মুসলিম অধ্যুষিত চেচনিয়া দীর্ঘদিন ধরে স্বাধীনতার দাবিতে লড়াই করেছে। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলে চেচেনরা তাঁদের নেতা সাবেক সোভিয়েত জেনারেল দুদায়েভের নেতৃত্বে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। এরপর কয়েক বছর ধরে রাশিয়ার সঙ্গে চেচেনদের বড় দুটি যুদ্ধ ছাড়াও প্রতিনিয়ত সংঘর্ষ চলতে থাকে। ১৯৯৪ সালে প্রথম চেচেন যুদ্ধ শুরু হয়। দুই বছর যুদ্ধের পর রাশিয়া চেচেন থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করে নেয়।
১৯৯৯ সালে একজন রুশ জেনারেলকে অপহরণ ও হত্যা করা হলে রাশিয়া-চেচনিয়া সংঘর্ষে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়। সে বছর সেপ্টেম্বরে রাশিয়ার কয়েকটি অ্যাপার্টমেন্টে চেচেনদের বোমা হামলায় প্রায় ৩০০ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়। এই হামলার প্রতিক্রিয়া হয় ভয়াবহ। অক্টোবরে রুশ বাহিনী চেচনিয়ায় প্রবেশ করে এবং চেচনিয়ায় সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে চেচনিয়াকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়।
২০০০ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় ভ্লাদিমির পুতিন চেচনিয়ার প্রতি কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেন এবং চেচেনদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা না করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। তাঁর এই উগ্র জাতীয়তাবাদী অবস্থান প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তাঁকে জয়ী হতে সাহায্য করে।
২০০২ সালের ২৩ অক্টোবর প্রায় ৫০ জন চেচেন বিদ্রোহী মস্কোর দাভরোভকা থিয়েটারে প্রবেশ করে প্রায় ৮০০ জন দর্শক, অভিনয়শিল্পী এবং কলাকুশলীকে জিম্মি করেন। সেখানে তখন মিউজিক থিয়েটার ‘নর্ড অস্ট’-এর দ্বিতীয় শো চলছিল। নিজেদের চেচেন সেনাবাহিনীর সদস্য পরিচয় দেওয়া চেচেন বিদ্রোহী দলের কাছে প্রচুর বিস্ফোরক দ্রব্য ছিল এবং এই দলে কয়েকজন নারী বিদ্রোহীও ছিলেন, যাঁদের শরীরে বিস্ফোরক বাঁধা ছিল। তাঁদের প্রধান দাবি ছিল চেচনিয়া থেকে অবিলম্বে এবং সম্পূর্ণরূপে রুশ সেনা প্রত্যাহার করা।
প্রথম দিন বিদ্রোহীরা বেশ কিছু শিশু, অন্তঃসত্ত্বা নারী ও বিদেশিদের মুক্তি দেন। রাশিয়া সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, বিদ্রোহীরা যদি সব জিম্মিকে অক্ষত অবস্থায় মুক্তি দেয়, তবে তাঁদের রাশিয়া এবং চেচনিয়া ছাড়া অন্য যেকোনো দেশে চলে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে। বিদ্রোহীরা রাশিয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে রাশিয়া সরকার থিয়েটারে অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়। দুই দিন কেটে গেলে বেশ কিছু জিম্মি অসুস্থ হয়ে পড়ে। এর মধ্যে রেড ক্রস জিম্মিদের খাবার, পোশাক ও ওষুধ সরবরাহ করতে থাকে।
২৬ অক্টোবর সকালে অভিযানের শুরুতেই রাশিয়ার বিশেষ বাহিনী থিয়েটারের ভেতর একটি শক্তিশালী রাসায়নিক দ্রব্য প্রয়োগ করে সব বিদ্রোহী ও জিম্মিকে অজ্ঞান করে ফেলে। এরপর তারা দেয়াল ও ছাদ ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে। অভিযানে সব বিদ্রোহী এবং ১৩০ জন জিম্মি প্রাণ হারান। যদিও সমালোচকেরা বলে থাকেন, অনেক বিদ্রোহী ও জিম্মি রাসায়নিক দ্রব্যের কারণে অসুস্থ হয়ে মারা যান। তা ছাড়া রাশিয়ার সরকারের পক্ষ থেকে সব বিদ্রোহী নিহত হওয়ার কথা বলা হলেও প্রত্যক্ষদর্শীরা অন্তত তিনজন বিদ্রোহীকে বন্দী করে নিয়ে যেতে দেখেছেন। রাসায়নিক দ্রব্যের প্রভাবে জিম্মিদের অনেকে দীর্ঘদিন ধরে নানা জটিলতায় ভোগেন। রাশিয়ার বিশেষ বাহিনীর বিপজ্জনক রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহারের সমালোচনা হলেও কর্তৃপক্ষ কখনো রাসায়নিক পদার্থটির পরিচয় প্রকাশ করেনি।
মস্কোর থিয়েটারে জিম্মি সংকটের পর পুতিন সরকার চেচনিয়াকে আরও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে। চেচনিয়ার বিদ্রোহীদের দমন করতে গিয়ে রাশিয়া অপহরণ, নির্যাতনসহ বিভিন্ন নৃশংসতার আশ্রয় নেয়। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে চেচেন বিদ্রোহীরা রাশিয়ার মাটিতে বেশ কিছু হামলা চালায়, যার মধ্যে ২০০৪ সালে বেসলান স্কুলে আরেকটি বড় জিম্মি সংকট।