সবেমাত্র ক্লাস শুরু হলো। এমন সময় স্কুলের আয়া রাবেয়া দিগ্বিদিক হারিয়ে পঞ্চম শ্রেণির ক্লাসরুমে হুড়মুড় করে প্রবেশ করল। হাফপ্যান্ট পরা দুষ্টু ছাত্রের মতো হাঁপাতে হাঁপাতে সে একেবারে টেবিলে গিয়ে ক্র্যাশ ল্যান্ডিং করে বলল, ‘ছার, মোবারক শ্যাষ! ইন্তেকাল... ’
টিচার হকচকিয়ে চোখ তুলে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী শ্যাষ? কীভাবে শেষ!’
রাবেয়ার তখন হৃৎস্পন্দন দুই শ পার হয়ে গেছে। সে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ‘জানি না, ছার! চোখমুখ উল্টাইয়া বেদিশা হইয়া পাকনা কাঁঠালের মতো ধপাস কইরা মোবারক আছাড় খাইছে!’
ছাত্ররা রাবেয়ার এই শব্দচয়ন শুনে হাসতে হাসতে বেঞ্চের নিচে গড়াগড়ি খাচ্ছিল। পেটে ব্যথা উঠে যাওয়ায় দুই-তিনজন ছাত্র রীতিমতো উপুড় হয়ে মেঝেতে শুয়ে পড়ল।
টিচার ধমক দিয়ে কোনোমতে ক্লাস সামলে দ্রুত স্কুলের পিয়ন মোবারকের রুমে ছুটে গেলেন। গিয়ে দেখেন, বেচারার অবস্থা একেবারে কাহিল! ঘেমে পুরো একাকার; মনে হচ্ছে, গোসল করে সরাসরি পুকুর থেকে উঠে এসেছে। কয়েকজন ছাত্র তাকে ঘিরে ধরে খাতা দিয়ে বাতাস করছে আর ফনফনে গলায় বলছে, ‘চোখ খোল, মোবারক! চোখ খোল!’
রাবেয়া ইতিমধ্যে একবালতি ময়লা পানি এনে মোবারকের মাথায় দেদার ঢেলে যাচ্ছে। মোবারক চোখ খোলার চেষ্টা করছে, কিন্তু তার সম্পূর্ণ চোখ তখন সাদা! চোখের মণি ওপরে উঠে ছাদের দিকে তাকিয়ে আছে। বেচারা কোনোভাবেই স্বাভাবিক হতে পারছে না। তার চেহারা দেখে মনে হচ্ছিল, সে স্বয়ং যমদূতের সাথে বিশেষ মিটিংয়ে ব্যস্ত!
অবস্থা বেগতিক দেখে টিচার মোবারকের কপালে ফুঁ দিতে দিতে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হঠাৎ মোবারকের এই মহাশূন্যে যাওয়ার দশা হলো কেন?’
ছাত্রদের মধ্য থেকে চশমা পরা একজন ফিক করে হেসে বলল, ‘স্যার, বিদ্যুৎ অফিস থেকে মোবারকের বাসার কারেন্ট বিল পাঠাইছে। বিল আসছে দুই হাজার পঁচাত্তর টাকা! মোবারক সেই বিল হাতে নিয়ে হিসাব করতে করতে হঠাৎ দেখল, পুরো এলাকায় লোডশেডিং শুরু হইছে। দিনের বেলায়ও ঘুটঘুটে অন্ধকারে ওই বিলের কাগজটাকে তার কাছে জ্যান্ত একটা ভূত মনে হয়েছিল। সেই ভয়ে সে এমন এক রাম আছাড় খাইছে যে সোজা রকেটগতিতে অজ্ঞান!’
মোবারক কোনোমতে কাঁপা কাঁপা গলায় চোখ উল্টিয়ে ফিসফিস করে বলল, ‘স্যার... বিলের কাগজটা আমারে গিলে খাইতে আসছে... সারা মাস লোডশেডিং, কারেন্ট নাই, ফ্যান চলে না, ভুতুড়ে বিলের কাগজের সরকারি লোগোটা হাঁ কইরা আমারে গিলে খাইতে আসছে... আমারে বাঁচান!’
টিচার দীর্ঘশ্বাস ফেলে পকেট থেকে একটা হ্যান্ডফ্যান বের করে বললেন, ‘উঠে বসো মোবারক! ভূত তো দূরের কথা, বিদ্যুৎ অফিস তোমারে আস্ত রাখবে না, যদি তুমি বিল পরিশোধ না করো!’
সেকেন্ড পিয়ন কালু মিয়া এসে বলল, ‘স্যার, বিদ্যুৎ বিল দেওয়ার জন্য আমি এনজিওতে লোনের আবেদন কইরা আসলাম। আগামী মাস থেকে নাকি প্রিপেইড মিটার লাগানো হবে। মোবারক ভাই, ওঠেন। লোন লাগলে জানাইয়েন।’
এটা শুনে মোবারক জ্ঞান হারাল। একজন ছাত্র বলল, ‘এবার তার নিজেরই লোডশেডিং শুরু হয়ে গেছে।’