দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কোরীয় উপদ্বীপ ছিল জাপানের একটি উপনিবেশ। যুদ্ধে জাপান পরাজিত হলে জয়ী দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন ৩৮ ডিগ্রি অক্ষরেখা বরাবর কোরীয় উপদ্বীপকে ভাগ করে নেয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন উত্তর কোরিয়ায় সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে এবং যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রতিষ্ঠা করে পুঁজিবাদ ও গণতন্ত্র।
সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থন নিয়ে উত্তর কোরিয়ার সরকারপ্রধান হন সামরিক কর্মকর্তা কিম ইল সাং। ক্ষমতা গ্রহণের পর তিনি নিজেকে উত্তর কোরিয়ার ‘সুপ্রিম লিডার’ ঘোষণা করেন। এর মধ্য দিয়ে উত্তর কোরিয়ায় শুরু হয় ‘কিম’ বংশের শাসন। কিম ইল সাংয়ের মৃত্যুর পর ক্ষমতায় আসীন হন তাঁর পুত্র কিম জং ইল। ইলের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার মধ্য দিয়ে উত্তর কোরিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হয় উত্তরাধিকার সূত্রে ক্ষমতার পালাবদলের অলিখিত প্রথা।
কিম জং ইলের জন্মের সাল ও স্থান নিয়ে রহস্য থেকে গেছে। সরকারি নথি অনুযায়ী, তাঁর জন্ম ১৯৪২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি কোরিয়ার পবিত্র পেকদু পর্বতের এক গোপন সামরিক ঘাঁটিতে। তবে সোভিয়েত সরকারের তথ্যমতে, তাঁর জন্ম ১৯৪১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি সাইবেরিয়ার একটি গ্রামে। অন্য দেশের মাটিতে জন্ম নেওয়া ব্যক্তির সুপ্রিম লিডার হওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হতে পারে, তাই হয়তো পিতা কিম ইল সাং এই তথ্য বদলে দেন। কিম জং ইলের জন্মের মাহাত্ম্য প্রচারের উদ্দেশ্যে বলা হয়ে থাকে, তাঁর জন্মের সময় আকাশে এক জোড়া রংধনুর পাশাপাশি একটি নতুন তারা দেখা যায়।
সরকারি তথ্যমতে বলা হয়, কিম জং ইল কোরিয়ার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতেন। তবে অনেকেই বিশ্বাস করেন, শৈশবে তিনি চীনে শিক্ষা লাভ করেন। কোরীয় উপদ্বীপের যুদ্ধ থেকে নিরাপদ রাখার জন্য তাঁকে চীনে পাঠানো হয়েছিল। ১৯৬০ সালে মাধ্যমিক শিক্ষালাভ শেষে তিনি তাঁর বাবার নামে প্রতিষ্ঠিত কিম ইল সাং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। এরপর ‘ইউনিভার্সিটি অব মাল্টা’ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেন বলে জানা যায়।
ইল ১৯৬১ সালে উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতাসীন সমাজতান্ত্রিক ওয়ার্কার্স পার্টিতে যোগ দেওয়ার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে নাম লেখান। বাবার ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে থেকে তিনি হাতে-কলমে রাজনীতি শেখেন। এ সময় তিনি তাঁর বাবার সঙ্গে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ভ্রমণে সঙ্গী হন। ১৯৭৪ সালে ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা নির্বাচিত হন। ১৯৮০ সালে তাঁকে তাঁর বাবার উত্তরসূরি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এরপর তিনি সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক নির্বাচিত হন।
