ডলারের আশায় ই-টিন!

কার্টুন: এআই

আজ থেকে বছর দুয়েক আগের কথা। ইউটিউবে তখন ‘ফেসবুক থেকে মাসে লাখ টাকা আয়’ টাইপের ভিডিওর খুব রমরমা অবস্থা। থাম্বনেইলে এমন সব এডিটিং, যেন ল্যাপটপ খুলে বসলেই স্ক্রিন থেকে ডলারের বান্ডিল বের হয়ে সোজা পকেটে ঢুকে যাবে।

এসব মোটিভেশনাল ভিডিও দেখে আমার ভেতরেও বিলিয়নিয়ার হওয়ার সুপ্ত বাসনা জেগে উঠল। ভাবলাম, মার্ক জাকারবার্গ যখন দুই হাত ভরে টাকা বিলোচ্ছেন, তখন আমি কেন গরিব হয়ে বসে থাকব! শুরু হলো ফেসবুক থেকে ডলার কামানোর মিশন।

ইউটিউবের ওই ভিডিওতেই শুনলাম, ডলার হাতে পেতে নাকি একটা ‘ই-টিন’ সার্টিফিকেট লাগে। ই-টিন জিনিসটা আসলে কী, এটা দিয়ে কী করে, সে বিষয়ে আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ বা ধারণা ছিল না। আমার তখন একটাই লক্ষ্য—ডলার!

আমার মনে হচ্ছিল, এই সার্টিফিকেটটা হচ্ছে আলাদিনের জাদুর চেরাগ। এটা কোনোমতে বানিয়ে ফেসবুকে আপলোড করে দিলেই, জাকারবার্গ সাহেব খুশিতে গদগদ হয়ে সরাসরি আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ডলারের বস্তা পাঠিয়ে দেবেন।

আমি ইনকাম ট্যাক্স দেওয়া তো দূরের কথা, আমার আর্থিক অবস্থা এমন যে সরকার চাইলে আমাকেই উল্টো কিছু বেকার ভাতা দিতে পারে। ফেসবুকে ডলার কামানোর আশায় ই-টিন খুলেছিলাম, আর এখন শুনছি জাকারবার্গের ডলার তো আসেইনি, উল্টো দেশি টাকায় আমাকেই সরকারকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে!

ব্যস, আর যায় কোথায়! চরম উৎসাহ নিয়ে, এদিক-ওদিক ক্লিক করে কোনোমতে অনলাইনে একটা ই-টিন খুলে ফেললাম। পিডিএফটা ডাউনলোড করার সময় আমার ভেতরে এমন একটা ফিল হচ্ছিল, যেন আমি মাত্রই সুইস ব্যাংকের লকার আনলক করে ফেলেছি।

এরপর দেখতে দেখতে দুই বছর কেটে গেল। ফেসবুক থেকে এক ডলার তো দূরের কথা, এক সেন্টও আমার অ্যাকাউন্টে ঢোকেনি। যে পেজ খুলেছিলাম, সেটার রিচ দেখে মনে হয় পেজটা নিজেই আইসিইউতে চলে গেছে। বিলিয়নিয়ার হওয়ার স্বপ্ন কবেই ধূলিসাৎ হয়ে গেছে।

মাস শেষে নিজের হাতখরচের জন্য এখনো সেই ‘ব্যাংক অব আব্বা’ অর্থাৎ বাবার কাছেই হাত পাততে হয়। বাপের হোটেলে খেয়ে আর বাবার পকেটের টাকায় এমবি কিনে আমার দিন বেশ ভালোই কেটে যাচ্ছিল। ই-টিনের কথা আমি পুরোপুরি ভুলেই গিয়েছিলাম।

কিন্তু আসল বিপত্তিটা ঘটল কয়েক দিন আগে। ফেসবুকে স্ক্রল করতে গিয়ে হঠাৎ একটা পোস্টে চোখ আটকে গেল। সেখানে লেখা, যাঁরা ই-টিন করার পর ট্যাক্স রিটার্ন দাখিল করেননি, তাঁদের নাকি জরিমানা করেছে এনবিআর!

পোস্টটা পড়ার পর আমার আক্ষরিক অর্থেই মিনি হার্ট অ্যাটাক করার দশা! কৌতূহল আর ভয় নিয়ে অনলাইনে চেক করে দেখি, আমার নামে একদম নগদ ১০ হাজার টাকা জরিমানা এসে বসে আছে! চোখ কচলে আবার পড়লাম। মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠল। ভাইরে ভাই, এ কোন বিপদে পড়লাম!

আমি ইনকাম ট্যাক্স দেওয়া তো দূরের কথা, আমার আর্থিক অবস্থা এমন যে সরকার চাইলে আমাকেই উল্টো কিছু বেকার ভাতা দিতে পারে। ফেসবুকে ডলার কামানোর আশায় ই-টিন খুলেছিলাম, আর এখন শুনছি জাকারবার্গের ডলার তো আসেইনি, উল্টো দেশি টাকায় আমাকেই সরকারকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে!

একেই বলে খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি! এখন আব্বাকে যদি গিয়ে বলি, ‘আব্বা, ফেসবুক থেকে ডলার কামাতে গিয়ে এনবিআরের কাছে ১০ হাজার টাকা জরিমানা খেয়েছি, টাকাটা দাও’—তাহলে আব্বা যে সাইজের বাঁশ নিয়ে দৌড়ানি দেবে, তাতে আমার আর ইহকালে বিলিয়নিয়ার হওয়া লাগবে না।

না জেনে না বুঝে ‘টিন’ ধরতে গেলে যে শুধু হাত কাটে না, পকেটও কাটে—সেটা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি!

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন