বন্ধুর ‘ঈদ-উপহার’

অলংকরণ: এস এম রাকিব

ঈদের তিন দিন আগে বারেক সাহেবের কাছে একটা ফোন এল। নম্বরটা ঠিক পরিচিত মনে হচ্ছে না।

—হ্যালো, বারেক?

—হ্যাঁ, কে?

—কেমন আছিস?

—ভালো। কে বলছেন?

—এই তোর কোমরের মাপ কত রে? ওপাশের কথার স্টাইলে বোঝা যাচ্ছে, খুব পরিচিত কেউ...মানে বন্ধুই হবে। কিন্তু নামটা বলছে না।

—আমার কোমরের মাপ ২৮...আপনি কে?

ওপাশে ঝপ করে ফোনটা কেটে গেল। ঈদের আগে ঘনিষ্ঠ কোনো বন্ধু কোমরের মাপ চাইছে। তার মানে ঈদ–উপহার হিসেবে প্যান্ট একটা পেতে যাচ্ছেন। ভেতরে–ভেতরে খুশি হয়ে উঠলেন বারেক সাহেব। একটা নতুন প্যান্ট তাঁর দরকার ছিল। স্ত্রীকে বলেওছিলেন। স্ত্রী মুখ ঝামটা মেরেছে, ‘পাঞ্জাবি তো একটা কেনা হয়েছে, আবার প্যান্ট কেন?’ এখন স্ত্রীকে কে বোঝাবে যে তাঁর সবগুলো প্যান্ট পুরোনো হয়ে গেছে, একটা নতুন প্যান্ট দরকার। ঈদ উপলক্ষে যদি হয়ে যায়, তাহলে মন্দ কী। যাহোক, প্যান্ট তো একটা হচ্ছে অবশেষে; বন্ধু যে–ই হোক না, তার প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধ করলেন তিনি।

আরও পড়ুন

কিন্তু বন্ধুটা কে? তুই করে বলছে, নামও জানে। প্যান্ট গিফট করতে চাইছে, কোমরের মাপ চাইল যখন...বোঝাই যাচ্ছে, ভালো কোনো বন্ধুই হবে।

ঈদের আর দুদিন আছে, বারেক সাহেবের প্যান্ট এখনো আসেনি। স্ত্রী–কন্যা দুজনই বেশ উদ্বিগ্ন!

—কী হলো বাবা, এখনো তোমার ঈদের প্যান্ট এল না। পরশু ঈদ।

বারেক সাহেব কী আর বলবেন। ভেতরে–ভেতরে তিনিও কিছুটা উদ্বিগ্ন। মনে মনে তিনি একটা গবেষণা করে ফেললেন, তাঁর তিনজন বন্ধু আছে গার্মেন্টস ব্যবসায়ী। এদের কেউ একজন নির্ঘাত কোমরের মাপ চেয়েছে। আচ্ছা, ফোন করলে কেমন হয়? পাঁচসাত ভেবে প্রথমজনকে ফোন দিলেন।

—কী হে, অবশেষে মনে পড়ল আমাকে।

—না, ভাবলাম ঈদ আসছে, একটা ফোন দেই।

—ভালো করেছিস। ঈদে আসছিস তো?

—দেখি।

—দেখি না, আসবি অবশ্যই, ভাবিকে নিয়ে আসবি।

নাহ্‌, এই বন্ধু না। দ্বিতীয়জনকে ফোন দিলেন এবার। সেই একই সুর...

—কী হে, অবশেষে মনে পড়ল আমাদের?

—না, ভাবলাম ঈদ আসছে, একটা ফোন দেই।

—ভালো করেছিস। ঈদে আসছিস তো?

—দেখি।

—দেখি না, আসবি অবশ্যই। ভাবি, ছেলেমেয়ে সবাইকে নিয়ে আসবি...।

নাহ্‌, এ–ও না। দান দান তিন দান। এবার যাকে ফোন দিতে যাচ্ছেন, তার একটা শোরুম আছে, গার্মেন্টসের ব্যবসা তো আছেই। মনে হচ্ছে, এর সম্ভাবনাই বেশি। ফোন করলেই হয়তো বলবে, ‘বন্ধু, প্যান্ট পেয়েছিস তো? রং পছন্দ হয়েছে?...এটা কিন্তু পুরা ইংলিশ কাটিং প্যান্ট।’

—হ্যালো দোস্ত, আছিস কেমন?

