এখনকার জ্বর

জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। মডেল: অর্পিতা, ছবি: অধুনা
জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। মডেল: অর্পিতা, ছবি: অধুনা

চলছে বর্ষাকাল। এ সময়ে চারদিকে বৃষ্টির পানি জমে থাকে। এই পানিতে মশার প্রজনন ও বংশবিস্তার বেশি ঘটে। অনেক এলাকায় বিশুদ্ধ পানির অভাবও দেখা দেয়। তাই এ সময় মশা দ্বারা সংক্রমিত ও পানিবাহিত কারণে জ্বরের আশঙ্কা বেড়ে যায়। এই সময়ে বিভিন্ন ধরনের জ্বর হতে পারে। তবে সাধারণত ডেঙ্গু, টাইফয়েড, সাধারণ ভাইরাল জ্বর, চিকুনগুনিয়া, ফুসফুস ও প্রস্রাবের সংক্রমণ ইত্যাদি নানা কারণে জ্বর হতে পারে।
এই বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের ডিন অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, অতিবৃষ্টির কারণে এ বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি। তাই বলে যে অন্য কারণে জ্বর হচ্ছে না তা নয়। জ্বর হলেই আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। অধিকাংশ ভাইরাল জ্বর পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যে ভালো হয়ে যায়।

ডেঙ্গু জ্বর নয় তো?
এডিশ মশা কামড়ে ডেঙ্গু ভাইরাস দেহে ঢুকে পড়লে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়। অন্যান্য ভাইরাল রোগের মতো এরও কোনো প্রতিষেধক নেই, টিকাও নেই। হঠাৎ করে জ্বর। কপালে, গায়ে, চোখে ব্যথা। চোখ নাড়ালে, এদিক-ওদিক তাকালেও ব্যথা। দাঁতের মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া। পায়খানার সঙ্গে রক্ত পড়া। কালো কিংবা লালচে রঙের পায়খানা, এমনকি প্রস্রাবের সঙ্গেও অনেক সময় রক্ত বের হতে পারে।

লক্ষণ অনুযায়ী চিকিৎসা করতে হয়। অন্য ভাইরাল ফিভারের মতো এটিও এমনিতেই সেরে যায় সাত দিনের মধ্যে। যদি সময়মতো ডেঙ্গুর যথাযথ চিকিৎসা করানো না যায়, তবে রোগীর স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে। দেখা দেয় ডেঙ্গু হেমারেজিক ফিভার বা রক্তক্ষরণকারী ডেঙ্গু জ্বর।

কখন মশা কামড়ায়?
এডিশ মশা ভোরে সূর্যোদয়ের আধঘণ্টার মধ্যে এবং সন্ধ্যায় সূর্যাস্তের আধঘণ্টা আগে কামড়াতে পছন্দ করে। তাই এই দুই সময়ে মশার কামড় থেকে সাবধান থাকতে হবে।

ডেঙ্গু প্রতিরোধ
প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে নিজের ঘর, বারান্দা বা আঙিনায় মশার উৎস ধ্বংস করুন। ফুলের টব, পুরোনো ক্যান বা পাত্র, গামলা বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র থেকে বের হওয়া পানি জমে আছে আছে কিনা তা দেখতে হবে। গাছের কোটরে জমা পানি পরিস্কার করতে হবে, ছোট আবদ্ধ জায়গায় যাতে বৃষ্টির জল জমে না থাকে, এসব দিকে খেয়াল রাখতে হবে।

ডেঙ্গু চিকিৎসা
বেশির ভাগ ডেঙ্গু জ্বর সাত দিনের মধ্যে সেরে যায় এবং অধিকাংশই ভয়াবহ নয়। প্রয়োজন যথেষ্ট পরিমাণে বিশুদ্ধ জল খাওয়া, বিশ্রাম ও তরল খাবার, স্যালাইন খেতে হবে। তবে ব্যথানাশক ওষুধ হিসেবে অ্যাসপিরিন জাতীয় ওষুধ মোটেই নয়। এতে রক্তক্ষরণ বেড়ে যেতে পারে। তবে জ্বরের সঙ্গে রক্তক্ষরণের লক্ষণ দেখামাত্র বা রক্তে অনুচক্রিকার (প্লাটিলেট) সংখ্যা এক লাখ বা তার চেয়ে কমে গেলে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হতে পারে।

