ই-কমার্স যুগে বাংলাদেশ

প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ নানা কাজকে সহজ এবং আরও কার্যকর করে তুলেছে। আর ইন্টারনেট তো গোটা বিশ্বকেই বেঁধে ফেলেছে বিনি সুতার এক বাঁধনে। অনলাইনে কেনাকাটা আর অর্থ লেনদেনের ব্যাপারটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জনপ্রিয় এবং অনেক দিন ধরেই চলছে। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি দেশেই প্রয়োজন অনলাইন লেনদেনের জন্য দরকারি অনুমোদন ও প্রযুক্তিগত কাঠামো। প্রযুক্তিগত কাঠামো পরিচালনার জন্য দরকারি দক্ষতা বা এ সংক্রান্ত জ্ঞান থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে অনুমোদন ছিল না দেশে। ফলে বাংলাদেশে সত্যিকারের ই-কমার্স চালু হয়নি। তথ্যপ্রযুক্তিসহ সব খাতেরই দীর্ঘদিনের দাবি ই-কমার্সের দরকারি অনুমোদন ২ নভেম্বর দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে বাংলাদেশে ইলেকট্রনিক বাণিজ্য বা ই-কমার্স যুগের সূচনা হলো। এখন শুধু ব্যাংকগুলো আর বিভিন্ন সেবা বা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো মিলে অনলাইনে কেনাকাটা ও বিল পরিশোধের সুবিধা চালু করার অপেক্ষা।সম্ভব হবে অনেক কিছুঅনলাইন লেনদেনের এ অনুমোদনের ফলে খুব সহজে একজন ক্রেতা যেমন দরকারি পণ্যটি পছন্দ করতে পারবেন, তেমনি এর মূল্যটুকুও পরিশোধ করতে পারবেন। ফলে কেনাকাটার কাজটা হয়ে যাবে মাউসের কয়েক ক্লিকেই।এ ছাড়া একজন গ্রাহক নিজের ব্যাংক হিসাব থেকে একই ব্যাংকের অন্য হিসাবে অনলাইনে টাকা স্থানান্তর করতে পারবেন। বিভিন্ন সেবার বিল অনলাইনেই পরিশোধ করা সম্ভব হবে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সেবা ও পণ্যের মূল্য স্থানীয় মুদ্রায় ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে পরিশোধ করা যাবে। ই-কমার্সের এসব সুবিধা দেওয়ার কথা বলে বাংলাদেশ ব্যাংক ২ নভেম্বর প্রজ্ঞাপন পাঠিয়েছে দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের প্রধানদের কাছে। ক্রেডিট কার্ডে লেনদেনবর্তমানে আমাদের দেশে অনেক জায়গাতেই পণ্য বা সেবার মূল্য ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ড ব্যবহার করে পরিশোধ করা যায়। এ জন্য সেসব প্রতিষ্ঠানে একটি বিশেষ যন্ত্র থাকে। ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড ওই যন্ত্রে প্রবেশ করানো হলে (সোয়াপ) সেটি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত হয়। এরপর ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে কার্ডের হিসাব থেকে টাকা দোকানের বা বিক্রেতার হিসাবে চলে যায়। একইভাবে এ প্রক্রিয়ায় যখন কোনো ওয়েবসাইটে পণ্যের মূল্য পরিশোধ করা হবে, সে ওয়েবসাইটে একটি বিশেষ ওয়েবপেইজ থাকবে। সাধারণত যেসব ব্যাংক এ সেবা দেবে, এটি হবে তাদের সরবরাহ করা এপিআই (অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রাম ইন্টারফেইস) যা অনেকটাই পিওএসের (পয়েন্ট অব সেলস) যন্ত্রের মতোই। এর মাধ্যমে বিক্রেতার ওয়েবসাইটে টাকা গ্রহণের পদ্ধতি সরাসরি ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত থাকবে, বিক্রেতার সার্ভারে নয়। এখানে কার্ড যন্ত্রে প্রবেশ করাতে হবে না, ওয়েবসাইটের নির্দিষ্ট জায়গায় ক্রেতা বা গ্রাহককে ক্রেডিট কার্ডের নম্বর এবং একটি গোপন নম্বর (যা কেবল কার্ডধারী জানেন) লিখে দিতে হবে। এতে কার্ডের নম্বরটির উল্লেখ থাকবে। এ দুটি তথ্য ব্যাংকের সার্ভারে চলে যাবে এবং এর পরের অংশটুকু এখনকার কার্ড লেনদেনের মতো হবে।