১৯৯৪ সালে কিম ইল সাং হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করলে উত্তর কোরিয়ার ‘সুপ্রিম লিডার’ হিসেবে স্থলাভিষিক্ত হন কিম জং ইল। ইলের ক্ষমতা গ্রহণের পর উত্তর কোরিয়া এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সম্মুখীন হয়। এই দুর্ভিক্ষে প্রায় ২০ লাখ মানুষ মারা যায়। অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতির জন্য তিনি তাঁর বাবার বিচ্ছিন্নতাবাদ নীতি থেকে সরে আসেন এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন। তিনি পারমাণবিক বোমা তৈরির প্রকল্প বাতিল করে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কারিগরি সহায়তায় পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র নির্মাণের চুক্তি করেন। ১৯৯৯ সালে তিনি দূরপাল্লার মিসাইল পরীক্ষা স্থগিত করেন। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে এবং উত্তর কোরিয়ার অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি হতে থাকে।
২০০২ সালে গোপন পারমাণবিক বোমা নির্মাণের প্রচেষ্টার অভিযোগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ উত্তর কোরিয়াকে ‘শয়তানের অক্ষ’ হিসেবে আখ্যা দিলে দুই দেশের সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে। একপর্যায়ে ইল পারমাণবিক সক্ষমতা সম্প্রসারণ রোধ চুক্তি থেকে উত্তর কোরিয়ার নাম প্রত্যাহার করেন। ২০০৬ সালে উত্তর কোরিয়া সফল পারমাণবিক পরীক্ষার কথা ঘোষণা করে। এর পর থেকে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক বোমা তৈরির সক্ষমতা আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। তবে ২০০৮ সালে উত্তর কোরিয়া তার পারমাণবিক স্থাপনাগুলো পরিদর্শনের অনুমতি দিতে সম্মত হলে বুশ প্রশাসন সন্ত্রাসবাদে সমর্থনকারী দেশের তালিকা থেকে উত্তর কোরিয়াকে বাদ দেয়।
কিম জং ইলের জন্মের সময় প্রচারিত কল্পকথার মতো শাসনামলেও অসংখ্য মিথকে সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। বলা হয়ে থাকে, তিনি অসংখ্য অপেরা রচনা করেছেন, একটি অদৃশ্য সেলফোন আবিষ্কার করেছেন, তিনি মাত্র তিন সপ্তাহ বয়সে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারতেন এবং আট সপ্তাহ বয়সে হাঁটতে পারতেন। তাঁর অলৌকিক ক্ষমতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলা হয়, তিনি আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। এসব কল্পকথা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম থেকে ছড়ানো হতো এবং জনগণ এগুলো বিশ্বাস করত।
কিম জং ইল ছিলেন পাশ্চাত্য সিনেমার ভক্ত। তাঁর সংগ্রহে প্রায় ১৫ হাজার সিনেমা ছিল বলে জানা যায়। তাঁর প্রিয় নায়িকা ছিলেন এলিজাবেথ টেলর। ইল তাঁর দেশের সিনেমা নিয়ে হতাশ ছিলেন। এই হতাশা থেকে ১৯৭৮ সালে তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার এক বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক শিন সাং উক এবং তাঁর স্ত্রী অভিনেত্রী চোই ইউন হিকে হংকং থেকে অপহরণ করেন। ১৯৮৬ সালে ভিয়েনা থেকে পালাতে সক্ষম হওয়ার আগে তাঁরা উত্তর কোরিয়ার জন্য বেশ কিছু সিনেমা নির্মাণ করেন। এর মধ্যে রয়েছে ইলের প্রিয় সিনেমা ‘গডজিলা’র অনুকরণে নির্মিত ‘পুলগাছারি’।
ইল দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিসে ভুগছিলেন। ২০০৮ সাল থেকে তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি দেখা দেয় এবং তখন থেকেই তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র কিম জং উনকে ক্ষমতার উত্তরসূরি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার কাজ শুরু হয়। তখনো উন বিশ্বের কাছে এক অপরিচিত ব্যক্তি। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ২০১১ সালের ১৭ ডিসেম্বর ইলের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর দুই দিন পর রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যমে তাঁর মৃত্যুর খবর প্রচার করা হয়। সরকারিভাবে ঘোষণা করা হয়, তিনি দেশের কল্যাণে নিয়োজিত থাকাকালে ট্রেন ভ্রমণের সময় হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। টেলিভিশনে তাঁর মৃত্যুর সংবাদ ঘোষণার সময় সংবাদপাঠককে কাঁদতে দেখা যায়।