কুরিয়ারে বিয়ের নিমন্ত্রণপত্র পাঠিয়ে একটি ফোন করে অতিথিকে আসতে বলাটা এখন প্রায় রেওয়াজই হয়ে গেছে। তবে কেউ কেউ সৌজন্যবশত কার্ডের ভেতরে, ‘পত্র দ্বারা নিমন্ত্রণে ত্রুটি মার্জনীয়’ লেখা ছোট্ট চিরকুটও দিয়ে দিচ্ছেন। পয়েন্টে তাঁরা এগিয়ে।

যাঁরা সব দিক সামলে চলতে চান, তাঁরা তিন ধাপে দাওয়াত দেন। ধাপ এক. এক বাক্স মিষ্টিসহ কার্ড নিয়ে উত্তরা থেকে পুরানা পল্টন যান সারা দিনের কর্মসূচি হাতে নিয়ে। ‘ভাইজান, আপনাকে কিন্তু আগে আগে আসতে হবে, আপনি বর নামাবেন’ অথবা ‘দুলাভাই, খাবার দায়িত্বে কিন্তু আপনি, আপনার তো সবদিকে চোখ, আপনি ছাড়া কে সামলাবে?’ কিংবা ‘মেজ চাচি, আপনাদের বউমা তো বাতের ব্যথায় কাহিল, মেয়ের দাদি আসবেন, উনি আবার দীর্ঘদিন কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। তাঁর দেখভাল কিন্তু আপনার ওপর…(বলা বাহুল্য, এই সংখ্যা হাতে গোনা। নয়তো এই যানজট, প্রকল্পজট, অধিকার আদায়, নিয়ম না মানা ফ্রি স্টাইল শহরে সবার বাড়ি যেতে হলে বিয়ে নয়, বিবাহবার্ষিকীর তারিখ চলে আসবে)।

ধাপ দুই. কুরিয়ারে দাওয়াতপত্র পাঠিয়ে দেওয়া, অতঃপর ফোন।

ধাপ তিন. ই-দাওয়াত দেওয়া। কার্ড স্ক্যান করে ই-মেইল, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জারে দাওয়াত দেওয়া। এই ধাপে এমন মানুষদের পেয়ে যেতে পারেন, যাঁরা আপনার সশরীর না আসার অজুহাত শুনে উল্টো আপনাকে বলবেন, ‘আরে না না, এই যুগে কেউ বাড়িতে এসে দাওয়াত দেয় নাকি? ঠিক চলে আসব।’ (তবে তাঁদের উৎসাহে উৎসাহিত হয়ে দয়া করে ধাপ এক গ্রুপকে ই-দাওয়াত দিয়েছেন তো ধরা। তাঁরা বলবেন ই-দাওয়াত আবার কী দাওয়াত?)

সে অনেক বছর আগের কথা, যখন প্রত্যেকের বাড়িতে গিয়ে বিয়ের দাওয়াত দেওয়া হতো, তবু কি গোস্বা কম হয়েছে? ছেলের বউভাতে দাওয়াত দিয়েছেন কিন্তু বরযাত্রায় নয় কেন? কে কাকে বোঝাবে বরযাত্রীর নির্দিষ্ট সংখ্যা মেয়ের বাড়ি থেকে বলে দেওয়া। আয়োজনের পরিধি বুঝে তো চলতে হবে! সবাইকে সব অনুষ্ঠানে ডাকতে কি পারা যায়? তবে এই গোস্বা-ব্যাধি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মেও ছড়িয়ে যায়। ফেসবুকে দেখলেন আপনার সহকর্মীর গায়েহলুদে অফিসের কেউ কেউ গানের তালে, আনন্দে নাচছে, আপনি বিয়ে, বউভাতের অনুষ্ঠানের দাওয়াত পেয়েছেন কিন্তু হলুদে নয়। অমনি গাল কিন্তু ফুলে যায়। আবার নাগরিক কপটতায় তা বলতেও পারেন না। হয়তো কাজের ব্যস্ততায় আপনি হলুদে যেতেও চাইতেন না। কিন্তু দাওয়াত না পাওয়ার অন্তর্জ্বালায় ঠিকই জ্বলবেন! অর্থাৎ যাই কি না যাই, দাওয়াত আমার চাই-ই চাই।

ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি বিয়েতে কোনো না কোনো ঝামেলা, মন খারাপের ঘটনা ঘটবেই। কেউ না কেউ বলবেই, ‘আমাকে ঠিকমতো দাওয়াত দেওয়া হয়নি।’ ঢাকার আত্মীয়দের সামাল দিতে পারলেও ঢাকার বাইরের আত্মীয়দের দাওয়াত দিয়ে এনে দিন কয়েক আপ্যায়ন করা বড় কঠিন কাজ। খরচ ও ব্যবস্থাপনা উভয় দিকেই। ভুলত্রুটি হতেই পারে। কিন্তু বিয়ের দাওয়াতের ‘ভুল’ মানে গেল গেল, সব গেল। এই রাগ ভাঙাতে নাতির জন্ম পর্যন্ত অপেক্ষা করতেও হয়!

অথচ দুজন মানুষ নতুন জীবন শুরু করছেন, তাঁরা আমাদের কাছের। তাঁরা যাতে ভালো থাকেন, আনন্দে থাকেন, সেই আন্তরিকতা যদি থাকে মনে, তাহলে কেমন দাওয়াত পেলাম, তাতে কী-বা আসে যায়? শুভকামনা নিয়ে শুভ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়াই বড় কথা। আর করোনা-পরবতী যুগে এ কথা সবাই শিখেছি—দূরে থেকেও কাছে থাকা যায়!

শেষ করি একটি বাস্তব গল্প দিয়ে। বোনের বিয়েতে অফিসের সবাইকে দাওয়াত করেছেন ভদ্রলোক। সবাই মিলে বিশাল এক উপহারের বাক্স হাতে হই হই করে ঢুকছেন বিয়েবাড়িতে। সবার আগে যিনি ঢুকলেন, তাঁকে দেখেই আয়োজক ভদ্রলোকের মুখ অন্ধকার, জিব কেটে বিব্রত হলেন তিনি। কিন্তু অতিথি মানুষটি হাসতে হাসতে বললেন, ‘কি, আমায় দাওয়াত দিতে ভুলে গিয়েছিলেন? আমি ঠিক সেটা বুঝেছি। আপনার তালিকা থেকে আমি বাদ যেতেই পারি না! পরে আপনারই মন খারাপ হতো। তাই দায়িত্ব নিয়ে চলে এসেছি। ভালো করেছি না?’ আয়োজক ভদ্রলোক বুকে জড়িয়ে ধরলেন অতিথিকে। সবাই হাততালি দিয়ে উঠলেন। এই না বিয়েবাড়ির আনন্দ!

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তো বলেই গেছেন, জীবনটাকে হেসেখেলে হালকা করে নেওয়া চাট্টিখানি কথা নয়…তা ঠিক। তবে দুটো মানুষের নতুন জীবনের শুভকামনায় না হয় একটু চেষ্টা করেই দেখা যাক!

জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন