কেউ ডাকে, কেউ গায়

মানুষ আর পাখি ছাড়া বাকিদের কথা বলা বা শব্দ করা আদতে শিখতে হয় না। কুকুরছানা যেমন অনায়াসে ঘেউ ঘেউ করতে পারে। বিড়ালছানা ডাকে মিউ মিউ, গরুর বাছুর ডাকে হাম্বা, ছাগলছানা চেঁচায় ম্যাঁঅ্যাঅ্যা করে। শুধু কি তাই? কোনো কোনো পাখিও না শিখে দিব্যি ডাকাডাকি করতে পারে। হাঁসের প্যাঁক প্যাঁক, মুরগির কক ককের কথাই ভাবো। এরা প্রত্যেকেই জন্মগতভাবে জানে, ঠিক কীভাবে ডাকতে হবে। ফলে তুমি এমন কোনো হাঁস পাবেন না, যে কু কু করে ডাকে। এমন কোনো মুরগিও দেখবেন না, যে প্যাঁক প্যাঁক করছে।

default-image

পাখির একটানা সুরেলা কিচিরমিচিরকে আমরা গান বলি। এই গান গাওয়া পাখিগুলো কি জন্ম থেকেই জানে, কীভাবে গাইতে হবে? প্রশ্নটির উত্তর খুঁজছিলেন মার্কিন পাখিগবেষক মেরি স্যু ওয়াসার ও তাঁর সহকর্মীরা। পাখি ও পাখির গানের ওপর কিছু সহজ পরীক্ষা চালান তাঁরা। কতগুলো পাখির ছানাকে বড় হতে দেন ওদের মা–বাবা ছাড়াই। ছানাগুলো কখনোই কোনো বড় পাখি দেখেনি, তাদের গানও শোনেনি। গবেষকেরা একসময় খেয়াল করেন, ছোট পাখিগুলো গানের মতো কিছু একটা গাইতে চেষ্টা করছে! তাই সত্যিকারের গান শিখতে শেষতক নিজ প্রজাতির একটা বড় পাখিকেই ওদের ‘ওস্তাদ’ মানতে হলো। বড় পাখির কাছ থেকেই ওরা শিখল, কীভাবে গলার স্বর পরিবর্তন করতে হয়। তারপর সত্যি সত্যি একদিন ওরা সবাই মিলে গাইতে শুরু করল সুরেলা গান!

default-image

পাখি কেন গায়

আমরা গান গেয়ে অন্যের হাততালি পাই (বেসুরো হলে অবশ্য পচা ডিমও পায় কেউ কেউ)। পাখি কিন্তু গান গেয়ে সঙ্গী খোঁজে। গান গেয়েই অন্যদের জানিয়ে দেয়—এই এলাকা আমার। এ কারণেই প্রতিটা পাখিকে নিজের জাতের গানটা জানতে হয়।

বসন্তকালে অনেক পাখির ডাক আমাদের কানে আসে। পাখির ছানারাও চারপাশে হাজারো পাখির গান শোনে। তাহলে ওরা কীভাবে ঠিক করে যে কোন গান অনুকরণ করতে হবে? পাখির ডাক নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করেছেন দুই ইংরেজ–মার্কিন বিজ্ঞানী—পিটার মারলার ও সুসান পিটারস। তাঁরা দেখেছেন, একেক পাখি তার নিজের গানটি নির্বাচন করতে গিয়ে একেক রকম পথ বেছে নেয়। এটা নিয়ে ওই দুই বিজ্ঞানী পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। মা–বাবা নেই এমন কিছু জলচড়ুইকে বড় করে তুলেছিলেন তাঁরা। অন্য কোনো পাখির গানই ওদের শুনতে দেওয়া হয়নি। তারপর ওই ছানাগুলোকে একই সঙ্গে জলচড়ুই ও মেঠোচড়ুইয়ের গান বাজিয়ে শোনানো হয়। দেখা যায়, ছানাগুলো শুধু নিজেদের জাতের গানই গাইতে শিখেছে! ভুল করেও মেঠোচড়ুইয়ের গান শেখেনি!

