আমার আপন বাড়ি

অলংকরণ: নিয়াজ চৌধুরী
অলংকরণ: নিয়াজ চৌধুরী

নিজের বাড়ি/দেশ ছেড়ে এসেছি ১২ বছর হতে চলল। দেশ ছেড়ে আসার, আপনজন ফেলে আসার সে কী অবর্ণনীয় কষ্ট! বিমানে অস্ট্রেলিয়া আসতে প্রায় ১৬ ঘণ্টা লাগল। পুরো ১৬ ঘণ্টাই নীরবে কাঁদলাম, অথচ আমি ছিঁচকাঁদুনে মেয়ে ছিলাম না কখনোই। বারবার নিজের ওপর, পাশের মানুষটার ওপর রাগ লাগছিল, কেন বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিলাম...। না হলে তো দেশ, আপনজন আমাকে ছাড়তে হতো না। এখানে এসে বিশাল শূন্যতার মধ্যে পড়লাম। ঘরভর্তি লোকের মধ্য থেকে শূন্য ঘর আমাকে অস্থির করে তুলল। পরিচিত লোক তখন হাতে গোনা। ১০ ডলারে দেশে কথা বলা যায় মাত্র ১০ মিনিট। মায়ের সঙ্গে, বাসার মানুষগুলোর সঙ্গে কথা বলে মন ভরে না। প্রায় দিন কথা শেষ হওয়ার আগেই ফোন কার্ডের ক্রেডিট শেষ হয়ে যায়। মন উদাস করে বসে থাকি, শুধু মনে হয় কবে আমাদের পড়াশোনা শেষ হবে আর দেশে ফেরত যাব। সেটাই তো আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল। কিছুতেই অস্ট্রেলিয়ায় মন বসে না। এত ব্যস্ততা, তবু যেন সময় যায় না। মাঝেমধ্যে একা ঘরে আপন মনে গেয়ে উঠি: ‘কে যাসরে, ভাটি গাং বাইয়া, আমার ভাই ধনরে কইও নাইওর নিত...’।
অস্ট্রেলিয়ায় এসে চারদিকে যা কিছু দেখতাম, সবই অচেনা লাগত। এ দেশের গাছ, পাখি, সূর্যের ওঠানামা—সবই কেমন অচেনা লাগে। মাকে চিঠি লিখলাম। তাতে কষ্টের কথা বললাম। বাদ পড়ল না সূর্য যে উত্তর-পূর্বে হেলে ওঠে আর দক্ষিণ-পশ্চিমে হেলে ডুবে—এসব কথাও। সময়ের স্রোতে আমাদের বেশ কিছু বন্ধু হলো। আমার দুই ভাইও চলে এল একসময়। সময় কিছুটা বদলে গেল। অস্ট্রেলিয়ার বাতাস আর আগের মতো ভারী লাগে না। নিঃশ্বাস নিতে পারি। দেশের আমেজ যেন পেতে শুরু করি।

তার পরও দেশে যতবার যেতাম, ততবারই মনে হতো কেন আমাকে অস্ট্রেলিয়া ফিরতে হবে? কেন আমি দেশে থেকে যেতে পারি না? অনেক কষ্ট নিয়ে ফিরে আসি প্রতিবার। দেশ থেকে এলেই দিন দশেক ঝিম মেরে পড়ে থাকি। কোনো কিছুতে মন বসাতে পারি না। নিজেই অবাক হই, এত বছর চলে গেল, তবু অস্ট্রেলিয়াকে আমি আপন করে নিতে পারলাম না! নিজেকে প্রশ্ন করি, কবে অস্ট্রেলিয়া আমার নিজের বাড়ি হয়ে উঠবে?
...আর এখন সত্যি সত্যি অস্ট্রেলিয়া ছেড়ে সিঙ্গাপুর যাচ্ছি। আমার বোঝায় যে কতখানি ভুল ছিল, তা অনুভব করছি প্রতিটা মুহূর্তে। কোন অগোচরে যে অস্ট্রেলিয়া মনের কোণে জায়গা করে নিয়েছে, তা বুঝতেই পারিনি। এখানকার রাস্তা, বাড়িঘর, গাছ, পাখি, ফুল, সূর্য আর মানুষগুলোকে ছেড়ে যেতে এত কষ্ট হবে, কখনো ভাবিনি।

বাড়ির সংজ্ঞা নাকি এমন যে ‘হোম ইজ দ্য প্লেস, হয়্যার ইফ ইউ ওয়ান্ট টু গো দেয়ার, দে হেভ টু টেক ইউ।’ আবার কবে এখানে ফিরে আসব জানি না, ফিরে এলে কি অস্ট্রেলিয়া আমাকে সাদরে গ্রহণ করে নেবে? আমি কি ফিরে পাব আমার দ্বিতীয় বাড়ি?
আনিলা পারভীন
সিঙ্গাপুর থেকে