীহ! এত বড় সাহস...’ তারপর বিশাল বিশাল মেসেজ। আবার দ্য এন্ড।

এ জায়গাটাতেই আমার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষ।

চেয়েছিলাম ক্যাম্পাসের বিশাল নেতা হতে। মাইক হাতে নিয়ে বক্তৃতা দেব, সামনে হাজার মানুষ, পেছনে ব্যানার, চারদিকে স্লোগান। কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস—পাতি নেতা হয়েই জীবন কাটাতে হচ্ছে।

তারপর ভাবলাম, সবাই তো প্রেমের তাজমহল বানায়। কেউ কবিতা লেখে, কেউ গান লেখে, কেউ চাঁদ এনে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। আমি একটু ভিন্ন কিছু করি।

আমি একটা সংবিধান বানাই।

সেদিন সারা রাত জেগে ১৮ পৃষ্ঠার একটা প্রস্তাব লিখলাম।

প্রথমেই মৌলিক অধিকার। তারপর ব্যক্তিস্বাধীনতা। এরপর চলাফেরার স্বাধীনতা। তারপর ফেসবুকে ছবি আপলোডের স্বাধীনতা। এমনকি জরুরি অবস্থায় প্রেমিকার ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা নিয়েও একটা ধারা রাখলাম।

শেষে লিখলাম—

‘এই সংবিধানের কোনো ধারা কোনো পক্ষ এককভাবে পরিবর্তন করতে পারবে না।’

নিজের লেখায় নিজেই মুগ্ধ হয়ে গেলাম।

ভাবলাম, সকালে এটা দেখালে সে বুঝবে—আমি শুধু প্রেমিক না, আমি একজন সাংবিধানিক প্রেমিক।

সকালে খুব গম্ভীর মুখে ১৮ পৃষ্ঠার প্রস্তাবটা তার সামনে ধরলাম। আমার ১৮ পৃষ্ঠা খারিজ করতে ওর ১৮ সেকেন্ডও লাগল না।

নরম সুরে শুধু বলল,

‘এসবের কী দরকার? তুমি যা চাও, সেটা বললেই তো পারো। আমি কি কোনো কিছুতে কখনো তোমাকে না করেছি?’

আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম।

তারপর একটা হাসি দিয়ে বললাম,

‘না, তা তো ঠিক।’

প্রস্তাবটা ভাঁজ করে সরিয়ে রাখলাম।

সেদিন বুঝলাম, এত দিন আমি ভুল জায়গায় রাজনীতি করে আসছি। সংবিধান দিয়ে দেশ চলুক বা না-চলুক, প্রেম চলবে না। এখানে তো ১৮ পৃষ্ঠার সংবিধানের চেয়ে একটা লাইনই যথেষ্ট—

‘তুমি যা বলো, সেটাই ঠিক।’

তারপরও মাঝেমধ্যে আমার ভেতরের পাতিনেতা জেগে ওঠে। ভাবি, আবার আন্দোলন করব। সবাইকে ডেকে বলব—‘রাজুতে আয়!’

কিন্তু তারপর ফোন আসে।

‘কোথায়?’

আমি বলি, ‘বাসায়।’

‘খাইছ?’

‘না।’

‘তুমি না খেলে আমিও খাব না।’

‘আচ্ছা খেয়ে নিচ্ছি, তুমিও খাও।’

আর এরই মধ্য দিয়ে প্রতিবার আমি হেরে যাই প্রেমনীতির কাছে। দেশের রাজনীতি যেদিকেই যাক, প্রেমনীতির রাস্তা সুদূরপ্রসারী।