আফা নামটা লেখেন, তাও একটু শান্তি পামু

বন্যায় পানিবন্দী জনপদের দৃশ্য এমনই। জামালপুরের ইসলামপুর এলাকা থেকে ছবিটি তুলেছেন জগলুল পাশা
বন্যায় পানিবন্দী জনপদের দৃশ্য এমনই। জামালপুরের ইসলামপুর এলাকা থেকে ছবিটি তুলেছেন জগলুল পাশা

ইঞ্জিনচালিত নৌকা কাছে ভিড়তেই ছুটে আসে অনেক মানুষ। এসেই এই প্রতিবেদকের কাছে বলতে থাকেন—‘আমার নামটা একটু লেখেন। আমার স্বামীর নামটা একটু লেখেন।’ একজন ক্ষীণকণ্ঠে বললেন, ‘আমার পুলাডা প্রতিবন্ধী, ওর নামটাও একটু লেখেন। বানভাসি মানুষের ধারণা, নাম লিখে নিলেই মিলবে ত্রাণ। তারপর তাঁদের বলা হলো, আমরা পত্রিকা থেকে এসেছি। কেউ কেউ একটু দমে গেলেন। কিন্তু হাল ছাড়লেন না। এক নারী একটু রাগতস্বরেই বললেন, ‘আফা নামটা লেখেন, তাও একটু শান্তি পামু।’
৩০ জুলাই, জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে এই মানুষদের মুখোমুখি হয়ে বুঝতে পারি পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ। তত দিনে বন্যার পর পার হয়েছে ১০ দিন। তাঁদের অভিযোগ, কেউ দেখতে যাননি। ত্রাণ পাননি। কিন্তু পরিবারের সদস্যদের মুখে কিছু একটা তুলে দিতে হবে। কোনো কোনো নারীর কণ্ঠস্বর আর্তনাদের মতো মনে হলো। ইঞ্জিনচালিত নৌকা আবার চলতে শুরু করলে মানুষগুলোর মুখ মলিন হতে থাকে।
জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার নোয়ারপাড়া ইউনিয়নের উলিয়া, বলিয়াদহ, আমতলী, ডেবরাইব্যাচ, চিনাডুলী ইউনিয়নের দক্ষিণ ও পশ্চিম বামনা, দেওয়ানপাড়া, আজমবাগ, নতুনপাড়া, পাথর্শী ইউনিয়নের বানিয়াবাড়ি এলাকায় নৌকায় ঘুরে এ চিত্রই পাওয়া যায়। বেশির ভাগ ঘরে প্রায় কোমর পর্যন্ত পানি। কেউ কেউ সেখানেই থাকছেন পানি কমার আশায়। অনেকে ঘরবাড়ি ফেলে আশ্রয় নিয়েছেন সেতুর ওপর বা উঁচু কোনো জায়গায়। চারপাশে পানি বয়ে চলার শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই।
প্রথম আলোর জামালপুর প্রতিনিধি আব্দুল আজিজ পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। পথ বলতে যমুনা নদী, স্কুলের মাঠ বা বাড়ির আঙিনা সবই তো একাকার।
স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ওই দিন পর্যন্ত ১০ দিনে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ, মেলান্দহ, মাদারগঞ্জ ও বকশীগঞ্জ উপজেলার পাঁচ লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দী। এর মধ্যে সবচেয়ে দুর্গত এলাকা ইসলামপুরেই আছে দুই লাখের বেশি মানুষ।

আশ্রয় মিলেছে সড়কের সেতুতে, তবুও সামলাতে হচ্ছে নিত্যদিনের কাজ
আশ্রয় মিলেছে সড়কের সেতুতে, তবুও সামলাতে হচ্ছে নিত্যদিনের কাজ

