১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত চলা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ কেড়ে নেয় প্রায় দুই কোটি মানুষের প্রাণ। এ ছাড়া প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ। পৃথিবীকে যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে রক্ষার জন্য ১৯২০ সালে গঠিত হয় জাতিপুঞ্জ বা লিগ অব নেশনস। প্রথম দিকে সংগঠনটি বেশ কিছু বৈশ্বিক বিবাদের মীমাংসা করলেও ১০ বছর যেতে না যেতেই বিভিন্ন রাষ্ট্র সংগঠনটি থেকে সদস্যপদ প্রত্যাহার করে নিতে শুরু করে। এর ফলে সংগঠনটির রাজনৈতিক গুরুত্ব ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যায়। ১৯৩৯ সালে শুরু হওয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বন্ধে সংগঠনটি কোনো ধরনের ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় বিশ্ববাসী তখন একটি সুসংগঠিত ও শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালেই শুরু হয় নতুন সংগঠন জাতিসংঘ বা ইউনাইটেড নেশনস গঠনের উদ্যোগ।
জাতিসংঘ গঠনের প্রথম পদক্ষেপ ছিল ‘লন্ডন ঘোষণা’। ১৯৪১ সালের ১২ জুন জার্মানির আক্রমণে ভূখণ্ড হারানো ইউরোপের ৯টি দেশের প্রবাসী সরকারসহ আরও কয়েকটি দেশ বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার জন্য ‘লন্ডন ঘোষণা’ দেয়। এরপর ১৯৪১ সালের আগস্ট মাসে আটলান্টিক মহাসাগরে ব্রিটিশ রণতরি ‘এইচএমএস প্রিন্স অব ওয়েলেস’-এ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় মিলিত হন। দীর্ঘ আলোচনার পর ১৪ আগস্ট তাঁরা ‘আটলান্টিক চার্টার’ নামে এক সনদ ঘোষণা করেন।
এরপর আরও কিছু সম্মেলন শেষে ১৯৪৫ সালের ২৫ এপ্রিল থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকো সম্মেলনে মিলিত হয়ে ৫০টি রাষ্ট্র জাতিসংঘের মূল সনদে স্বাক্ষর করে। ১৫ অক্টোবর ৫১তম দেশ হিসেবে পোল্যান্ড জাতিসংঘ সনদে স্বাক্ষর করে এবং প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের অন্তর্ভূক্ত হয়। একই বছর ২৪ অক্টোবর জাতিসংঘ সনদ কার্যকরের মাধ্যমে নতুন স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করে জাতিসংঘ। ১৯৪৬ সালের ১০ জানুয়ারি লন্ডনের ‘সেন্ট্রাল হল ওয়েস্টমিনস্টার’–এ ৫১টি সদস্যরাষ্ট্রের উপস্থিতিতে জাতিসংঘের প্রথম সাধারণ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।
জাতিসংঘ গঠনের মূল লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার পাশাপাশি সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা এবং আন্তর্জাতিক সমস্যার সমাধান ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ সৃষ্টি করা। কিছু ব্যর্থতা থাকলেও প্রতিষ্ঠার পর প্রায় আট দশক পার করা জাতিসংঘকে সফল ও কার্যকরী সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করা যায়।
বিভিন্ন সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে বিবাদ নিষ্পত্তি করে এবং বিভিন্ন দেশে শান্তিরক্ষী বাহিনী প্রেরণের মাধ্যমে জাতিসংঘ বিশ্বে শান্তি স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলছে। বিভিন্ন বিশেষায়িত সংস্থার মাধ্যমে সারা বিশ্বে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, সংস্কৃতি—প্রভৃতি ক্ষেত্রে অসামান্য ভূমিকা রাখছে জাতিসংঘ। তা ছাড়া জাতিসংঘের উল্লেখযোগ্য অবদানের মধ্যে আছে বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, কোটি কোটি শরণার্থীকে সহায়তা প্রদান, অভুক্ত মানুষকে খাদ্যসহায়তা প্রদান, জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণ, বিভিন্ন দেশে সুষ্ঠু নির্বাচনে সহায়তা প্রভৃতি।
জাতিসংঘের ব্যর্থতার মূলে আছে নিরাপত্তা পরিষদের অগণতান্ত্রিক ভেটো–ব্যবস্থা। শান্তি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা রাখার কথা নিরাপত্তা পরিষদের। কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরাষ্ট্রগুলো ভেটো–ব্যবস্থাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। এই দেশগুলো নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় ভেটো–ব্যবস্থাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। সাধারণ পরিষদও অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হচ্ছে।