পাওয়া যাবে অনেক সুবিধাঅনলাইন লেনদেন অনুমোদন পাওয়ায় নতুন যুগে প্রবেশ করার পাশাপাশি দেশে ই-কমার্স ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলো অনলাইনের মাধ্যমেই লেনদেন করতে পারবে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে কম্পিউটার বা মুঠোফোন থেকে অনলাইনেই ক্রেডিট কার্ড দিয়ে কেনাকাটা এবং বিভিন্ন ধরনের বিল পরিশোধ করা যাবে। পাশাপাশি অনলাইনে বসেই এক হিসাব থেকে অন্য হিসাবে টাকাও স্থানান্তর করা যাবে। শুরুর দিকে শুধু একটি ব্যাংকের হিসাবের মধ্যেই এ লেনদেন করা যাবে। সব ব্যাংকের মধ্যে এ কার্যক্রম বাড়াতে ব্যাংকগুলোর মধ্যে আন্তব্যাংক স্বয়ংক্রিয় লেনদেন ব্যবস্থা (ই-পেমেন্ট গেটওয়ে) চালু করা হলে এক ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকের হিসাবেও টাকা লেনদেন করা যাবে। আগামী বছরের মাঝামাঝি গেটওয়ে চালু করার কাজ সম্পন্ন হতে পারে বলেজানা গেছে। প্রয়োজন নিরাপত্তাঅনলাইন কার্ড বা ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের বেলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিরাপত্তা। কার্ড বা ব্যাংক হিসাবের গোপন সাংকেতিক নম্বর (পাসওয়ার্ড) যাতে চুরি না হয়, সে জন্য ব্যবহারকারীকে সতর্ক থাকতে হবে। একইভাবে যে ওয়েবসাইটে ওই নম্বর দেওয়া হবে সেটি নিরাপদ কি না, তা দেখে নিতে হবে গ্রাহককেই। সাধারণ ওয়েবসাইট http (হাইপার টেক্সট ট্রান্সফার প্রটোকল) দিয়ে চলে। কিন্তু এ ধরনের ওয়েব পেইজগুলো চলবে সিকিউরড এইচটিটিপি (https) দিয়ে। এ সাইটটি নিরাপদ কি না সেটি নির্ধারিত সংস্থা নিশ্চিত করে দেবে। ভেরিসাইন নামের একটি সংস্থা এ ব্যাপারে প্রত্যয়নপত্র দিয়ে থাকে। বর্তমানে দেশে ডিজিটাল স্বাক্ষর কর্তৃপক্ষ গঠিত হয়েছে। ভবিষ্যতে দেশেও একাধিক সংস্থা অনুরূপ ডিজিটাল সনদ প্রদান করবে। নিরাপত্তা-ব্যবস্থা সব সময় নিশ্ছিদ্র রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সতর্কতা গ্রহণ করতে হবে, যার মধ্যে নিয়মিত ট্রানজেকশন যাচাই, হ্যাকিংয়ের প্রচেষ্টা রোধ ইত্যাদি অন্যতম। সতর্ক থাকলে অনলাইনে নিরাপদ থাকা কঠিন নয়।সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতামতবিরাট এক অগ্রগতিজামিলুর রেজা চৌধুরীউপাচার্য, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়অনলাইন লেনদেন অনুমোদনের বিষয়টি বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিরাট এক অগ্রগতি। তবে টাকা লেনদেনের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় একটি ব্যবস্থা (সেন্ট্রাল গেটওয়ে) চালু করা দরকার। উল্লেখযোগ্য এ অগ্রগতি সার্বিকভাবে বিভিন্ন বিষয়কে এগিয়ে নিয়ে যাবে। তবে যেহেতু অনলাইনে টাকা-পয়সার লেনদেন হবে, তাই নিরাপত্তার বিষয়টিতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। অনলাইন লেনদেনের শুরুর ফলে সাইবার অপরাধীদের আনাগোনাও বাড়তে পারে। এ সংক্রান্ত আইনের দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।