ঈদের দিনে সবাই মিলে

সেই ছোটবেলায় ঈদ মানে ছিল অফুরন্ত আনন্দ। ঢাকার আজিমপুর

কলোনিতে কেটেছে সেই দিনগুলো। ঈদের আগে নতুন জামা-জুতা লুকিয়ে রাখা, চাঁদরাতে হাত ভরে মেহেদি দেওয়া—মজাটাই যেন আলাদা। আর ঈদের দিন ভোরে উঠে তাড়াতাড়ি গোসল সেরে নতুন জামা পরে সেজেগুজে মুরব্বিদের সালাম করে পাওয়া ঈদির চকচকে নোটগুলো ছোট্ট কাপড়ের বটুয়ায় সযত্নে গুছিয়ে রাখা, তারপর বন্ধুবান্ধব নিয়ে পাড়া বেড়ানো, হইহই শেষে বাড়ি ফিরে টিভি খুলে মহানন্দে ঈদের অনুষ্ঠানমালা দেখা—এসব আনন্দ-উচ্ছ্বাসের ভিড়ে কোনো দিন খেয়ালই করিনি বাড়িতে মা ঈদের দিন কী করেন! এখন সেটা হাড়ে হাড়ে বুঝি। ঢাকায় নিজের বাড়িতে বসে কথাগুলো বললেন রেহানা বেগম।
তাঁর কাছে এখন ঈদ মানে সাতসকালে উঠেই রান্নাবান্নার আয়োজন, ঘর গোছানো, দিনভর মেহমানদের আপ্যায়ন, থালাবাসন ধোয়া আরও কত কী! এখন ঈদের নতুন শাড়ি ঈদের দিন পরাই হয় না। সন্ধ্যাবেলা বাড়ির সবাই ঘোরাঘুরি শেষে যখন টিভি দেখতে বসে, তখনো তিনি রান্নাঘর পরিষ্কার করছেন বা সবকিছু গুছিয়ে তুলে রাখছেন। একটু হেসে বলেন রেহানা বেগম, ‘বিয়ের পর থেকে ২০ বছর ধরে ঈদ মানে শুধু কাজ আর কাজ। আর কিছু না।’
সারা বছর যে যার মতো ব্যস্ত থাকলেও এই দিনটিতে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব প্রতিবেশী সবাই একে অপরের বাড়ি যায়, কুশল বিনিময় করে, খাওয়াদাওয়া করে। উৎসব ও সামাজিকতা পালনের সমস্ত ধাক্কা গিয়ে পড়ে গৃহকর্ত্রীর ওপর। সবাই যখন নতুন জামা, ঈদি হিসেবে পাওয়া বকশিশ, বেড়ানো বা খাওয়াদাওয়া নিয়ে ব্যস্ত, তখন মা বা বউ রান্নাঘরেই দিনমান ব্যস্ত থাকেন।
ঈদের দিনে সবাই যেন খুশি থাকে, খাবার যেন ভালো হয়, কোথাও যেন কোনো ত্রুটি না থাকে সেদিকে তাঁদের প্রখর নজর। এসব করতে করতে ঈদের দিনটা কীভাবে পার হয়ে যায়, টেরই পান না। কিন্তু তাঁদেরও তো ঈদ আছে। হয়তো ইচ্ছে করে নতুন কাপড় পরে একটু সেজেগুজে বাইরে যেতে। সব সময় বাড়ির মেয়েরাই কাজ করবে আর পুরুষ সদস্যরা আরাম করবে—এটা ঠিক নয়। যদি মা, স্ত্রী ও বোনকে বাড়ির পুরুষ সদস্যরা একটু সাহায্য করেন, তাহলে দেখবেন তাঁদের ওপর চাপ একটু কমে। আর সবাই মিলে কাজ করার মধ্যেও তো একধরনের আনন্দ আছে। পারিবারিক বন্ধন মজবুত হয় এতে। মাকে রান্নায়, স্ত্রীকে খাবার পরিবেশনে, বোনকে ঘর গোছাতে সাহায্য করা যেতেই পারে। এর জন্য প্রয়োজন খানিকটা ইচ্ছা।
রান্নাবিদ সিতারা ফিরদৌস বলেন, ‘আজকাল অনেক বাড়িতে এমনটা দেখা যাচ্ছে। একটা কি দুটো পদ, যেমন সালাদ, লাচ্ছি স্বামী বা ছেলেমেয়েরা করে ফেলেন। আপ্যায়নের সময় টেবিল সাজানো বা পরিবেশনেও অংশ নেন। মেহমান চলে গেলে ধোয়ামোছা বা গোছানোর কাজে সাহায্য করলেও অনেকখানি প্রশান্তি মিলবে মা ও বউয়ের। আজকাল তো হাতের কাছে আছে প্রযুক্তি, যা পরিবারের যে কেউ ব্যবহার করতে পারেন। ব্লেন্ডারে মসলা করা বা ওভেনে কাবাব গ্রিল করতে দেওয়াটা কোনো ব্যাপার নয়। ঈদের দিনে সুযোগ পেলেই মাকে বা স্ত্রীকে এই সাহায্য করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে পরিবারে।’

এখানে অবশ্য গৃহিণীর মানসিকতারও পরিবর্তন আনতে হবে। সব কাজের দায়িত্ব নিজের ওপর না নিয়ে পরিবারের সবার মধ্যে কাজ ভাগ করে দিতে পারেন। কাউকে দিলেন ঘর গোছানোর দায়িত্ব, কেউ নিলেন তৈজসপত্র কেনার দায়িত্ব কেউবা পরিবেশনের। আর ঈদের দিনে বাবা যদি মায়ের সঙ্গে রান্নাঘরে সাহায্য করেন, তাহলে সন্তানেরাও অন্য রকম আনন্দ পাবে। মুখ ফুটে কিছু না বললেও আপনার স্ত্রীর কাছে এই সামান্য সাহায্যটুকুই ঈদের আনন্দে বাড়তি মাত্রা যোগ করবে। আপনারা যে মা, বোন বা স্ত্রীর কষ্টের কথা ভেবেছেন, এতেই তাঁরা খুশি হবেন।
এ প্রসঙ্গে গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ফিরোজা সুলতানা বলেন, ‘ঈদের আনন্দটা একেকজনের কাছে একেক রকম। ছোট ছেলেমেয়েরা সেজেগুজে ঘুরে বেড়াতে যেমন আনন্দ পায়, মা হয়তো সেই আনন্দ পান নানান মুখরোচক রান্না ও অতিথি আপ্যায়নে। তবে একটু গুছিয়ে ভেবে নিয়ে কয়েক দিনের ধারাবাহিক প্রস্তুতিতে সবাই মিলে আয়োজনটা করতে পারলে ঈদের দিনে কাজের চাপ কমবে। প্রয়োজনে বিকেলে বা পরদিন সবাই মিলে আত্মীয়স্বজনের বাড়ি বেড়াতে যাওয়া যায়। সময়ের ও শ্রমের যথাযথ ব্যবস্থাপনা অনেকটাই ঝামেলামুক্ত করতে পারে এই দিনটাকে।’
ঈদের এই অপার আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে এবারের ঈদ থেকেই না হয় ঈদের কাজ ও দায়িত্বগুলোও ভাগাভাগি করে নিই।
কৃতজ্ঞতা: কাজী রেহা কবীর