—ভালো না রে। ব্যবসার অবস্থা খুবই খারাপ। সিঙ্গাপুর যাচ্ছি। নতুন কোনো অর্ডার পাই কি না, দেখি...।

—কেন, তোর শোরুম?

—আরে ধুর, পাশে আরেকটা বড় মার্কেট হয়েছে, ক্রেতা সব ওই দিকে ছুটছে, আমার শোরুমে মাছিও ঢোকে না। ব্যবসা নাই দোস। আচ্ছা দোস, ফোন করে ভালোই করেছিস। এক মাসের জন্য লাখ দুয়েক ধার দিতে পারবি?

এ কী বিপদ। ফোন করে বিপদ টেনে আনলাম। আমতা আমতা করে কোনোমতে কাটালেন তৃতীয় গার্মেন্টস বন্ধুকে।

ঈদের আর এক দিন বাকি। প্যান্টের কোনো খবর নাই।

কী মনে করে সেই আননোন ফোন নম্বরটা খুঁজতে লাগলেন বারেক সাহেব, লাস্টের দুটো সংখ্যা মনে আছে—আট এক। হ্যাঁ, নম্বরটা পাওয়া গেছে, এই নম্বরই। বন্ধু যখন, বলাই যায়...কী রে, কোমরের মাপ নিলি, প্যান্ট কই?

ফোন দিলেন বারেক সাহেব। একবার, দুবার, তিনবারের বার ফোন ধরল। বেশ ভারী গলা।

—হ্যালো?

এই গলা তো সেই গলা না। অন্য কারও গলা মনে হচ্ছে, সেই দিনের সেই গলা না।

—ইয়ে...আপনার এই নম্বর থেকে আমার এক বন্ধু ফোন করেছিল।

—বন্ধুর নাম কী? গলা যেন আরও গম্ভীর।

—ইয়ে...নামটা তো ঠিক মনে পড়ছে না।

—বন্ধুর নাম মনে নেই। আপনি কী রকম বন্ধু হে?

—না মানে...।

—আপনি তো মিয়া শত্রুরও অধম। বলেই ফোন কেটে দিল।

পুরো ব্যাপারটা ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করলেন বারেক সাহেব। স্ত্রী–কন্যাও বোধ হয় ভুলেই গিয়েছিল। কিন্তু চানরাতে হঠাৎ হইচই, মেয়ের চিত্কার, ‘বাবা, তোমার প্যান্ট এসেছে! প্যান্ট এসেছে!’ চানরাতেও তাহলে কুরিয়ার সার্ভিস চালু থাকে! যাক, নাম না জানা বন্ধু তাহলে শেষ পর্যন্ত কথা রেখেছে, স্ত্রী–কন্যার কাছে মান–ইজ্জতটা রক্ষা হলো। কিন্তু এ কী! প্যান্টের পার্সেল এত ছোট কেন?

মেয়ে তো বলেই বসল, এ কী বাবা, তোমার বন্ধু তো মনে হচ্ছে মসলিন কাপড়ের প্যান্ট পাঠিয়েছে।

খোলা হলো সেই প্যাকেট। ওমা সে কী, প্যান্ট কোথায়? একটা বেল্ট। স্রেফ একটা চামড়ার চিকন বেল্ট (নাকি রেক্সিনের?)। কোমরের ২৮ মাপমতো দুটো অতিরিক্ত নতুন ফুটো। এ জন্যই কোমরের মাপ চেয়েছিল?

তবে সবকিছুইর বোধ হয় একটা ভালো দিক আছে। বারেক সাহেব ঈদের দিন পায়জামা পরতে গিয়ে দেখেন, পায়জামার নিয়ার (ফিতা) নেই। কী আর করা। বন্ধুর ওই বেল্ট দিয়েই কোনোরকমে পায়জামা পরে ওপরে পাঞ্জাবি চাপিয়ে ঈদের নামাজ পড়তে ছুটলেন। এ ছাড়া আর উপায়ই–বা কী!