একেবারেই নিজস্ব

মহিষের দই বললেই যেমন চলে আসে নোয়াখালীর নাম, তেমনি থইকরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সিলেট অঞ্চলের খাবারের ঐতিহ্য। এমনই একেক অঞ্চলের একেক খাবার তুলে ধরে সেই এলাকার বিশেষত্ব। পাহাড়ি তোজাহ কিংবা দিনাজপুরের পেলকা ঐতিহ্যবাহী খাবারের শেষ নেই। কয়েকটি অঞ্চলের খাবারের রেসিপি থাকছে এখানে।

বগুড়া

গরুর মাংসে আলুর ঘাঁটি বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী একটি খাবার। রেসিপি দিয়েছেন আফরোজা নাজনীন

আফরোজা নাজনীন
আফরোজা নাজনীন

গরুর মাংসে আলুর ঘাঁটি
উপকরণ
আলুর ঘাঁটি: আলু সেদ্ধ (আধা ভাঙা) ২ কাপ, পেঁয়াজকুচি ২ টেবিল চামচ, পেঁয়াজ ও রসুনবাটা আধা চা-চামচ, আদাবাটা দেড় চা-চামচ, মরিচগুঁড়া ২ চা-চামচ, হলুদগুঁড়া ১ চা-চামচ, জিরাবাটা দেড় চা-চামচ, আস্ত গরমমসলা (বড় ও ছোট এলাচি, দারুচিনি, লং ও তেজপাতা) পরিমাণমতো, পাঁচফোড়ন সিকি চা-চামচ, লবণ স্বাদমতো, তেল পরিমাণমতো।
গরুর মাংস: গরুর মাংস আধা কেজি, পেঁয়াজকুচি ৩ টেবিল চামচ, পেঁয়াজবাটা আধা চা-চামচ, আদাবাটা দেড় চা-চামচ, রসুনবাটা ১ চা-চামচ, ধনেগুঁড়া ও জিরাবাটা দেড় চা-চামচ, লবণ স্বাদমতো, তেল ও আস্ত গরমমসলা (এলাচি, দারুচিনি, লং, তেজপাতা) পরিমাণমতো।

গরুর মাংসে আলুর ঘাঁটি
গরুর মাংসে আলুর ঘাঁটি

প্রণালি
গরম তেলে পেঁয়াজ ভেজে তাতে আস্ত গরমমসলা ও পেঁয়াজবাটা দিয়ে নেড়ে নিতে হবে। এবার বাকি সব মসলা অল্প পানি দিয়ে কষিয়ে নিয়ে গরুর মাংস দিন। মাংস কষানো হলে পানি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। ভালোভাবে সেদ্ধ হলে নামিয়ে নিন। আরেকটি কড়াইয়ে গরম তেলে পাঁচফোড়ন দিয়ে তাতে পেঁয়াজকুচি ভেজে নিন। এবার পেঁয়াজবাটা ও বাকি সব মসলা অল্প পানি দিয়ে কষিয়ে আলুগুলো দিয়ে দিন। আলু কষানো হলে রান্না করা গরুর মাংস ও অল্প পানি দিয়ে ঢেকে দিন। বলক উঠে ঝোল ঘন হয়ে এলে নামিয়ে নিন।


সিলেট
সিলেটে থইকরের খাট্টা বেশ জনপ্রিয় একটি খাবার। থইকর অপ্রচলিত ফল হলেও সিলেট অঞ্চলে সাতকরার মতো প্রায় সারা বছরই পাওয়া যায়। টকজাতীয় এই ফল ছোট মাছের রান্নাতেই বেশি ব্যবহার করা হয়। রেসিপি দিয়েছেন কাজী তাসলিমা

কাজী তাসলিমা
কাজী তাসলিমা

থইকরে ছোট মাছের খাট্টা
উপকরণ
পাঁচমিশালি ছোট মাছ ২৫০ গ্রাম, থইকর (মাঝারি আকৃতির) চার ভাগের এক ভাগ, রসুন কোয়া পাঁচটি, রসুনবাটা এক টেবিল চামচ, পেঁয়াজবাটা দুই টেবিল চামচ, ধনেগুঁড়া ২ চা-চামচ, হলুদগুঁড়া ৩ চা-চামচ, মরিচগুঁড়া ১ চা-চামচ, লবণ ১ চা-চামচ, তেল ৩ টেবিল চামচ।

থইকরে ছোট মাছের খাট্টা
থইকরে ছোট মাছের খাট্টা

প্রণালি
চুলায় পাত্র বসিয়ে তেল গরম করে নিন। এরপর রসুন কোয়া একটু হালকা করে ভেজে নিন। একে একে সব মসলা, লবণ দিয়ে অল্প পানিতে কষিয়ে নিন। এবার থইকর ও মাছ দিয়ে ঢেকে রাখুন। পাঁচ মিনিট পর পানি দিয়ে আবার ১০ থেকে ১২ মিনিট ঢেকে রাখুন। এবার নামিয়ে নিন। যাঁরা একটু ঝাল পছন্দ করেন, নামানোর আগে স্বাদমতো কাঁচা মরিচ দিয়ে নিন।


বান্দরবান

শৈনু প্রু মারমা
শৈনু প্রু মারমা

পাহাড়িদের কাছে জনপ্রিয় খাবার তোজাহ্। তোজাহ্ আসলে চাটনি-জাতীয় একটি খাবার, যা সেদ্ধ শাকসবজি দিয়ে তৈরি হয়। পার্বত্য অঞ্চলের যেকোনো রেস্তোরাঁয় খেতে বসলে আপনাকে অন্য খাবারের সঙ্গে তোজাহ্ দেবেই। রেসিপি দিয়েছেন বান্দরবানের উজানীপাড়ার জুম্ম রেস্তোরাঁর রাঁধুনি শৈনু প্রু মারমা

তোজাহ্
উপকরণ
মুলা, মুলার শাক, কলার থোড়, চিচিঙ্গা, বেগুন, হলুদের ফুলসহ পছন্দমতো তাজা শাকসবজি, কাঁচা মরিচ ১০-১২টা, নাপ্পি বা চিংড়ির শুঁটকি এক বাটি, ধনেপাতা কয়েকটি গাছ, লবণ স্বাদমতো ও লেবু অর্ধেকটা অথবা আদাপাতা ১টা (বড়)।

তোজাহ্
তোজাহ্

প্রণালি
শাকসবজি পরিস্কার পানি ও পরিমাণমতো লবণ দিয়ে সেদ্ধ করতে হবে। খুব বেশি নরম না করে মাঝারি মানে সেদ্ধ করে নিন। আলাদা করে মরিচ সেদ্ধ করতে হবে। কয়লার আগুনে নাপ্পি পোড়াতে হবে অথবা চিংড়ি শুঁটকি মচমচে করে ভেজে নিন। পোড়া নাপ্পি অথবা ভাজা চিংড়ি শুঁটকি দিয়ে মরিচ বাটতে হবে। সেদ্ধ করা শাকসবজি ওই নাপ্পিবাটা অথবা চিংড়ি শুঁটকিবাটার সঙ্গে মিশিয়ে চটকে নিন। তৈরি হয়ে যাবে তোজাহ্।

চট্টগ্রাম

জোবাইদা আশরাফ
জোবাইদা আশরাফ

শুধু মেজবানি মাংস আর শুঁটকিই নয়, চট্টগ্রামে আছে মজাদার আরও নানা খাবার। রঙিলা বিন্নি ভাতে মালাই হাঁস চট্টগ্রামের তেমনি বিখ্যাত একটি খাবার। রেসিপি দিয়েছেন
জোবাইদা আশরাফ

রঙিলা বিন্নি ভাতে মালাই হাঁস
উপকরণ
বিন্নি ভাতের জন্য: বিন্নি চাল ৫০০ গ্রাম, নারকেল কোরা ১ কাপ, কাজুবাদাম, পেস্তা বাদাম ও কিশমিশ সব ১ টেবিল চামচ করে, লবণ পরিমাণমতো, তেজপাতা ২টি ও দারুচিনি ১ টুকরো। এ ছাড়া দুধে ভেজানো জাফরান ১ চা চামচ ও খাবার রং ২ রকমের।

মালাই হাঁসের জন্য: হাঁস টুকরা করা ১টি, নারকেলের দুধ ৩ কাপ, ঘি ও তেল পৌনে এক কাপ, পেঁয়াজকুচি ১ কাপ, আদাবাটা ১ টেবিল চামচ, রসুনবাটা আধা টেবিল চামচ, জিরাগুঁড়া ১ চা-চামচ, ধনেগুঁড়া ২ চা-চামচ, মরিচগুঁড়া ২ চা-চামচ, হলুদগুঁড়া ১ চা-চামচ, কাজুবাটা ১ টেবিল চামচ, এলাচি ৪টি, দারুচিনি ২ টুকরা, তেজপাতা, লবণ পরিমাণমতো, টক দই আধা কাপ, কাঁচা মরিচ ৭টি, লেবুর রস ও চিনি ২ চা-চামচ।

