ডোবার ধারে গবেষণা

আঁকা: হিয়া ভিনসেন্সা গমেজ

চসিকের রসিক কর্মকর্তারা যাবেন ফ্লোরিডা। দেখবেন মশা মারা, শিখবেন নয়া প্রযুক্তি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বেরসিকের মতো সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, মশা মারা শিখতে ফ্লোরিডা যেতে হবে না, ডোবার পাশে গেলেই যথেষ্ট শিক্ষা হবে।

সবাই হাততালি দিল। হাততালির চোটে কয়েকটা মশা সেখানেই দশা পেয়ে গেল।

নেতার বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত হলেন দুই বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা। তাঁরা ভাবলেন, এত দিন আমরা বই পড়েছি, গবেষণাপত্র পড়েছি, বিদেশে প্রশিক্ষণ নিয়েছি—সবই বৃথা! আসল জ্ঞান তো ডোবার ধারে!

পরদিন সকালে তাঁরা একটি বিশাল ডোবার পাশে গিয়ে বসলেন। সঙ্গে নোটবই, কলম, দুরবিন, ল্যাপটপ— এমনকি মশার জীবনদর্শন নিয়ে লেখা একটি মোটা বইও ছিল।

প্রথম কর্মকর্তা বললেন, ‘দেখুন, বিজ্ঞান মানে পর্যবেক্ষণ।’

দ্বিতীয় কর্মকর্তা মাথা নেড়ে বললেন, ‘ঠিক। আমরা পর্যবেক্ষণ করব, মশারা কীভাবে ধ্বংস হয়।’

কিন্তু মশাদের পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন।

ডোবার ওপর কালো মেঘের মতো একদল মশা ঘুরছিল। তারা জরুরি সভা ডাকল।

প্রধান মশা বলল, ‘মানুষেরা আবার গবেষণা করতে এসেছে। এবার তাদেরই গবেষণার বিষয় বানাও!’

এক মিনিটের মধ্যেই হাজার হাজার মশা দুই কর্মকর্তার ওপর আক্রমণ চালাল।

প্রথম কর্মকর্তা নোটবই দিয়ে আত্মরক্ষা করতে গেলেন। দ্বিতীয় কর্মকর্তা বৈজ্ঞানিক ভাষায় বললেন, ‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাচ্ছে!’

তারপর যা ঘটল, তা বাংলাদেশের গবেষণার ইতিহাসে বিরল।

মশারা দুই কর্মকর্তাকে এমনভাবে ঘিরে ধরল যে দূর থেকে মনে হচ্ছিল, তাঁরা কালো কম্বল জড়িয়ে বসে আছেন। কিছুক্ষণ পর দেখা গেল, মশার দল তাঁদের নোটবই, কলম আর গবেষণার কাগজপত্রের ওপর বসে নিজস্ব সম্মেলন শুরু করেছে।

অনেক কষ্টে দুই কর্মকর্তা সেখান থেকে পালিয়ে এলেন। অফিসে ফিরে তাঁরা একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন লিখলেন। প্রতিবেদনের উপসংহারে লেখা ছিল—

‘ডোবার ধারে বসে আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক সত্য আবিষ্কার করেছি—মশা নিধনের আগে মশার কামড় থেকে বাঁচার ব্যবস্থা করা জরুরি।’

প্রতিবেদন পড়ে নেতারা সন্তুষ্ট হয়ে বললেন, ‘দেখেছ? গবেষণা করলে ফল পাওয়া যায়!’

২.

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কয়েকজন কর্মকর্তা মন খারাপ করে বসে রইলেন। তাঁদের নতুন স্যুট বানানো হয়েছিল, ট্রাভেল ব্যাগ কেনা হয়েছিল, কেউ কেউ ইউটিউবে ‘ফ্লোরিডায় কীভাবে সেলফি তুলবেন’ শীর্ষক ভিডিও পর্যন্ত দেখে ফেলেছিলেন। একজন তো ইংরেজিতে মুখস্থ করে ফেলেছিলেন, ‘আই অ্যাম হিয়ার ফর মস্কিটো ম্যানেজমেন্ট!’

হঠাৎ শুনতে হলো, ফ্লোরিডা যাওয়ার দরকার নেই, ডোবার পাশে বসলেই হবে।

ফ্লোরিডা সফর বাতিল হওয়ার পর কয়েকজন কর্মকর্তা এতটাই হতাশ হলেন যে তাঁরা অফিসে এসে গুগল ম্যাপ খুলে ফ্লোরিডার রাস্তা ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলেন। একজন তাঁর নতুন সানগ্লাস ড্রয়ারে লুকিয়ে রাখলেন, আরেকজন পাসপোর্ট বের করে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

শেষ পর্যন্ত তাঁদের জন্য একটি ‘ভার্চ্যুয়াল স্টাডি ট্যুর’–এর আয়োজন করা হলো। প্রজেক্টরে ফ্লোরিডার ছবি দেখানো হলো, আর জানালা খুলে দেওয়া হলো, যাতে বাইরের মশারা ভেতরে ঢুকতে পারে। আয়োজকেরা বললেন, ‘দেখুন, পরিবেশটা যতটা সম্ভব বাস্তব রাখার চেষ্টা করেছি।’

তবু কর্মকর্তাদের মন ভরল না। পরে একটি বড় ডোবার চারপাশে নারকেলগাছের ছবি টাঙানো হলো, পাশে লেখা হলো—‘মিনি ফ্লোরিডা’।

কর্মকর্তারা সেখানে দাঁড়িয়ে ছবি তুললেন। একজন বললেন, ‘চোখ বন্ধ করলে সত্যিই বিদেশ বিদেশ লাগে।’

আরেকজন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘হ্যাঁ, শুধু ডলারের বদলে মশা আর সমুদ্রের বদলে ডোবা—এই যা পার্থক্য!’

অনুষ্ঠান শেষে এক কর্মকর্তা আবেগভরা কণ্ঠে বললেন, ‘বিদেশে যেতে পারিনি তো কী হয়েছে, মশাগুলো অন্তত আন্তর্জাতিক মানের মনে হচ্ছে!’

কথাটা শুনে সবাই চুপ করে গেল।

শুধু পাশের ডোবা থেকে ভনভন শব্দ ভেসে এল। মনে হলো, মশারাও হাসছে।

৩.

এদিকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়রের সম্ভাব্য ফ্লোরিডা সফর নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া বলেন, ‘মশকনিধনের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ডোবার পাশে দাঁড়িয়ে অভিনব ধারণা পাওয়া যেতে পারে, এ ধরনের মন্তব্য দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি। আমার কাছে এটি হাস্যকর মনে হয়েছে।’

আসিফ মাহমুদ বলেন, মশকনিধন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য দীর্ঘদিনের একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ বিষয়ে কাজ করতে গিয়ে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যবহৃত পদ্ধতি নিয়ে অধ্যয়ন করেছেন।

আসিফ মাহমুদের ভাষ্য, ফ্লোরিডাভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবিত প্রযুক্তিতে এমন রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়, যা মশার ডিম ও লার্ভা লক্ষ্যে কাজ করে, কিন্তু অন্যান্য প্রাণী ও পরিবেশের ওপর তুলনামূলক কম প্রভাব ফেলে।

ফেসবুকে এই লাইভ ভাষণ শুনে মশারা ভীষণ ক্ষিপ্ত। তারা রক্তশপথ নিয়েছে, সজীবকে যদি একবার ডোবার ধারে পাওয়া যায়, তারা হুল ফোটানো জবাব দেবেই দেবে!