তুতেনখামেন মারা যাওয়ার পর মিসরের ধর্মীয় ঐতিহ্য অনুসারে তাঁকে মমি করা হয়। প্রাচীন মিসরীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী তাঁর সমাধিকক্ষ তির, ধনুক, বর্শা, রথ, আসবাব, মূর্তি, কাপড়সহ অসংখ্য জিনিস দিয়ে পরিপূর্ণ ছিল। মৃত্যু-পরবর্তী জীবনে রাজার সেবা করার জন্য দাস–দাসীর মমি করা মৃতদেহও দেওয়া হয় সমাধির ভেতর।

১৮৯১ সালে ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিক হাওয়ার্ড কার্টার যখন প্রথম মিসরে আসেন, তখন বেশির ভাগ প্রাচীন মিসরীয় সমাধি আবিষ্কৃত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তখনো রাজা তুতেনখামেনের সমাধির খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর কার্টার তুতেনখামেনের সমাধির খোঁজে পুনরায় নিবিড় অনুসন্ধান শুরু করেন। এই খননকার্যের অর্থায়ন করেন ব্রিটিশ ধনকুবের লর্ড কার্নারভন। দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে ১৯২২ সালের ৪ নভেম্বর তিনি ‘ভ্যালি অব কিংস’ নামক স্থানে রাজা ষষ্ঠ রামসেসের সমাধির প্রবেশদ্বারের কাছে পাথরের টুকরার তলায় চাপা পড়ে থাকা একটি সিঁড়ি আবিষ্কার করেন। এই সিঁড়ি থেকে পাথরগুলো সরানোর পর দৃশ্যমান হয়ে ওঠে রাজা তুতেনখামেনের সমাধির বন্ধ দরজা। দরজা খুলে তাঁরা একে একে খুঁজে পান চারটি সমাধিকক্ষ। এর মধ্যে চতুর্থ কক্ষে পাওয়া যায় তুতেনখামেনের মমি করা মৃতদেহ।

তাঁরা পাথরের তৈরি একটি বাক্স খুঁজে পান, যার মধ্যে একটির ভেতর একটি করে মোট তিনটি কফিন রাখা ছিল। তিনটি কফিনের শেষটি ছিল পুরু সোনার তৈরি। এই কফিনটির মধ্যেই পাওয়া যায় রাজা তুতেনখামেনের প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগের মমিকৃত অক্ষত মৃতদেহ। রাজার মাথায় পরানো ছিল অসাধারণ নিপুণতায় তৈরি একটি সোনার মুখোশ (পরবর্তী সময়ে মমির মাথা কেটে এই মুখোশ খোলা হয়)। মমির ওপর ও কফিনের ভেতর পাওয়া যায় প্রচুর হীরা-জহরত। কয়েক বছর ধরে চার কক্ষের সমাধিটি যত্নসহকারে অন্বেষণ করে কয়েক হাজার বস্তুর একটি সংগ্রহ উন্মোচন করা হয়। মিসরের যত প্রাচীন সমাধি পাওয়া গেছে, তার মধ্যে সবচেয়ে সমৃদ্ধ হলো তুতেনখামেনের সমাধি। এই সমাধির আবিষ্কার বিশ্বব্যাপী আলোচিত হয়। নতুন করে লেখা হয় প্রাচীন মিসরের ইতিহাস।

এরপর দশকের পর দশক ধরে মমিটি নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়। এক্স-রে রিপোর্টে তুতেনখামেনের মাথার পেছনের দিকে আঘাত ও রক্ত জমাট বাঁধার চিহ্ন পাওয়া যায়। এ থেকে ধারণা করা হয় তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তাঁর ডিএনএ পরীক্ষার ফল থেকে জানা যায়, মস্তিষ্কে ম্যালেরিয়ার জীবাণুর সংক্রমণ তাঁর অকালমৃত্যুর কারণ। মাথার পেছনের আঘাতটি মমিকরণের সময় সৃষ্টি হয়েছিল। অনেক গবেষক দাবি করেন, তাঁর রক্তে লোহিত রক্তকণিকার অভাব ছিল। তাঁরা মনে করেন, মা–বাবা পরস্পর ভাই–বোন হওয়ায় জিনগত সমস্যার কারণে মা–বাবার কাছ থেকে রক্তের কোনো রোগ পেয়েছিলেন তুতেনখামেন এবং এ কারণেই মৃত্যু হয় তাঁর।