সাধারণ মানুষ বেশি সুবিধা পাবেআবুল কাশেম মো. শিরিনউপব্যবস্থাপনা পরিচালক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক লিমিটেড এ অনুমোদনের ফলে ব্যাংকিং খাতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বেড়ে যাবে অনেকখানি। পাশাপাশি সাধারণ মানুষ আরও বেশি সুবিধা পাবে। শুরুর দিকে এটিএম কার্ডের মাধ্যমে, ইন্টারনেটের মাধ্যমে লেনদেন এবং ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার—এসব সুবিধা গ্রাহকদের দেওয়া হবে। তবে শুরুতে লেনদেনের ক্ষেত্রে একটি পরিমাণ (অর্থ) নির্ধারণ করে দেওয়া হবে, যার চেয়ে বেশি অনলাইনে লেনদেন করা যাবে না। ই-কমার্স দ্রুত এগিয়ে যাবে মোস্তাফা জব্বারসভাপতি, বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি অনলাইন লেনদেনের অনুমোদনের ব্যাপারটি বড় একটি মাইলফলক। তথ্যপ্রযুক্তি খাতের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল এটি। আগে বিভিন্ন ধরনের কার্ড ব্যবহার করা গেলেও অনলাইন লেনদেনের ব্যাপারটি অনুমোদন পায়নি। অবশেষে বহু কাঙ্ক্ষিত বিষয়টি অনুমোদন পেল। ফলে দেশে ই-কমার্সের ব্যাপারটি এগিয়ে যাবে খুব দ্রুত।ইন্টারনেট কার্যক্রম এগিয়ে যাবেআহমেদ হাসানপ্রধান নির্বাহী, রায়ানস আইটি লিমিটেডঅনলাইন লেনদেন অনুমোদনের ব্যাপারটি দারুণ সুখবর। কিছুটা দেরি হলেও এর শুরু হয়েছে। ফলে ই-কমার্সের অগ্রগতি খুব দ্রুত এগিয়ে যেতে পারবে। এখন যদিও গেটওয়ে লাগবে, তবে সেটা বড় কোনো সমস্যা নয়। সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে, সাধারণ মানুষ খুব সহজে এ সুবিধা ভোগ করতে পারবে। তবে এখন সাধারণ মানুষদের এ সুবিধা দিতে যাঁরা ই-কমার্স নিয়ে কাজ করছেন, তাঁদের এগিয়ে আসতে হবে। সাধারণ মানুষের কাছে সহজে সেবা পৌঁছাতে আগাম প্রস্তুতি থাকতে হবে। এখনই তাঁদের গুরুত্বসহকারে এগিয়ে আসা উচিত। এ অনুমোদন ইন্টারনেটের বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রমকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।আউটসোর্সিংয়ের ক্ষেত্রে বড় উপকার হলোফারহানা এ রহমানকোষাধ্যক্ষ, বেসিসদেরিতে হলেও অনলাইন লেনদেন অনুমোদন পেল। ই-কমার্স বিশেষ করে ইন্টারনেটভিত্তিক কাজের জন্য এ অনুমোদনটা প্রয়োজন ছিল। দেশের সব পর্যায়ের মানুষ নানাভাবে এর সুবিধা পাবে। বাংলাদেশে আউটসোর্সিং কাজের ক্ষেত্রে অনেক বড় উপকার হলো। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে এ ধরনের কাজের ক্ষেত্রে অনলাইন লেনদেন সবচেয়ে বেশি জরুরি। এ সুবিধাটি এখন যত দ্রুত সম্ভব চালু করা উচিত। তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ভালো হলোবায়েজিদ গনীপ্রধান কারিগরি কর্মকর্তা, এসএসএলইআমরা বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তি কাজের সঙ্গে ই-কমার্স সাইট নিয়েও কাজ করছি। অনলাইনে পরিশোধের সেবা এত দিন শুধু দেশের বাইরে প্রবাসীদের দেওয়া যেত।এখন দেশের মধ্যেও দেওয়া যাবে।এ অনুমোদনের ফলে ই-কমার্স ব্যবস্থার যেমন উন্নতি ঘটবে, তেমনি এ খাতের ব্যবসার প্রসার ঘটবে। পাশাপাশি তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্যও এ অনুমোদন বিশেষ ভূমিকা রাখবে।