রঙিলা বিন্নি ভাতে মালাই হাঁস
রঙিলা বিন্নি ভাতে মালাই হাঁস

প্রণালি
বিন্নি ভাত: বিন্নি চাল ভালো করে ধুয়ে ১ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখার পর পানি ঝরিয়ে নিন। জাফরান ও খাবারের রং ছাড়া বিন্নি ভাতের বাকি উপকরণ মেখে স্টিম বয়লারে ভাত না ফোটা পর্যন্ত স্টিম করতে হবে। ভাত ফুটে গেলে জাফরান দিয়ে নামিয়ে নিন। এরপর আলাদা আলাদা রং করে সার্ভিং ডিশে পরিবেশন করা যাবে।

মালাই হাঁস: হাঁসের মাংস ভালো করে ধুয়ে নিন। কড়াইয়ে ২ টেবিল চামচ তেল ও ঘি গরম করে ২ টেবিল চামচ পেঁয়াজকুচি দিয়ে দিন। লাল হয়ে এলে হাঁসের মাংস দিতে হবে। এরপর পরিমাপ অনুযায়ী সব মসলা দিয়ে দিন। মাংস ভালো করে সেদ্ধ করতে টক দই দিন। প্রয়োজনে গরম পানি দিয়ে করতে পারেন। এরপর নারকেলের দুধ দিয়ে মাংস ভালোভাবে সেদ্ধ করে নিন। ঝোল মাখা মাখা হলে নামিয়ে নিন। আরেকটা প্যানে বাকি ঘি ও তেল গরম করুন। এবার বাকি পেঁয়াজ বেরেস্তা করে তেল-ঘিসহ হাঁসের মাংসে ঢেলে দিন। একটু নেড়ে নিয়ে লেবুর রস, চিনি দিয়ে দমে ১৫ মিনিট রাখুন। এরপর নামিয়ে বিন্নি ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন মালাই হাঁস।

খুলনা

রমা রহমান
রমা রহমান

বাণিজ্যিকভাবে চাষের কারণে চিংড়ি খুলনা অঞ্চলের একটি জনপ্রিয় খাবার। নানা ধরনের চিংড়ি রান্না হয় খুলনায়। এর মধ্যে চিংড়ির মালাইকারি বিশেষভাবে তৈরি হয় উত্সবে বা অতিথি এলে। রেসিপি দিয়েছে খুলনার রূপসা কলেজের অধ্যাপক রমা রহমান

চিংড়ির মালাইকারি
উপকরণ
বাগদা অথবা গলদা চিংড়ি মাছ আধা কেজি (একটু বড় আকারের), নারকেল দুধ দুই কাপ, কিশমিশ ১২-১৫টি, এলাচি ৩-৪টি, গরমমসলা সামান্য, পেঁয়াজবাটা ৪ টেবিল চামচ, রসুনবাটা আধা চা-চামচ, জিরাবাটা আধা চা-চামচ, লবণ পরিমাণমতো, হলুদ এক চিমটি, চিনি স্বাদমতো, ঘি আধা চা-চামচ ও কাঁচা মরিচ ৭-৮টি।

চিংড়ির মালাইকারি
চিংড়ির মালাইকারি

প্রণালি
প্রথমে মাছগুলো ধুয়ে সামান্য লবণ ও হলুদ মাখিয়ে অল্প ভেজে তুলে রাখুন। সসপ্যানে তেল দিয়ে পেঁয়াজ, রসুন, জিরা দিয়ে নাড়তে হবে। কিছুক্ষণ পর তার মধ্যে কিশমিশ, গরমমসলা, এলাচি, দুধ, চিনি, লবণ দিয়ে নাড়তে হবে। মসলা ফুটে উঠলে মাছগুলো দিয়ে দিন। এবার খুব অল্প আঁচে রান্না করুন। নাড়তে নাড়তে তেল ভেসে মসলাটা মাখা মাখা হলে আগে কাঁচা মরিচ, তারপর ঘি ছড়িয়ে নামিয়ে ফেলতে হবে।

রংপুর

তামিমা আখতার
তামিমা আখতার

রংপুরে অতিথি অ্যাপায়নে বা যেকোনো বিশেষ দিনে তৈরি হয় নানা পদের পিঠা। এই অঞ্চলে পিঠার স্বাদে রয়েছে ভিন্নতা, তৈরির উপকরণেও আছে নতুনত্ব। রংপুরের প্রচলিত দুটি পিঠার রেসিপি দিয়েছেন তামিমা আখতার

