ইউরোপের দেশে দেশে নারীর প্রতি সহিংসতা

নারীর প্রতি অনেক সহিংসতার কথাই অনেক ক্ষেত্রে ‘জানা যায় না’ বা কর্তৃপক্ষের দ্বারা ‘তদন্ত’ করা হয় না। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান
নারীর প্রতি অনেক সহিংসতার কথাই অনেক ক্ষেত্রে ‘জানা যায় না’ বা কর্তৃপক্ষের দ্বারা ‘তদন্ত’ করা হয় না। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান

নারীর প্রতি সহিংসতা এবং যৌন নিপীড়নের ঘটনায় ‘উন্নয়নশীল’ ও ‘তৃতীয় বিশ্বের’ দেশগুলোর কথাই ঘুরে-ফিরে বারবার আলোচনায় আসে। তবে, ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’কে সামনে রেখে বুধবার প্রকাশিত এক মানবাধিকার প্রতিবেদনে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে নারীর প্রতি সহিংসতার এক ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। এসব দেশে প্রতি তিনজনে একজন নারী ১৫ বছর বয়স থেকে শুরু করে কোনো না-কোনোভাবে ‘যৌন নিপীড়ন’-এর শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। দ্য গার্ডিয়ান এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত ২৮টি দেশের ৪২ হাজার নারীর সাক্ষাত্কারের ভিত্তিতে ‘ইইউ এজেন্সি ফর ফান্ডামেন্টাল রাইটস’ (এফআরএ) এই মানবাধিকার প্রতিবেদন তৈরি করেছে। সংস্থাটির গবেষকেরা বলছেন, এই মহাদেশে নারীর প্রতি এ ধরনের সহিংসতার কথা অনেক ক্ষেত্রেই ‘জানা যায় না’ বা কর্তৃপক্ষের দ্বারা ‘তদন্ত’ করা হয় না। এ পরিস্থিতিকে ‘বিপুলভাবে বিস্তৃত মানবাধিকার লঙ্ঘন’ হিসেবেও অভিহিত করা হয়েছে প্রতিবেদনটিতে।

ইইউ এজেন্সি ফর ফান্ডামেন্টাল রাইটসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘এসব দেশের অনেক নারীই ১৫ বছর বয়স থেকেই কোনো না-কোনোভাবে শারীরিক বা যৌন নিপীড়নের শিকার হন।’ জরিপের সময় অংশগ্রহণকারীরা জানিয়েছেন, সর্বশেষ বছর খানেকের মধ্যেই অনেকে এমন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। গবেষকেরা বলছেন, বছর খানেকের মধ্যে এমন নিপীড়নের শিকার নারীদের হার জরিপে অংশগ্রহণকারীদের অন্তত ৮ শতাংশ।

এফআরএর পরিচালক মরটেন কায়েরুম বলেন, ‘নারীর প্রতি সহিংসতা, বিশেষত লৈঙ্গিক কারণের সহিংসতায় বৈষম্যমূলক ভাবে নারীরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকেন এবং এই বিপুল মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি ইউরোপীয় ইউনিয়ন কোনোভাবেই এড়িয়ে যেতে পারে না।’

এমন যৌন নিপীড়ন ও সহিংসতা প্রতিরোধে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে কাউন্সিল অব ইউরোপের ‘ইস্তাম্বুল সম্মেলন’-এর ঘোষণায় স্বাক্ষর করে একে আইনি বাধ্যবাধকতায় আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন বহুজাতিক এই মানবাধিকার সংস্থাটির পরিচালক। পাশাপাশি এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগসহ সমাজের বিভিন্ন অংশকে এগিয়ে আসতে হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি। যুগপত্ভাবে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে মরটেন কায়েরুম বলেন, ‘নারীর প্রতি সহিংসতা মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নিয়োগদাতা, স্বাস্থ্যসেবার পেশাজীবী এবং ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী সবার কাছ থেকেই আসতে হবে।’

সামাজিক নিরাপত্তা এবং জীবনমানের প্রশ্নে প্রায়ই প্রশংসিত হয় এমন তিনটি দেশে নারীর প্রতি এমন সহিংসতা অনেক বেশি বলে উঠে এসেছে এই জরিপে। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোরে মধ্যে এই হার সবচেয়ে বেশি ডেনমার্কে, প্রায় ৫২ শতাংশ। এরপর রয়েছে যথাক্রমে ফিনল্যান্ড, ৪৭ শতাংশ এবং সুইডেন ৪৬ শতাংশ।

যুগ্মভাবে এ তালিকার শীর্ষ পঞ্চমে আছে যুক্তরাজ্য। দেশটিতে নারীর প্রতি এমন সহিংসতার হার ৪৪ শতাংশ। আর এ তালিকায় দেখা গেছে নারীর প্রতি সবচেয়ে কম সহিংসতা ঘটছে পোল্যান্ডে, ১৯ শতাংশ।

বুধবার বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে প্রকাশ করা এই মানবাধিকার প্রতিবেদনে গুরুত্বপূর্ণ আরও যেসব তথ্য উঠে এসেছে সেগুলো হল—

প্রতি ১০ জনে একজন নারী ১৫ বছর বয়স থেকে কোনো না-কোনোভাবে শারীরিক বা যৌন নিপীড়নের শিকার হন। আর প্রতি ২০ জনে একজন ধর্ষিত হন।

প্রতি ১০ জনে একজন নারীর পিছু ধাওয়া করে তাঁকে উত্ত্যক্ত করেন সাবেক স্বামী বা প্রেমিক।

বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বর্তমান বা সাবেক সঙ্গীর দ্বারা এমন সহিংসতার ঘটনার শিকরা হন নারীরা। আর সম্পর্ক থাকাকালেই নিপীড়নের শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছেন ২২ শতাংশ নারী।

জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৩১ শতাংশ জানিয়েছেন, সঙ্গীর দ্বারা ধর্ষিত হয়েছেন তাঁরা।

মাত্র ১৪ শতাংশ নারী সঙ্গীর দ্বারা ভয়াবহ নিপীড়নের কথা পুলিশকে জানিয়েছেন। আর মাত্র ১৩ শতাংশ নারী সঙ্গী নন এমন কারও দ্বারা গুরুতর নিপীড়নের বিষয়টি পুলিশকে জানিয়েছেন।

প্রতি ১০ জনে একজন নারী ১৫ বছর বয়স হওয়ার আগেই কোনো প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের দ্বারা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছেন।

যুক্তরাজ্য ভিত্তিক সংগঠন ‘অ্যান্ড ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইমেন’-এর পরিচালক হলি ডাস্টিন বলেছেন, এই প্রতিবেদনে ‘ইস্তাম্বুল সম্মেলন’কে যুক্তরাজ্যের আইনি বাধ্যবাধকতা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা ফুটে উঠেছে। মানবাধিকার প্রতিবেদনটির গবেষকেরা বলছেন, অল্প বয়সী নারীদের সুরক্ষায় বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে এবং নারীর প্রতি সহিংসতার অবসানে পুরুষদের ইতিবাচকভাবে আরও বেশি সম্পৃক্ত করার মতো কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।