রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি প্রকল্প

শ্রাবণ মাসের বৃষ্টি শুরু হলেই বাঙালির মন অদ্ভুত এক রাসায়নিক বিক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়। অফিসে যাওয়ার তাড়া, যানজট, কাদা—সবকিছু হঠাৎ গৌণ হয়ে যায়। মাথায় শুধু একটাই চিন্তা—আজ খিচুড়ি হবে, সঙ্গে ইলিশ হলে তো কথাই নেই!

তবে খিচুড়ির এই আনন্দের মধ্যেও ঢাকাবাসীর আরেকটি মৌসুমি অভিজ্ঞতা আছে। বৃষ্টি নামলেই যেহেতু পানি জমে যায়, শহরের কোন কোন রাস্তা গত সপ্তাহে খোঁড়া হয়েছিল, সবাই নবম শ্রেণিতে পড়া উপপাদ্য ২৮–এর মতো মনে করার চেষ্টা করেন।

অনেকে বলেন, বাংলাদেশে খনিজ সম্পদ নেই। আমি বিনয়ের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করি। বিশেষ করে ঢাকার রাস্তার দিকে তাকালে মনে হয়, এখানে নিশ্চয়ই এমন কিছু আছে, যা পৃথিবীর আর কোথাও নেই। নইলে একই রাস্তা কয়েক মাস পরপর এমন আবেগ নিয়ে খোঁড়া হয় কেন?

আমার ধারণা, ঢাকার মাটির নিচে হয়তো তেল-গ্যাস নয়, আরও মূল্যবান কিছু আছে। যেমন ‘টেন্ডারিয়াম’, ‘প্রকল্পিয়াম’, ‘বরাদ্দনিয়াম’ কিংবা ‘পুনঃখননাইট’। এগুলো এতই দুর্লভ যে একবার খুঁড়ে কেউ নিশ্চিত হতে পারেন না। তাই আরেকবার খুঁড়তে হয়। এরপরও সন্দেহ কাটে না। ফলে আবার খুঁড়তে হয়। বিজ্ঞানও তো বারবার পরীক্ষা-নিরীক্ষার ওপরই দাঁড়িয়ে আছে!

ছোটবেলায় একটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে দেখেছিলাম, একজন ঠিকাদার একই রাস্তা খুঁড়তে খুঁড়তে বুড়ো হয়ে যান। তখন মনে হয়েছিল, এটা নিছক কৌতুক। এখন বুঝি, সেটা ছিল ডকুমেন্টারি।

সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, রাস্তারও ভাগ্য আছে। প্রথমে আসবেন গ্যাস বিভাগের লোকজন। তাঁরা রাস্তা কেটে চলে যাবেন। কয়েক দিন পর পানি বিভাগ এসে বলবে, ‘আমাদের পাইপটা একটু বসাতে হবে।’ এরপর টেলিযোগাযোগ বিভাগ মনে করবে, ‘আহা! কেব্‌ল তো এখনো বসানো হয়নি!’ এরপর বিদ্যুৎ বিভাগ এসে ঘোষণা দেবে, ‘আপনারা সবাই কাজ করেছেন, আমাদের বাদ দিলে কেমন দেখায়?’

এভাবে একটি রাস্তা ধীরে ধীরে সরকারি সংস্থাগুলোর মিলনমেলায় পরিণত হয়। সবাই আসে, সবাই কাটে, সবাই চলে যায়। শুধু রাস্তাটা আর আগের মতো থাকে না।

আমার তো মনে হয়, রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির জন্য একটি পুরস্কার থাকা উচিত যে বা যারা অথবা যেই সংস্থা যত বেশি রাস্তা খুঁড়ে মানুষের দুর্ভোগ বাড়াতে পারবে, তাদের প্রত্যেককে বিটিভির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে আনা উচিত। অথবা জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞাপিত করা উচিত।

বৃষ্টির দিনে এই খোঁড়া রাস্তার সৌন্দর্য অবশ্য আলাদা। কোথায় রাস্তা, কোথায় নালা, কোথায় ছোটখাটো হ্রদ—এসব বোঝার জন্য এখন আর ভূগোল নয়, ভাগ্যের প্রয়োজন হয়। পথচারীরা অফিসে পৌঁছানোর আগেই লং জাম্প, ট্রিপল জাম্প, ব্যালেন্সিং আর কাদাসাঁতার—চারটি ইভেন্ট শেষ করে ফেলেন। অলিম্পিক কমিটির উচিত, ঢাকার বর্ষাকালকে অনুশীলন কেন্দ্র ঘোষণা করা।

সবচেয়ে বড় বিস্ময় হলো, স্বাধীনতার এত বছর পরও আমরা একটি সমন্বিত নীতিমালা করতে পারলাম না—যাতে একবার রাস্তা কাটলে সবাই নিজের কাজ একসঙ্গেই শেষ করে। মনে হয়, আমাদের পরিকল্পনার চেয়ে কোদালের আয়ু বেশি। কেউ কেউ বলবে, বিষয়টি মাননীয় সরকারপ্রধান দেখছেন! আমার মতো আমজনতার একটা ছোট প্রশ্ন, বাংলাদেশের সবকিছুই কেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বা সরকারপ্রধানকে দেখতে হবে? তাহলে এত লোকলস্কর দিয়ে আমরা আসলে কী করছি? পাশাপাশি গত সপ্তাহে প্রবল বর্ষণে যখন বেশির ভাগ এলাকা পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল, যা ছিল স্মরণকালের সবচেয়ে বেশি জলাবদ্ধতা, সেই দিন আমাদের সন্তানদের এইচএসসি পরীক্ষা এক দিন পেছালে বাংলাদেশের এমন কী ক্ষতি হয়ে যেত?

ফিরে আসি আবার তিলোত্তমা নগরীতে, আমার একটি ছোট্ট প্রস্তাব আছে। ঢাকার প্রবেশমুখে একটি সাইনবোর্ড লাগানো হোক—

‘স্বাগতম। সাবধানে যাইয়েন ওস্তাদ সামনে গাতা, ডাইনে পানি, পিছে ট্রাফিক, আর বাঁয়ে প্লাস্টিক।