আধুলি ও শিঙাড়ার গল্প

.
.

শেষ পর্যন্ত সহজ বিষয়টা আর সহজ রইল না। ভাইয়ার সঙ্গে আমার মারামারি, কান্নাকাটি, এমনকি কয়েকজনের কাছে বিচার দিয়েও রায় আমার দিকে আনা গেল না। বেশির ভাগ মানুষই ভাইয়ার পক্ষ নিল আর আমাকে এটা-ওটা বোঝাতে লাগল। কিন্তু আমি বুঝলে তো? আমার মেজো ভাই আমার থেকে সাড়ে তিন বছরের বড়। ঘটনার সময়কালে আমার বয়স আনুমানিক সাত হলে ভাইয়ার বয়স কত? আমি আবার অঙ্কে ভীষণ কাঁচা। ঘটনাও এই অঙ্কের হিসাব নিয়ে।
চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে বাংলাদেশ ব্যাংক কলোনির যে বাসায় থাকতাম, তার দক্ষিণ দিকে সোনালী ব্যাংক কলোনি। এই দুই কলোনির মাঝে রাস্তা, রাস্তা ঘেঁষে টিনের ছাউনির দোকান। সেখানে চুল কাটার দোকান থেকে শুরু করে হোটেল-রেস্তোরাঁ, লেপ-কাঁথার দোকান—সবই জেঁকে বসেছে। ভাইয়ার হাতে বাবা সাত টাকা গুঁজে দিয়ে বললেন—যা, শওকতকে (আমার ডাকনাম) সঙ্গে নিয়ে চুল কেটে আয়। প্রচণ্ড গরমে হাঁটতে হাঁটতে দোকানে গিয়ে দেখি অনেক মানুষের ভিড়। নরসুন্দর বলতে মোটে একজন। আমাদের সিরিয়াল পেতে সময় লাগবে ঢের। আমি আর ভাইয়া বসে আছি অনেকক্ষণ। গরমে বসে থেকে সেদ্ধ হচ্ছি আর ঘামছি অবিরত। এর মধ্যে আমাদের সিরিয়াল এল। ভাইয়া বড় হিসেবে আগে গিয়ে বসে পড়ল। আমি বসে আছি। ভাইয়ার চুল ছাঁটা শেষ হলে এল আমার পালা। কাঁচির ঘ্যাচ ঘ্যাচাং শব্দে আমার চুল ছাঁটা হচ্ছে। এর মধ্যে খিদেয় পেটেও চোঁচোঁ করছে। ভাইয়া  যে কখন নাপিতের দোকান থেকে বের হয়ে হোটেলে গিয়ে শিঙাড়া খাচ্ছে টের পাইনি। কিছু সময় পরে দেখি ভাইয়া দোকানে ফিরেছে। হাতে শিঙাড়া—একটা খাচ্ছে আর একটা হাতে নিয়ে বসে আছে। ধরেই নিলাম ওইটা আমার জন্য। এদিকে আমার চুল ছাঁটা চলছেই। ভাইয়ার শিঙাড়া শেষ। আমি চোখের কানা দিয়ে খেয়াল রাখছি আমারটার কী অবস্থা। হঠাৎ দেখি ভাইয়া আমার শিঙাড়ায় কামড় বসিয়েছে। আমি চুল ছাঁটা অবস্থায় চিৎকার করে উঠলাম। ভাইয়া গপাগপ খেয়েই যাচ্ছে। আমাকে ধরে রাখা দায়—নাপিত আর চুল কাটতে পারে না আমার নড়াচড়ায়। ভাইয়া আমাকে বোঝাতে লাগল, ‘তোরটা আমি তোরে দিয়া দিমু। তুই শান্ত হ। ‘আমি বললাম’ আপনে তো আমারটা খেয়েই ফেলছেন, কেমনে দিবেন?’ ভাইয়া পকেট থেকে একটা আধুলি বের করে আমার হাতে দিয়ে বলল, ‘নে, এই দিয়ে তুই একটা শিঙাড়া কিনে নিস।’ আমি বললাম, আপনে খাইলেন দুইটা আর আমি একটা খামু না! ভাইয়া বোঝাতে লাগল—এক টাকায় দুইটা শিঙাড়া পাওয়া যায়। আমি তো একটা শিঙাড়া নিজের পয়সায় খাইছি। তুই একটাই পাবি। আমি বললাম, কেমনে? ভাইয়া বলল, বাবা দিছে সাত টাকা, দুইজনের চুল ছাঁটায় নাপিত পাইব তিনে তিনে মোট ছয় টাকা। বাকি থাকে এক টাকা। আমি পঞ্চাশ পয়সা, তুই পঞ্চাশ পয়সা। সহজ হিসাব। এবার হইল?

আমি তো রাজি না। ভাইয়া খেলো দুইটা শিঙাড়া আর আমি কি না একটা? এইটা কোনোভাবেই হবে না। শেষ পর্যন্ত দুইজনের হাতাহাতি আর কান্নাকাটিতে আমার চুল ছাঁটা বন্ধ হলো। ভাইয়া সবাইকে বোঝাতে লাগল তাঁর সহজ হিসাব। উপস্থিত সবাই তো দেখল ভাইয়ার হিসাব ঠিকই আছে। আমাকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে চুল ছাঁটার পর্ব শেষ করল সবে। আমি পঞ্চাশ পয়সা দিয়ে একটা শিঙাড়াই কিনে খেতে লাগলাম আর হিসাব মেলাতে লাগলাম—ভাইয়া খাইছে দুইটা আর আমি একটা...কেমনে মিলল...? গণিতে মাস্টার্স করে একটা ব্যাংকের শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এই আমি এখনো কি সেই হিসাব মেলাতে পেরেছি!

মাসুম হোসেন চৌধুরী

টেকনাফ, কক্সবাজার।