বটপাতা পিঠা
বটপাতা পিঠা

বটপাতা পিঠা
উপকরণ: ময়দা, চিনি ও দুধ প্রতিটি ১ কাপ, ডিম ১টি, লবণ এক চিমটি।
প্রণালি: প্রথমে ডিম ও দুধ ফেটিয়ে নিন। এরপর ময়দা দিয়ে খামির তৈরি করুন। ছোট ছোট রুটি আকারে বেলে ছুরি দিয়ে চিকন ও লম্বা করে কেটে নিন। এবার বটপাতার মতো করে ভাঁজ দিন। এরপর ডুবো তেলে ভেজে নিয়ে চিনির শিরায় দিলে তৈরি হবে বটপাতা পিঠা।

নলা বা গড়গড়ি মিষ্টি পিঠা
নলা বা গড়গড়ি মিষ্টি পিঠা

নলা বা গড়গড়ি মিষ্টি পিঠা
উপকরণ: চালের গুঁড়া ৫০০ গ্রাম, নারকেল একটি, গুড় এক মুঠো, লবণ এক চিমটি।
প্রণালি: প্রথমে সামান্য পানি দিয়ে গুড় গলিয়ে নিতে হবে। এরপর কোরানো নারকেল, লবণ ও চালের গুঁড়ার ওপর গুড় ঢেলে দিতে হবে। খেয়াল রাখবেন খামিরটি যেন খুব বেশি নরম না হয়।
এবার মিশ্রণটি হাতে মুঠো করে ভাপে সেদ্ধ করে নিন।

দিনাজপুর

খালেদা ফেন্সী
খালেদা ফেন্সী

দিনাজপুরের গ্রামীণ সমাজে ‘পেলকা’ একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও উপাদেয় খাবার। রেসিপি দিয়েছেন খালেদা ফেন্সী
পেলকা
উপকরণ
শাক (পাট, কচু, শজনে ও মিষ্টিকুমড়ার পাতা) পরিমাণমতো, খাবার সোডা এক চিমটি, রসুন ১টা, কাঁচা মরিচ ও লবণ স্বাদমতো।

পেলকা
পেলকা

প্রণালি
ডেকচিতে ২ থেকে ৩ লিটার পানি দিয়ে লবণ মিশিয়ে চুলায় বসান। এবার শাকপাতাগুলো পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে কুচি কুচি করে কেটে নিন। চুলায় পানি ফুটলে শাকপাতা ফুটন্ত পানিতে ছেড়ে দিতে হবে। এবার আদা, রসুন, কাঁচা মরিচ (সব কাটা) ও সামান্য পরিমাণে খাবার সোডা দিয়ে নেড়ে নিন। পাতিলের তলায় যেন না লেগে যায় এ জন্য মাঝেমধ্যে চামচ দিয়ে নাড়তে হবে। শাকটা পাতলা হয়ে এলে নামিয়ে নিন।

নোয়াখালী

কমল কান্তি সাহা
কমল কান্তি সাহা

নোয়াখালীর উপকূলীয় চরাঞ্চলে মহিষের খাঁটি দুধ থেকে দই তৈরি করা হয়। কেউ কেউ টকদইও বলে থাকে। তবে নোয়াখালীতে এটি মহিষের দই নামেই পরিচিত। রেসিপি দিয়েছেন কমল কান্তি সাহা

মহিষের দই
উপকরণ
মহিষের দুধই এই দই তৈরির প্রধান উপকরণ। এটি তৈরিতে সাধারণত মাটির পাতিল ব্যবহার করা হয়।

মহিষের দই
মহিষের দই

প্রণালি
দুধ দেড় থেকে দুই ঘন্টা বড় পাত্রে রেখে দেওয়া হয়। এরপর ওই দুধ বিভিন্ন আকারের মাটির হাঁড়িতে রাখা হয়। পরদিন সকালে হাঁড়ির নিচের দিকে এক পাশে ফুটো করে পানি বের করে ফেলা হয়। আর পাতিলে রাখা দুধ দই হয়ে যায়। মহিষের দই তৈরির পর কোনো ধরনের প্রক্রিয়াজাত ছাড়াই তিন-চার দিন ঘরে রেখে খাওয়া যায়। এর চেয়ে বেশি সময় কেউ রাখতে চাইলে তা ফ্রিজে সংরক্ষণ করতে পারেন।
আঞ্চলিক রান্না সংগ্রহ: চট্টগ্রাম অফিস, সিলেট অফিস, রংপুর অফিস, খুলনা অফিস, দিনাজপুর, বান্দরবান ও নোয়াখালী প্রতিনিধি