মহাকাশে পাঠানোর আগে থেকেই ছয় কেজি ওজনের লাইকার প্রশিক্ষণ পর্ব শুরু হয়। স্পুতনিক-২ উপগ্রহের কক্ষটি ছিল ছোট। ফলে কুকুরটিকে ছোট স্থানে থাকার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পরিয়ে রাখা হয় বিশেষ ধরনের পোশাক। রকেটের শব্দের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য বিকট শব্দের সঙ্গে অভ্যস্ত করানো হয়। এ ছাড়া রকেটের প্রবল বেগের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য কুকুরটিকে প্রচণ্ড বেগে ঘুরতে থাকা যন্ত্রের ভেতর রেখে দেওয়া হতো। মুক্ত লাইকাকে পরাধীনতার শিকল পরিয়ে এভাবে দিনের পর দিন নিষ্ঠুর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

অভিযোগ করা হয়, মহাকাশে পাঠানোর সময় কুকুরটিকে মাত্র সাত দিনের অক্সিজেন আর অল্প কিছু খাবার দেওয়া হয়েছিল। তখন সোভিয়েত বিজ্ঞানীরা দাবি করেন, লাইকা সাত দিন বেঁচে ছিল। সাত দিন পর অক্সিজেন ফুরিয়ে যাওয়ার আগে তাকে মেরে ফেলা হয়। কিন্তু এ ঘটনার ৪৫ বছর পর জানা যায় উৎক্ষেপণের মাত্র সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার মধ্যেই কক্ষের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বিকল হয়ে পড়ে। ফলে তাপমাত্রা অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেলে লাইকার মৃত্যু হয়। এ ছাড়া মৃত্যুর আগে লাইকা প্রচণ্ড আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। মৃত লাইকাকে সঙ্গে নিয়ে উপগ্রহটি সাড়ে পাঁচ মাস ধরে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে। এরপর ১৯৫৮ সালের ১৪ এপ্রিল পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে উপগ্রহটি ধ্বংস হয়ে যায়। ভস্মীভূত হয়ে যায় লাইকার মৃতদেহ।

তখন এ ঘটনা সোভিয়েত ইউনিয়নসহ সারা বিশ্বের বিজ্ঞানীমহলে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি করে। লাইকার প্রতি মানুষের সহানুভূতি থেকে সে সময় সোভিয়েত ইউনিয়নে পোস্টার, সিগারেটের প্যাকেট, ম্যাচ বাক্স থেকে শুরু করে বিভিন্ন পণ্যে লাইকার ছবি ও কার্টুন স্থান পেতে থাকে, ছাড়া হয় লাইকার ছবিযুক্ত বিশেষ ডাকটিকিট ও খাম। ২০০৮ সালে রাশিয়ার একটি সামরিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানে লাইকার স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়।

লাইকাকে মহাকাশে পাঠানোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকেই পরে অনুশোচনা ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন কুকুরটিকে জেনেশুনে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার জন্য। পরবর্তী সময়ে মহাশূন্যে আরও অনেক প্রাণী পাঠানো হলেও সেগুলোকে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা নিয়েই পাঠানো হয়। লাইকার মৃত্যু সবাইকে ব্যথিত করলেও এ অভিজ্ঞতা থেকেই বিজ্ঞানীরা মহাকাশে মানুষ পাঠানোর প্রচেষ্টায় অনেকটা পথ এগিয়ে যান। তাই মহাকাশ জয়ের ইতিহাসে লাইকার নাম চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।