টাইফয়েড নয় তো?
সাধারণত দূষিত খাবার ও জলের মাধ্যমে এই রোগ ছড়ায়। এই রোগ হলে তীব্র জ্বর, মাথাব্যথা, পেটব্যথা, পায়খানার সমস্যা, ডায়রিয়া, চামড়ায় লালচে দানা বা র্যাশ দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া শরীরের ওজন কমতে পারে, পেট ফোলা, পেট ফাঁপতে পারে। টাইফয়েড কিংবা সাধারণ জ্বরের সঙ্গে ডেঙ্গু জ্বরের মূল পার্থক্য হলো ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত ব্যক্তি প্রথম দিন থেকেই প্রচণ্ড জ্বরে অর্থাৎ ১০২ থেকে ১০৩ ডিগ্রি জ্বরে ভুগে থাকেন। টাইফয়েডে জ্বর আস্তে আস্তে বৃদ্ধি পায়।

ভাইরাল জ্বর নয় তো?
ভাইরাল ফিভার বা ভাইরাস জ্বর বছরের যেকোনো সময়ে হতে পারে। ভাইরাল ফিভার ভাইরাস জীবাণুর সংক্রমণের কারণে হয়ে থাকে। জ্বরের শুরুতে এর প্রকৃতি বোঝা না গেলেও পরীক্ষার মাধ্যমে ভাইরাল ফিভার চিহ্নিত করা সম্ভব। সাধারণ লক্ষণ হলো হাঁচি, কাশি, নাক দিয়ে জল পড়া, চোখ লাল হয়ে যাওয়া, সারা শরীরে ও হাতে-পায়ে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করা, প্রচণ্ড মাথাব্যথা করা, খাবারে অরুচি, বমি বমি ভাব এবং বমি হওয়া, শরীরের চামড়ায় বা ত্বকে র্যাশ দেখা দেওয়া ইত্যাদি। একই সঙ্গে শরীরের তাপমাত্রাও বাড়তে থাকে। অতিরিক্ত জ্বরের কারণে কখনো কখনো খিঁচুনি হতে পারে। ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে এমনিতেই ভালো হয়ে যায়।

জ্বর হলে করণীয়
এই সময় দ্রুত জ্বর কমাতে সারা শরীর ভিজে গামছা বা তোয়ালে দিয়ে বারবার মুছতে হবে। জ্বর ও শরীরের ব্যথা কমাতে চিকিৎসকের পরামর্শে প্যারাসিটামল ট্যাবলেট খাওয়াতে হবে। জ্বর বেশি মাত্রায় (১০২) হলে মলদ্বারে প্যারাসিটামল সাপোজিটরি ব্যবহার করতে হতে পারে। জ্বর ১০২ থেকে ১০৩ ডিগ্রি চার থেকে পাঁচ দিনের বেশি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। খাওয়ার স্যালাইন, ফলের রস, শরবত ইত্যাদি তরল খাবার বেশি বেশি খেতে হবে এবং অন্যান্য স্বাভাবিক খাবার স্বাভাবিক নিয়মে চলবে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিক কিংবা ব্যথানাশক ওষুধ খাবেন না। ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত ব্যক্তিকে সব সময় মশারির ভেতরে রেখে পরিচর্যা করুন। শিশু ও বৃদ্ধদের ভাইরাস জ্বরে আক্রান্ত রোগী থেকে দূরে রাখুন। ভাইরাস জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

ভুল ধারণা
* জ্বর হলেই অনেক রোগীর গায়ে কাঁথা চাপিয়ে দেওয়া
* শরীরে মোটা কাপড়, কম্বল জড়ানো
* গায়ে তেল মালিশ করা
* প্রকৃতপক্ষে এগুলোর কোনোটাই জ্বর কমানোর পদ্ধতি নয় বা জ্বর কমাতে সাহায্য করে না।
লেখক: চিকিৎসক