দুর্যোগ নিয়ে কর্মরতদের মতে, যেকোনো দুর্যোগে সবচেয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে পরিবারের নারী ও শিশুরা। ওই পরিবারে প্রতিবন্ধী বা প্রবীণ সদস্য থাকলে তো কথাই নেই।
হিন্দু নারী জমনি চার সন্তান নিয়ে রাস্তায় আশ্রয় নিয়েছেন। টাকাপয়সাসহ ঘরের কোনো কিছুই উদ্ধার করতে পারেননি। কাজলীর স্বামী শ্রী ডেফল জুতা পালিশ ও সেলাইয়ের কাজ করেন। তাঁদের তিন ছেলে, তিন মেয়ে। জমনির সঙ্গে যখন কথা হয়, তখন তাঁর পাশেই বসা ছিল ১৪-১৫ বছর বয়সী মানসিক প্রতিবন্ধী মেয়ে। মেয়ে বসে বসে হাসছে। জমনির ভাষায় সে ‘পাগল মাইয়্যা’। এই মেয়েকে দেখে রাখাই জমনির জন্য কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। খোলা রাস্তায় কখন কোন দিকে চলে যায় বা কার মনে কী আছে, তাই বা কে জানে।
সাহেবানীর চিন্তা তাঁর এক মেয়ে বিয়ের লায়েক বা উপযুক্ত হয়েছে। এই বয়সী মেয়েকে নিয়ে খোলা আকাশের নিচে কত দিনই বা থাকা যায়?
চারপাশে পানি থইথই করছে। তার মধ্যেই একটু উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে বেলুনি বললেন, ‘আমরা কষ্টত আছি। তিন দিন ধইরা ভাত রান্না করি নাই। পুলাপাইনরে আর কতক্ষণ চোখে চোখে রাখন যায়? আমরা কেমনে চলব, তা একটু বইল্যা যান।’
জোহরার স্বামী মারা গেছেন। ঘর এখন পানির তলায়। একমাত্র ছেলেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়িয়েছিলেন। ছেলে ঘর থেকে বইগুলোও রক্ষা করতে পারেনি।
মর্জিনা তাঁর তিন বছর ও ১০ মাস বয়সী দুই মেয়েকে নিয়ে যেখানে আশ্রয় নিয়েছেন সেখানে অনেক মানুষের গরু, ছাগল ও হাঁস-মুরগিও থাকছে। ১০ মাস বয়সী মেয়ের সারা শরীরে ঘা হয়েছে। মর্জিনা জানালেন, বাড়ি থাকা অবস্থায় মেয়েকে সুজি খাওয়াতেন। এখন এক সপ্তাহ ধরে শুধু বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন। চিড়া, মুড়ি খেয়ে দিন পার করছেন মর্জিনা।
চিনাডুলি এলাকায় নৌকা থেকে নামতেই শাহিদা ছুটে এলেন। তিনি শুনেছেন এলাকার চেয়ারম্যান ত্রাণ দেবেন। কিন্তু তাঁর তো পুত্রসন্তান নেই। এই ত্রাণ কীভাবে সংগ্রহ করবেন তা ভেবেই পাচ্ছিলেন না। ‘সোহাগী, চিনিমন, আলেয়া, আরজেনা, ছমিরন, মালেঞ্চা, লজ্জাবতী, চন্দ্র, আছিয়া, মাজেদা, আলো, আবেদা—একটার পর একটা নাম লিখছি খাতায়। লিখতে হচ্ছে এই নারীদের মনে একটু শান্তি দেওয়ার জন্য।’
প্রায় ৯০ বছর বয়সী শতভান কোনো এক অদ্ভুত শক্তিবলে ভিড় ঠেলে সামনে চলে এলেন। জানালেন, স্বামী মারা গেছে অনেক আগে। এক ছেলে আছে কিন্তু সেও তো ‘পাগল’।
চিনাডুলী ইউনিয়নে ২২ হাজার ভোটার। ১০ কেজি করে চাল দেওয়ার জন্য ৮০০ স্লিপ দেওয়া হয়েছে। যাঁরা পাননি তাঁরা একটি স্লিপ পেতে মরিয়া হয়ে পড়েছেন। এ ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের সভাপতি নাফিকুল ইসলাম জানালেন, ইউনিয়নটি অনেক বড়। ত্রাণ খুব কম আসছে। টয়লেট, খাবার পানি এবং গবাদিপশুর খাবারের তীব্র সংকট। এলাকায় এখন পর্যন্ত কোনো মেডিকেল দল আসেনি। পানিতে থাকতে থাকতে অনেকের হাত, পায়ে ঘা হয়ে গেছে। পানি নেমে গেলে অবস্থার আরও অবনতি হবে।
৩ নম্বর চিনাডুলী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুস সালাম একেকজনকে ১০ কেজি করে চাল ত্রাণ হিসেবে দিলেন। একজন নারী মাথায় করে চাল নিতে নিতে গজগজ করছিলেন, ‘চেয়ারম্যান চাউল দিল, কিন্তু আমাগোর চুলা পানির তলায়। এই চাউল এখন চিবাইয়্যা খাওন ছাড়া তো আর গতি নাই।’