বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ভিসার ঝক্কি সেখানে নেই। প্লেনের টিকিট কাটা ও হোটেল বুকিং দেওয়া সারা, সময়মতো রওনা দিলেই হলো। কিন্তু কে জানত করোনাকালে ভ্রমণ সোজা কম্ম না! প্লেন যাত্রায় কেন অবসাদে পেয়ে বসেছিল, সে গল্পই করি:

সকাল সাড়ে নয়টায় প্লেন, সে হিসেবে বিমানবন্দরে পৌঁছাতে হবে। টিকার দুই ডোজের সনদ, করোনা নেগেটিভ সনদ—সবই তৈরি। টিকিট বুকিং সংস্থা গোজায়ান কী এক মেইল পাঠিয়েছিল দুদিন আগে, নানা ব্যস্ততায় সেটা আর দেখা হয়নি। ভোরে রওনা হওয়ার আগে সেই মেইল পড়ে চক্ষু চড়কগাছ। মালদ্বীপ ইমিগ্রেশনের একটি লিংক পাঠিয়েছে তারা। ভিসা না লাগলেও ওই লিংকে গিয়ে ছবিসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এটাচ করে একটি ফরম পূরণ করতে হবে। সেটা করলেই বারকোডসহ একটি স্লিপ মিলবে, তার প্রিন্ট আউট না থাকলে মালেতে যাওয়া তো পরের কথা, ঢাকা বিমানবন্দরই ছাড়া যাবে না।

বিমানবন্দরে রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি, গিয়েই প্লেনে উঠে পড়ব—এই যখন মনের অবস্থা, তখন এমন অনিশ্চয়তায় আমরা একেবারে চুপসে গেলাম। হাতে যা সময় আছে, তার মধ্যে সব করতে পারব তো! যাওয়া না–ও হতে পারে, এমন মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই বিমানবন্দরে রওনা হলাম। ঠিক করলাম গাড়িতে বসেই অনলাইনের ফরম পূরণ করব। গাড়িতে অর্ধেক পারা গেল, বাকিটা সারা হলো বিমানবন্দরে পৌঁছে। ভয়ে আছি, ফরম পূরণ করে সাবমিট করার সঙ্গে সঙ্গে বারকোডসহ রিসিট মিলবে তো? রিসিট মিলল, কিন্তু প্রিন্ট আউট? বিমানবন্দরে সেই সেবাও মিলল। ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল। প্লেনে ওঠার পর একেবারেই গা ছেড়ে দিল।

আমাদের সাত রাতের সফর। প্রথম ছয় দিন মালের বাইরে কোনো দ্বীপে, আর আসার আগে এক রাত মালেতে কাটানোর পরিকল্পনা। প্লেনের টিকিট বুকিং দেওয়ার পর রিসোর্ট-হোটেল খুঁজতে গিয়ে বেশ পেরেশান হতে হয়েছে। ডিসেম্বরের শেষ দিক, সুবিধামতো দামে পছন্দমতো কিছু পাওয়ার জন্য সময়টা মোটেও মোক্ষম না। বিশেষ করে শেষ মুহূর্তে। মালদ্বীপের যেসব ছবি বিভিন্ন সময় দেখেছি, তেমন পছন্দের রিসোর্ট খুঁজতে গিয়ে খুব সুবিধা করা গেল না। রুমও খালি নেই, আর যাও বা দু-একটিতে মিলছিল, ভাড়া আকাশ ছোঁয়া (মানে আমাদের জন্য, বলিউড তারকাদের জন্য নয়)! জানি মালদ্বীপ অনেক দ্বীপ নিয়ে তৈরি একটি দেশ। কিন্তু দেশটি আসলে কেমন সেই ধারণা প্রথম কিছুটা পেলাম রিসোর্ট/হোটেলের রুম বুক করতে গিয়ে। ম্যাপ দেখে বুঝলাম কোথায় প্লেন থেকে নামব। ভারত মহাসাগরে ছোট্ট একটা বিন্দু। ভেলানা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট রাজধানী মালের লাগোয়া হুলহুলে দ্বীপে। মালে আর হুলহুলে এখন সেতু দিয়ে যুক্ত। আমাদের রিসোর্ট মিলল মালে থেকে অনেক দূরের ছোট এক দ্বীপে, বদুফুলহুদুহ। এয়ারপোর্ট থেকে অত দূরে কীভাবে যাব, কিছুই জানি না। রিসোর্টওয়ালাদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, মালদ্বীপ রওনা হওয়ার আগেও তার জবাব মেলেনি। অনিশ্চিত যাত্রা যাকে বলে!

default-image

সাগর ছুঁয়েই রানওয়ে। এমন এয়ারপোর্টে নামার উত্তেজনাই আলাদা। ছোট ছিমছাম বিমানবন্দর। বিদেশিতে (মানে গায়ের রং যাদের সাদা) গিজগিজ করছে বিমানবন্দর। ইমিগ্রেশনে লাইন বড়, কিন্তু ছাড়া পেতে সময় লাগল খুবই কম। অনলাইনে পাওয়া সেই স্লিপ দেখাতেই সিল পড়ল পাসপোর্টে। বিমানবন্দর তাপ নিয়ন্ত্রিত স্থান, বের হতেই গায়ে এসে লাগল গরম বাতাস। কীসের ডিসেম্বর, কোথায় শীত!

বিমানবন্দরের গেটের বাইরেই হোটেল-রিসোর্টের অসংখ্য কাউন্টার। ভাবলাম, আমাদের রিসোর্টের কাউন্টারও নিশ্চয়ই আছে, ওরাই নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করবে। তেমন কিছুই মিলল না। বুঝলাম আমাদের রিসোর্ট সেই মানের নয় যে এখানে কাউন্টার থাকবে। লোকজনকে জিজ্ঞেস করে জানলাম, আমরা যে দ্বীপে যাব, ওই দিকে যাওয়ার স্পিড বোট ছাড়বে বিকেল চারটায়, মানে আরও দুই ঘণ্টা পর। বিমানবন্দর থেকে বের হতেই চমক, রাস্তার দুপাশে বাংলাদেশের পতাকা! মনে পড়ে গেল আমাদের প্রধানমন্ত্রীও তো এখন মালদ্বীপ। রাস্তার ওপারেই সমুদ্র, যাকে বলে নীল আর গভীর সমুদ্র! সেখানেই ঘাট। এই সমুদ্রপথেই শুরু হবে আমাদের যাত্রা।

ভোরে যে অনিশ্চয়তা নিয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিলাম তা যেন কাটছেই না। স্পিডবোটে উঠতেই ভাড়া গুনতে হলো ডলারে। এই সমুদ্রযাত্রার সময় কত তা–ও জানি না। জেটি ছাড়তে না ছাড়তেই গভীর সমুদ্রে চলে এলো আমাদের স্পিডবোট। আমাদের দেশের ছোট স্পিডবোটগুলো যে গতিতে চলে, এগুলোর গতিও তেমনই। ৩০–৩৫ সিটের বোট। স্থানীয় ৪–৫ জন ছাড়া সবই পর্যটক। মাঝসমুদ্রে কড়া রোদে চোখ মেলে কিছু দেখার জো নেই। চোখ বন্ধ করে ভাবা ছাড়া আর কীইবা করার আছে। এ আসলেই ইউনিক এক দেশ! দেশ মানে বারোশ ছোট ছোট প্রবাল দ্বীপ। মহাসাগরে এই দ্বীপগুলো ছড়িয়ে আছে মালার মতো। এর মধ্যে বসবাসযোগ্য মাত্র ২০০টি। মনে তখন নানা প্রশ্ন, এখানে আসার আগে এভাবে কখনো ভাবা হয়নি। উত্তর-মধ্য ভারত মহাসাগরে দূরে দূরে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা ছোট এতগুলো দ্বীপ মিলে এই রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনা কীভাবে চলে? এত বিচ্ছিন্ন দ্বীপের ওপর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কীভাবে কাজ করে? কেন্দ্র মানে তো রাজধানী মালে, সেটাও তো ছোট একটি দ্বীপ। সাত বর্গ কিলোমিটারেরও কম। দেশটিতে তো মূল ভূখণ্ড বলতে কিছু নেই। এভাবে কাটল আড়াই ঘণ্টার পথ। মালে থেকে তখন আমরা অনেক দূরে।

