ফেসবুককে এড়িয়ে...

সৌম্য সরকার ফিরে এসেছেন দারুণভাবে , ফেসবুকের নেতি বাচক মন্তব্যগুল�ো দূরে ঠেলে। ছবি: শামসুল হক
সৌম্য সরকার ফিরে এসেছেন দারুণভাবে , ফেসবুকের নেতি বাচক মন্তব্যগুল�ো দূরে ঠেলে। ছবি: শামসুল হক

ফেসবুকই কমিয়ে দিচ্ছিল বাংলাদেশের জাতীয় ক্রিকেট দলের খেলোয়াড় সৌম্য সরকারের পারফরম্যান্স! তিনি নিজেই উপলব্ধি করেছেন বিষয়টি। এরপর কিছুদিন ফেসবুক থেকে বিরত থাকার পরেই ধারাবাহিক সাফল্য পাচ্ছেন তিনি। প্রথম আলোকে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, যা সৌম্যকে ফেরাতে সাহায্য করেছে? এমন প্রশ্নের জবাবেই সৌম্য বললেন, ‘আমার কাছে মনে হয়, বাইরের কথা বেশি শুনতাম। ফেসবুকটা যখন ব্যবহার করতাম, তখন নেতিবাচক মন্তব্যগুলো আসত অনেক, যা মাথায় গেঁথে যেত। মানুষ ইতিবাচক জিনিসটা লেখেও না। এমন এক-একটা হেডলাইন আসত (ফেসবুকে শেয়ার করা), যেন আমি সবই খারাপ করেছি। আর আমরা বাংলাদেশিরা হেডলাইনটাই বেশি পড়ি, ভেতরে কী আছে পড়ে দেখি না। পরে ফেসবুক ব্যবহার বন্ধ করার কথা ভেবেছি। নেতিবাচক জিনিসগুলো কম নেব, মানুষের সঙ্গে কথা কম বলব। শুধু ইতিবাচক জিনিস নিয়েই বেশি ভাবার চেষ্টা করেছি। অনুশীলনও কম করতাম তখন, যখন খারাপ যায় তখন সবই খারাপ যায়, ভালো কিছু করলেও দেখা যায় খারাপই হচ্ছে। একটু বন্ধুদের সঙ্গে বেশি সময় কাটাতাম সেই সময়ে।’

ফেসবুক নিয়ে গবেষণাও তাই বলে। গত জুলাই মাসে প্রকাশিত ফেসবুক কর্তৃপক্ষের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী প্রতি মাসে সক্রিয় মোট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২২৩ কোটি এবং প্রতিবছর প্রায় ১১ শতাংশ করে ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ছে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় ৭ কোটি ৮০ লাখ মানুষ ইন্টারনেটের সঙ্গে সংযুক্ত। এদের মধ্যে প্রায় ২.৫ থেকে ৩ কোটি মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করে থাকে। এদের মধ্যে ৭২ শতাংশ পুরুষ। যতজন ফেসবুক ব্যবহার করে তাদের প্রায় ৮৬ শতাংশ মুঠোফোনে ফেসবুক ব্যবহার করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ে ২০১৭ সালে প্রকাশিত বিশ্বব্যাপী আরেকটি গবেষণার তথ্যমতে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যানুযায়ী ঢাকার অবস্থান দ্বিতীয়। এক নম্বরে আছে ব্যাংকক। ফেসবুক ব্যবহারকারীরা গড়ে প্রতিদিন ২০ মিনিট করে সময় ব্যয় করেন ফেসবুকে, আর সপ্তাহের মাঝামাঝি দুপুরে ফেসবুক সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়।

এই যে ফেসবুকের ব্যবহার প্রতিদিন বাড়ছে, এত এত মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করছে তাতে কখনো কখনো ÿক্ষতি তো হচ্ছেই, বিশেষ করে যখন এটি আসক্তির পর্যায়ে চলে যায় তখন। সৌম্য তো নিজেই বলেছেন—আরও অনেক তারকা-সেলিব্রেটি থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষও ফেসবুক আসক্তির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত। দিন দিন যখন ফেসবুক ব্যবহারের মাত্রা বাড়তে থাকে, চেষ্টা করেও ব্যবহারের সময় কমানো যায় না, যখন ফেসবুকে না ঢুকলে অস্বস্তি হয়, তখন ধরে নিতে হবে সেটি আসক্তির পর্যায়ে চলে গেছে।

