সেসব দিনের কথা খুব মনে পড়ে, আমার সেই ছোট্টবেলার কথা। আমি যে বিদ্যালয়ের ছাত্রী, তুমি সেই বিদ্যালয়ের শিক্ষক। তোমার সঙ্গে স্কুল থেকে ফেরার পথে রোজ আমার কত বায়না—রাবার দাও, পেনসিল দাও, শনপাপড়ি দাও, চকলেট মিল্ক দাও। প্রতিটা দিন আমার বায়না মেটাতে তুমি হাসিমুখে। সেই যে তোমার সঙ্গে স্কুল থেকে ফেরা, তোমার আঁচল ধরে টানাটানি করা, আর এটা–ওটার আবদার, সেসব দিনে আবার যদি ফিরে যেতে পারতাম! আমি ভেতরে ভেতরে সেই আগের মতোই আছি। তুমিও বদলাওনি এতটুকু, শুধু বদলে গেছে সময়।

বেশ কয়েক বছর আগের কথা। সদ্য শিক্ষাজীবন শেষ করে আমি তখন চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছি। প্রতিদিন ভোরবেলায় আমাকে ঘুম থেকে তুলে তুমি স্কুলে যেতে। পড়ার টেবিলে বসে জানালা দিয়ে তোমার চলে যাওয়া দেখতে দেখতে অজান্তেই চোখে পানি আসত। মনে মনে প্রতিজ্ঞাটা আরও দৃঢ় হতো—একদিন ভালো চাকরি করব, তোমাকে আর কষ্ট করতে দেব না। ভোরবেলায় তোমার আর হেঁটে হেঁটে অনেক দূরে গিয়ে বাসে ওঠা লাগবে না, দুইবার বাস বদলে স্কুলে যাওয়া লাগবে না। তোমার মেয়েই তোমার সংসার সামলাবে, তোমার মেয়েই তোমার জীবনকে পরিপূর্ণ করে দেবে।

আমার বিসিএস পরীক্ষার ফলাফল যেদিন হলো, জানলাম আমি প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত, সেদিন আমি হাসপাতালে আব্বুর পাশে আর ওদিকে তুমি নিজেই তখন অসুস্থ হয়ে পড়ে ছিলে বাসায়। খবরটা পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে তোমার প্রতিক্রিয়া কী ছিল, তা তো আর কোনো দিন জানতে পারব না। তবে কিছুটা সুস্থ হয়ে তুমি যখন হাসপাতালে ফিরে এলে, ডাক্তার-নার্স যাঁরাই আব্বুর দেখভাল করতে আসছিলেন, তাঁদেরই তুমি বলছিলে, তোমার মেয়ে ম্যাজিস্ট্রেট হয়েছে। একটু দূরে দাঁড়িয়ে তোমার পরিতৃপ্তি মাখা মুখটা দেখছিলাম আর ভাবছিলাম, এই দিনের জন্যই তো আমার এত পরিশ্রম।

কোনো দিন তুমি বলোনি ফার্স্ট হতে হবে, অমুক চাকরিটা পেতেই হবে। শুধু বলেছ, ‘ভালো মানুষ হও।’ ভালো মানুষ হতে পেরেছি কি না, জানি না। শুধু জানি, আমি অন্ধের মতো তোমাকেই অনুসরণ করে যাব। কারণ আমি জানি, তোমার জীবনাচরণ অনুসরণ করলে আমার কাজে কেউ কখনো কষ্ট পাবে না।

তোমাকে ভালোবাসি আম্মু। তুমি ছাড়া আমি অস্তিত্বহীন। এভাবেই থেকো, আমাকে এভাবেই রেখো।

জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন