একটুখানি ছোঁয়া

ও আমার মন ছুঁয়েছে৷ ভালো লাগার কথা বলতে গিয়ে আমরা কমবেশি ‘মন ছোঁয়া’ শব্দ ব্যবহার করি৷ আসলেই কি মন ছুঁয়ে দেখা যায়! সে প্রসঙ্গে আলোচনা করতে হলে বিস্তর জল ঘাটতে হবে৷ তবে ছোঁয়া নিয়ে আলোচনা করা যেতেই পারে৷ স্বাস্থ্যবিষয়ক লেখা প্রকাশের ওয়েবসাইট হেলথ গাইডেন্স (www.healthguidance.org) এক প্রতিবেদনে বলছে, মানুষের স্পর্শ একটি শক্তিশালী নিদান। যা কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ করেও কেনা যায় না৷
অথচ এই অমূল্য ‘স্পর্শ’ দিয়েই আমরা রাঙিয়ে তুলতে পারি আমাদের প্রিয়জনকে৷ পরিবার বা বন্ধুবান্ধবকে৷ একটা ছোট্ট ঘটনা শোনালেন তরুণ শিক্ষার্থী ফয়সাল আহমেদ (ছদ্মনাম)৷ পড়াশোনার জন্য ঢাকায় থাকেন তিনি৷ গত বছর শীতের এক বিকেলে মায়ের সঙ্গে কথা বলছিলেন মুঠোফোনে৷ একপর্যায়ে পারিবারিক একটা বিষয় নিয়ে অভিমান করে ফয়সাল মাকে বলেছিলেন ‘আমি আর তোমার সঙ্গে কথা বলব না৷ তুমি ফোন রাখো৷’ ব্যস, এই একটা কথার পরেই মা ফোন রেখে দেন৷ তবে ফোন রাখার পর ফয়সালের অস্থিরতা বেড়ে যায়৷ মায়ের সঙ্গে তো কোনোদিন এমন করে কথা বলেননি৷ সঙ্গে সঙ্গে ফোন দেন আবার৷ মায়ের ফোন বাজে, কেউ ধরে না। আবার ফোন...আধা ঘণ্টা পরে ফোনটা তুলল ফয়সালের ছোট বোন৷ হ্যালো বলেই চুপ হয়ে গেলেন ফয়সাল৷ কারণ, বোনের কথা ছাপিয়ে ততক্ষণে মায়ের উচ্চশব্দের কান্না স্পষ্ট এপারে ছেলের কানে৷ প্রতিবেশীদের ভিড় জমে গেছে মাকে সান্ত্বনা দিতে৷ কিছুতেই মা শান্ত হচ্ছেন না৷ অগত্যা আগে থেকে না জানিয়ে রাতেই ব্যাগ গুছিয়ে বাড়ির পথে রওনা দিলেন ফয়সাল৷

ভোরের আলো তখনো ফোটেনি৷ ফয়সাল বলেন, ‘শীতে হাত-পা কাঁপছিল৷ তার চেয়ে হৃদয় কাঁদছে বেশি৷ গতকাল রাতে মা কিচ্ছু খাননি বলে জানিয়েছে বোন৷ বাস থেকে নেমেই বাড়িতে এসে সোজা মায়ের দরজায়৷ বাইরে থেকে বার কয়েক কড়া নাড়লাম৷ কিছুক্ষণ পর ঘুম চোখে এসে বোন দরজা খুলে দিল৷ তার হাতে ব্যাগ দিয়েই সোজা মায়ের লেপের নিচে চলে গেলাম৷ অন্যদিকে ঘুরে থাকা মাকে দুই হাতে জড়িয়ে নিয়ে ডাক দিতেই হাউমাউ করে কেঁদে ফেললেন মা৷ আমিও৷’ এরপর কোনো কথা বলার দরকার হলো না৷ ‘সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি, কয়েক পদের ছোট মাছের সঙ্গে গরম ভাত আর আমার পছন্দের কড়া মিষ্টির পায়েস তৈরি টেবিলে৷ কেউ না বললেও জানি এসব মা-ই রান্না করেছেন৷’ বলতে গিয়ে গলা ধরে এল ফয়সালের৷ তাঁর কথার সূত্র ধরেই জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের মনোরোগ বিভাগের অধ্যাপক তাজুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিটি পরিবারেই এমন ছোটবড় আবেগ-অনুভূতির গল্প থাকে৷ কথা বলে মিটমাট করার চেয়ে এই সময়ে কাছের মানুষের একটু স্পর্শ টনিক হিসেবে কাজ করে৷ দৈনন্দিন জীবনে এই স্পর্শের গুরুত্ব অনেক বেশি৷ কারও মনে যখন দুঃখ এসে ভর করে, তখন সে নিজেকে একা মনে করে৷ কাছের কেউ তখন তার পাশে এসে দাঁড়ালে সে নির্ভরতার একটা জায়গা খুঁজে পায়৷ যেটা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলে বোঝানোর চেয়েও বেশি কার্যকর৷’
স্পর্শ করার বিষয়টা শিশুদের বেড়ে ওঠার ওপরে বিশেষভাবে প্রভাব ফেলে৷ তার আচরণে এর প্রভাব দেখা যায়৷ ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন শিশুর ওপর একটি সমীক্ষা চালিয়েছে ফ্লোরিডার মিয়ামি বিশ্ববিদ্যালয়ের টাচ রিসার্চ ইনস্টিটিউট ফলাফলে দেখা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ফ্রান্সের শিশুরা বেশি কোমলমতি হয়৷ কারণ, তারা মা-বাবা বা আপনজনের স্পর্শ বেশি পায়৷
পরিবারের ভেতরেও সব সময় সবাই সবার কাছাকাছি যেতে পারে না৷ সন্তানেরা হয়তো মা-বাবার ভেতর থেকে যেকোনো একজনকে আগে মনের কথাটা খুলে বলছে৷ সন্তানের মন খারাপ হলে তখন সেই মানুষটার হাতের স্পর্শই তার অনেক কষ্ট ভুলিয়ে দিতে পারে৷ হয়তো মাথায় একটু হাত রাখা, বা পিঠে হাত দিয়ে ‘কী হয়েছে রে বাবা’ টাইপের একটা প্রশ্নই ভালো করে দিতে পারে সন্তানকে৷ এমনটাই মনে করেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা৷
সমাজবিজ্ঞানী মাহবুবা নাসরীন বলেন, ‘প্রতিদিন যে বাবাকে আপনি দেখে অভ্যস্ত, আজ একটু অন্য রকম মনে হচ্ছে? সাহস করে চলে যান তাঁর কাছে৷ হাতটা ধরুন বা শরীর স্পর্শ করে জিজ্ঞাসা করুন—বাবা কোনো সমস্যা? দেখবেন বাবা শক্তি ফিরে পাবে৷ পারিবারিক এই বন্ধুত্বের জায়গাটা গড়ে তুলতে পারলে পরিবারে শান্তি ফিরে আসবে৷ যেসব পরিবারের সবাই নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, একটা বেলা সবার সঙ্গে সময় কাটালেও সবার মধ্যে বোঝাপড়া তৈরি হবে৷’ পরিবারের বাইরে খুব কাছের মানুষ, বন্ধুর ছোঁয়াও মন ভালো করে দেয়৷ তাই কাউকে সুখী করতে চাইলে সোনার কাঠির ছোঁয়া নয়, আপনার হাতের একটু স্পর্শই যথেষ্ট৷ কোনো কথা না বলেও যে অনেক কথা বলে ফেলা যায় একটু ছুঁয়ে দিলেই৷ এই স্পর্শ যে আপনার মনকেও ছুঁয়ে যাবে সেটা আর বলবার কী আছে!