ফেসবুক যখন ক্ষতির কারণ
একাকিত্ব: ফেসবুকে নিমগ্ন থাকতে থাকতে চারপাশের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ কমে যায়, প্রকৃত সামাজিকতার বদলে ভার্চ্যুয়াল যোগাযোগের কারণে মানুষ একা হয়ে পড়ে। ফেসবুকের জগতে ডুবে যেতে যেতে মানুষ একাকিত্বে আক্রান্ত হয়।

ওজন বেড়ে যায়: বসে বসে ফেসবুক ব্যবহার করার কারণে ওজন বেড়ে যায়, ঘাড়ে–কোমরে ব্যথা হয়।

চোখের সমস্যা: ফেসবুক ব্যবহারে, বিশেষ করে মুঠোফোনে ফেসবুক বেশি সময় ধরে ব্যবহার করলে চোখের দৃষ্টিশক্তির সমস্যা হয়।

আচরণের সমস্যা: ফেসবুকে বেশি সময় ধরে থাকতে থাকতে এবং ফেসবুকের কিছু পোস্ট আর ছবির কারণে মনোজগতের পরিবর্তন ঘটে। তখন আচরণ হয় আগ্রাসী, কখনো নৈরাশ্য চেপে বসে। উৎকণ্ঠা বেড়ে যায়।

নিরাপত্তার ঘাটতি: অচেনা মানুষজনের সঙ্গে যোগযোগ হয়—ব্যক্তিগত আর পারিবারিক এমনকি পেশাগত নিরাপত্তা ব্যাহত হতে পারে।

আবেগের বহিঃপ্রকাশের ঘাটতি: ভার্চ্যুয়াল জগতে থাকতে থাকতে প্রকৃত জগতের আনন্দ-বেদনা-হাসি-কান্না এবং অন্যান্য মানবিক গুণ কমতে থাকে। বাস্তবজীবনে আবেগের বহিঃপ্রকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।

মনোযোগ কমে যায়: ফেসবুকে সময় দিতে দিতে পেশাগত কাজে, পড়ালেখায় এবং পরিবার ও পারিপার্শ্বিকের প্রতি মনোযোগ আর দায়িত্ব কমে যায়। পারিবারিক সম্পর্কগুলো নাজুক হতে থাকে আর কর্মক্ষেত্রে কাজের মান কমে যায়, পারফরম্যান্সের ঘাটতি দেখা দেয়।

শারীরিক ভাষা দুর্বল হয়ে পড়ে: মানুষের সঙ্গে মানুষের বাস্তবজীবনে যোগাযোগের একটা বড় অংশ মুখভঙ্গি আর শরীরী ভাষার মধ্য দিয়ে প্রকাশ করে। ফেসবুকনির্ভর হয়ে গেলে শরীরী ভাষা (বডি ল্যাঙ্গুয়েজ) আর মুখভঙ্গির মধ্য দিয়ে মনের ভাব প্রকাশ করার ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যায়, এমনকি অন্যের শরীরী ভাষা, মুখভঙ্গি বুঝতে কষ্ট হয়।

সম্পর্কের জটিলতা: ফেসবুকের মাধ্যমে আবেগীয় সম্পর্কের সূত্রপাত হতে পারে। যা অনেক সময় নীতিবিরুদ্ধ। এই সম্পর্কগুলো পারিবারিক ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের মধ্যে অবিশ্বাসের জন্ম দেয়। স্বামী-স্ত্রী, প্রেমিক-প্রেমিকাসহ যেকোনো সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয়। ফেসবুকের সম্পর্কের কারণে কখনো কখনো বিবাহবিচ্ছেদ, পারিবারিক সহিংসতা এমনকি আত্মহত্যা বা হত্যার মতো ঘটনাও ঘটতে পারে।

বিষণ্নতা: ফেসবুকে আরেকজনের ‘কথিত’ বা ‘প্রদর্শিত’ সাফল্য দেখতে দেখতে মানুষ সেটি নিজের সঙ্গে তুলনা করে হতাশাগ্রস্ত হয়। সেখান থেকে বিষণ্নতা রোগ হতে পারে। বিষণ্নতার কারণে আত্মহত্যার মতো ঘটনাও ঘটে থাকে।

নেতিবাচক আবেগের জন্ম দেয়: ফেসবুকে আরেকজনের সাফল্য দেখতে দেখতে আপনার মনে জন্ম নিতে পারে ঈর্ষা আর হিংসা। সেখান থেকে ঘৃণা আর বিদ্বেষ। ফলে ফেসবুক আমাদের নেতিবাচক আবেগগুলোকে বাড়িয়ে তোলে।