এসো গান শিখি

পিটার–সুসান তারপরও হাত গুটিয়ে ফেলেননি। তাঁরা দেখতে চাইলেন, পাখির ছানাগুলো শুধু গানের তাল বা সুর শুনেই নিজেদের গানটি বাছাই করল কি না। তাই জলচড়ুই ও মেঠোচড়ুইয়ের ‘খিচুড়ি সংগীত’ রেকর্ড করলেন তাঁরা। জলচড়ুইয়ের সুরের সঙ্গে জুড়ে দিলেন মেঠোচড়ুইয়ের তাল। আবার মেঠোচড়ুইয়ের সুরের সঙ্গে মিশিয়ে দিলেন জলচড়ুইয়ের তাল।

বুঝতেই পারছ, বেশ জটিল পরীক্ষা। তবে অবাক করা ব্যাপার হলো, দুই রকম গানের জগাখিচুড়ি রেকর্ডিং থেকেও জলচড়ুইয়ের ছানারা নিজেদের গানটা ঠিকই বের করে ফেলল! শিখেও নিল পুরোটা। মানে ছোট্ট পাখির জন্মগত প্রবণতাই তাকে বলে দিল, কোনটা তার নিজের গান।

default-image

কেউ কেউ শিল্পী

তবে কিছু পাখি গান শেখা নিয়ে অত খুঁতখুঁতে না। বিজ্ঞানীরা কিছু লালডানা ব্ল্যাকবার্ডের ছানাকে নিজেদের মতো বড় হতে দিয়েছিলেন। তারপর ওদের শোনানো হয়েছিল দুই রকম পাখির গানের দুটি রেকর্ড। একটি রেড উইংগড ব্ল্যাকবার্ডের গান, অন্যটি ওরিয়ল পাখির। ছানাগুলো দুই জাতের পাখির গানই গাইতে শিখল! তবে বনে–বাদাড়ে থাকলে ওরা কেবল নিজেদের গানই গাইতে শিখত।

কিছু প্রজাতির ছানা আবার বাবার কাছে গাইতে শেখে। বিজ্ঞানীরা বিষয়টা জেনেছেন বিশেষ পরীক্ষা–নিরীক্ষা করে। ওই বিজ্ঞানীরা ছোট বুল ফিঞ্চ আর জেব্রা ফিঞ্চ পাখির ওপর একটা কৌশল খাটিয়েছিলেন। দুই প্রজাতির পাখির ছানাগুলোর কাছ থেকে ওদের আসল বাবাকে আলাদা করে ফেলা হয়েছিল। বদলে ওদের সঙ্গে রেখে দেওয়া হয়েছিল ভিন্ন প্রজাতির দুটি বাবা-পাখি। দেখা গেছে, ছানাগুলো ওদের নকল বাবার সঙ্গে বেশ মানিয়ে নিয়েছে! আর ওরা গাইতেও শিখেছে নকল বাবার গান!

default-image

বুঝতেই পারছেন, গান শেখার বেলায় একেক পাখির একেক কায়দা। তবে কিছু পাখি একেবারে অদ্ভুত। ওরা ইচ্ছা করেই অন্য প্রাণীর ডাক শিখে নেয়। এদের বলে ‘হরবোলা’ পাখি। বাংলাদেশে যেমন আছে নীলডানা পাতা বুলবুলি। এরা অন্য পাখির ডাক তো বটেই, অন্য প্রাণীর ডাকও নকল করতে পারে!

আচ্ছা, এই হরবোলা পাখি কেন অন্যের ডাক নকল করে? বিজ্ঞানীরা এর উত্তরও খুঁজছেন।

সূত্র: হাউ ডু বার্ডস লার্ন দেয়ার সংগস: মেরি স্যু ওয়াসার

একটু থামুন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন