২০৩৮ সাল। মহাখালী স্ট্যান্ডে কাউন্টারে বসে ‘ভবো এয়ার’–এর টিকিট বিক্রি করছে ইদ্রিস। বিক্রিবাট্টা সুবিধার না। অথচ এমন হওয়ার কথা নয়। যাত্রী টানার জন্য তাদের কোম্পানি কী না করেছে! দিয়েছে ‘সিটে বসলে কোল ফ্রি’ অফার। এক সিটের ভাড়ায় পোষা প্রাণী, যাকে খুশি কোলে নিয়ে বসা + যাত্রাপথে এক পিস করে জিলাপি খাওয়ার সুযোগ। এখন মনে হচ্ছে, এই অফার দেওয়াটাই ঠিক হয় নাই।
সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক যাত্রী। তার কোলে একটা ছাগল। ছাগলটা ব্যা ব্যা করেই যাচ্ছে। ইদ্রিস ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনার সমস্যা কী, স্যার? এই ছাগল নিয়ে প্লেনে উঠতে চাচ্ছেন কোন আক্কেলে? এটা লোকাল বাস না, এয়ারবাস। রাস্তায় চলে না, আকাশে ওড়ে।’
—রাস্তায় চলুক আর আকাশে উড়ুক, ময়মনসিংহেই তো যাবে, নাকি? আর অফার তো আপনারাই দিয়েছেন, ‘সিটে বসলে কোল ফ্রি’। সে কারণেই তো ‘কিউএস হ্যাংলা’র টিকিট না কেটে এখানে এসেছি।
—এসেছেন, ভালো করেছেন। তাই বলে ছাগল নিয়ে উঠবেন?
—ও এম জি… আপনি আমার ‘পেট’কে কী বললেন? জানেন, ও আমাকে ছাড়া একমুহূর্তও থাকতে পারে না। আপনি ছাগল, আপনার চৌদ্দগুষ্টি ছাগল। সাহস তো কম না! দেশের অহংকার ব্ল্যাক বেঙ্গলকে অপমান করছেন? এই ব্ল্যাক বেঙ্গলকে নিয়ে উল্টোপাল্টা কথা বলায় চৌদ্দ বছর আগে দেশে কত কাণ্ড হয়েছিল, ভুলে গেছেন? এখন যদি আমি ফেসবুক লাইভে যাই, কী হবে বুঝতে পারছেন? টিকিট দেবেন নাকি ফেসবুক লাইভে যাব?
ইদ্রিস মিয়া আর একটা কথাও না বলে যাত্রীর হাতে টিকিট তুলে দিল।
প্রচুর বিমান আমদানি হওয়ায় দেশের প্রতিটা জেলা শহরেই এখন পাওয়া যাচ্ছে উড়োজাহাজ সার্ভিস সুবিধা। একটা থেকে দুইটা। দুইটা থেকে চারটা। চারটা থেকে ষোলোটা। ২০২৬ সালে চুক্তি হওয়া এয়ারবাসের সংখ্যা দিন দিন বেড়েছে জ্যামিতিক হারে। কিন্তু এত উড়োজাহাজ উড়বে কোথায়?
মর্যাদাপূর্ণ ব্যবসা আর লাভের আশায় এগিয়ে এসেছে অনেক কোম্পানি। সার্ভিস দিচ্ছে দেশের প্রতিটি জেলায়। উড়ালযানগুলো এখন দেশের যেকোনো জেলায় যাত্রীদের মাত্র বিশ থেকে ত্রিশ মিনিটে পৌঁছে দিচ্ছে। আরও কিছু উড়োজাহাজ খুব তাড়াতাড়ি চলে আসার কথা। সেগুলো আসামাত্রই শুরু হয়ে যাবে আন্ত–উপজেলা সার্ভিস।
উড়োজাহাজ তুমি কোন আকাশে উড়বে? আকাশে যানজট, তাই জেলায় জেলায় ঘুরবে। কর্তৃপক্ষের এমন যুগোপযোগী সিদ্ধান্তে সবাই খুশি। এতে যেমন রাস্তার যানজট এড়ানো যাবে, তেমন বাঁচবে মূল্যবান সময়।
মর্যাদাপূর্ণ ব্যবসা আর লাভের আশায় এগিয়ে এসেছে অনেক কোম্পানি। সার্ভিস দিচ্ছে দেশের প্রতিটি জেলায়। উড়ালযানগুলো এখন দেশের যেকোনো জেলায় যাত্রীদের মাত্র বিশ থেকে ত্রিশ মিনিটে পৌঁছে দিচ্ছে। আরও কিছু উড়োজাহাজ খুব তাড়াতাড়ি চলে আসার কথা। সেগুলো আসামাত্রই শুরু হয়ে যাবে আন্ত–উপজেলা সার্ভিস।
দাঁতখিলান দিয়ে কিছুক্ষণ দাঁত খোঁচাখুঁচির পর ‘ধুত্তোরি ছাই’ বলে কলম ফেলে দাঁড়িয়ে পড়ে ইদ্রিস। এদিক–ওদিক তাকিয়ে ডাকতে শুরু করে, ‘টঙ্গী, গাজীপুর, শ্রীপুর, ত্রিশাল, মুমনসিং—কে কই যাবেন, উঠেন। আর মাত্র কয়টা সিট খালি।’ বলতে বলতে ককপিটের দিকে উঁকি দেয়।
বদ পাইলটের কারণে গতকাল চৌদ্দজন যাত্রী নিয়ে ফ্লাইট ছাড়তে হয়েছিল। তার মধ্যে আবার একজন ফাও। তেরোজন যাত্রী দেখে পাইলট বলে, আনলাকি থারটিন যাত্রী নিয়ে নাকি সে ফ্লাই করবে না। হয় আরেকজন যাত্রী যোগাড় করো, নাহলে এখান থেকে একজনকে নামিয়ে দাও।
এটা কোনো কথা? টিকিট কাটার পর একজন যাত্রীকে টেনে নামিয়ে দেওয়া যায়? নাকি কাউকে জোর করে প্লেনে উঠিয়ে সিটবেল্ট দিয়ে বেঁধে ফেলা যায়? পাইলটের কানপট্টিতে একটা বসিয়ে দিতে ইচ্ছে করছিল ইদ্রিসের। ধারেকাছে আর কোনো পাইলট না থাকায় নিজেকেই একটা গালি দিল ইদ্রিস। আজ যদি প্লেন ড্রাইভিংটা শিখত, মেসির মতো এক ফ্রি কিকে জালে উড়িয়ে ফেলত পাইলট ব্যাটাকে।
মনের ইচ্ছা মনে রেখে ভুবনভোলানো হাসি হেসে বলল, ‘পাইলট ভাই, আপনার তো একজন যাত্রী দরকার, তাই না? শসা বিক্রির লোভ দেখিয়ে এক শসাওয়ালা উঠিয়ে দিচ্ছি। ওঠার সাথে সাথে আপনিও প্লেন আকাশে ওঠাবেন। ময়মনসিংহে প্লেন ল্যান্ড করার পর বেচারিকে সরি বলে দিয়েন।’
ইদ্রিস দীর্ঘশ্বাস ফেলে এয়ারবাসের দিকে তাকায়। কাল ফাও হিসেবে প্লেনে নিতে হয়েছে শসাওয়ালাকে। আজ নিতে হচ্ছে ছাগল। আগামীকাল কী হবে, কে জানে! আকাশে উড়তে থাকা এয়ারবাসগুলোকে কেন জানি তার এয়ারবাঁশ মনে হয়।