তবে কি ফেসবুক বাদ দেব?
না। ফেসবুক একটি কার্যকরী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। ফেসবুকের ভালো দিকও আছে বইকি। ফেসবুক মানুষের স্ট্রেস কমানোর একটা জায়গা হতে পারে, নিজেকে প্রকাশ করার মাধ্যম হতে পারে। ব্যবসাসহ বিভিন্ন কাজে ফেসবুকের কার্যকরী ইতিবাচক ভূমিকা রয়েছে। ফেসবুক কোনো নিষিদ্ধ বিষয় না, ফেসবুক ব্যবহার মোটেই দোষণীয় নয় কিন্তু এর ব্যবহার হতে হবে পরিশীলিত আর যৌক্তিক, এবং কোনোভাবেই নিজের ক্ষতি করে নয়। পরিশীলিত আর যৌক্তিকভাবে ফেসবুক ব্যবহারের জন্য কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে:

● যখন-তখন ফেসবুকে প্রবেশ নয়। দিনের একটা নির্দিষ্ট সময়ে এবং একদম নির্ধারিত একটি সময় ফেসবুক ব্যবহার করুন।

● মুঠোফোনে ফেসবুক ব্যবহার করতে হলে ব্রাউজার দিয়ে ব্যবহার করুন। এসব ব্যবহার করলে দৈনন্দিন ব্যবহারের সময় বেড়ে যাবে।

● ফেসবুক ব্যবহার শেষে প্রতিবার লগ আউট করুন আর প্রতিবার ব্যবহারের আগে লগ ইন করুন। এতে করে আপনার ব্যবহারের সময় কমে আসবে আর নিরাপত্তাব্যবস্থাও শক্ত হবে।

● সকালে ঘুম থেকে উঠেই ফেসবুক খুলবেন না, এটি আসক্তির অন্যতম একটি লক্ষণ। এমনকি রাতে ঘুমানোর সময় শুয়ে শুয়ে ফেসবুক ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন। এটি আসক্তি তৈরি করে, ঘুমের সমস্যা করে।

● ফেসবুকে রাগ বা নেতিবাচক আবেগের প্রকাশ করবেন না। উত্তেজিত অবস্থায় বা মাদক গ্রহণ করে কখনোই ফেসবুকে পোস্ট করবেন না, মন্তব্য করবেন না।

● রাষ্ট্রের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমবিষয়ক বিদ্যমান আইনগুলো সম্পর্কে জানুন। আইন মেনেই ফেসবুক ব্যবহার করুন।

● আপনি যে প্রতিষ্ঠানে বা সংস্থায় কাজ করেন, সেই প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কিছু নীতি রয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমবিষয়ক। অযথা হিরো হতে যেয়ে প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার নিয়ম ভেঙে ফেসবুকে কোনো ছবি বা ভিডিও আপলোড করবেন না।

● ফেসবুকে প্রাইভেসি সেটিং এমনভাবে রাখুন যাতে আপনার নিরাপত্তা ব্যাহত না হয়।

● জীবন সঙ্গীর সঙ্গে লুকোছাপা করবেন না। সাময়িক আনন্দ আর উত্তেজনার কারণে হঠকারী হয়ে কোনো সম্পর্কে জড়াবেন না।

● কয়েক দিন ফেসবুক থেকে দূরে থেকে দেখুন আপনার পেশাগত দক্ষতা বাড়ছে কি না, সামাজিক সম্পর্কগুলো কতটুকু দৃঢ় হচ্ছে। এর পর আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারবেন ফেসবুকের পরিশীলিত আর যৌক্তিক ব্যবহার আপনাকে কতটুকু সত্যিকারের সামাজিক স্বাচ্ছন্দ্য দেয়, কাজের মান কতটুকু বাড়ায়।

● যখনই দেখবেন ফেসবুক ব্যবহার না করতে পারলে আপনার মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে; আর দিন দিন ফেসবুকে বেশি বেশি সময় কাটাচ্ছেন, তখন বুঝতে হবে আপনার মধ্যে আসক্তি তৈরি হচ্ছে। আসক্তি কাটাতে প্রয়োজনে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

আহমেদ হেলাল: সহযোগী অধ্যাপক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, ঢাকা।