আমরা যখন বদুফুলহুদুহ দ্বীপের কাছাকাছি তখন সূর্য ডুবো ডুবো। নারিকেল গাছ আর সবুজে ছাওয়া দ্বীপটি চোখে পড়ল। ঘাটে অনেক মানুষ। বুঝলাম নির্দিষ্ট সময়ে এখানে মালে থেকে স্পিডবোট আসে। এরই জন্য সবার অপেক্ষা। নেমেই আমাদের রিসোর্টের লোক মিলে গেল। হেঁটেই যেতে হবে। মালামাল নেওয়ার জন্য ইজিবাইকের মতো বাহন। ঘাটের কাছেই উঁচু মিনারের সুন্দর মসজিদটি তখন আলোয় ঝলমল করছে। এর পেছনে, সামান্য হাঁটতেই আমাদের লেগুন ভিউ রিসোর্ট।

সারা দিনের অনিশ্চয়তা আর ঝড়ঝাপটার পর যেখানে এসে পৌঁছালাম, তা সব ভুলিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। ছোট রিসোর্ট। সাকল্যে ১০–১২টি রুম। আসল কথা ঢেউ এসে লাগছে রিসোর্টের বিচে। এমন প্রকৃতিতে সাজসজ্জার বাহুল্য সৌন্দর্য নষ্ট করে। রিসোর্টটি সেই পরিমিতি বজায় রেখেছে। মিনিমালিস্ট যাকে বলে। আগেই চাহিদা দিয়ে রেখেছিলাম, এমন রুম চাই যেখান থেকে সমুদ্র দেখা যায়। তেমনই একটি বাংলো খুলে দেওয়া হলো আমাদের। বেশ বড়সড় রুম, জানালার পর্দা সরালেই সমুদ্র! বেড়াতে গিয়ে অনেকে ছোটাছুটি করতে পছন্দ করেন। এক ট্রিপে কত কী দেখা যায়, সেই চেষ্টা থাকে। আমরা এর উল্টো ধাঁচের মানুষ। অবসর, স্রেফ অবসর কাটানোর জন্যই এখানে আসা। সেই হিসেবে লেগুন ভিউ রিসোর্টের চেয়ে আদর্শ স্থান আর কী হতে পারে!

এমন একটি দ্বীপে কীভাবে ছয় রাত কাটল? সংক্ষেপে রুটিনটি ছিল এ রকম: সকালে ঘুম থেকে উঠে নাশতা করে সৈকতে গিয়ে বসা। মন চাইলে সমুদ্রে নামা, না হলে বই পড়া, অথবা শুধুই বসে থাকা। টলটলে পানির নীল সমুদ্র। এমন জায়গায় আলস্য করে সারা দিন পার করে দেওয়া কোনো ব্যাপার না। চাইলে পানিতে নেমে স্নরকেলিং করা যায়, ডুব দিলেই দেখবেন কত রঙের মাছ আপনার চারপাশে। এর অভিজ্ঞতা ছিল না, স্নরকেলিং নেশা ধরিয়ে দিল, পানি থেকে আর উঠতে ইচ্ছে করে না। দুপুর গড়ালে আমাদের কাজ ছিল দ্বীপে হাঁটতে বের হওয়া। ছোট এই দ্বীপটি ১০–১২ মিনিটেই এ মাথা ও মাথা করা সম্ভব ।

মালদ্বীপের দ্বীপগুলোকে দুই নামে ডাকা হয়, লোকাল আইল্যান্ড আর রিসোর্ট আইল্যান্ড। লোকাল আইল্যান্ডে স্থানীয় জনগণ থাকে, আর রিসোর্ট আইল্যান্ডে শুধুই রিসোর্ট। আমাদেরটা লোকাল আইল্যান্ড। আগে এ ধরনের দ্বীপে হোটেল-রিসোর্ট করার অনুমতি দেওয়া হতো না, এখন দেওয়া হচ্ছে, তবে কিছু বিধিনিষেধ মেনে চলতে হয়। এই দ্বীপে চারটি ছোট রিসোর্ট আছে, আছে একটি ক্যাফে ও দুটি ছোট রেস্তরাঁ। ঘুরতে ঘুরতে কোনো একটিতে বসে যেতাম, দুপুরের খাওয়া হয়ে যেত। লোকাল আইল্যান্ডে মজা হচ্ছে, সেখানকার মানুষের সঙ্গে মিশতে পারা, তাদের সঙ্গে কথা বলা; রিসোর্ট আইল্যান্ডে যে সুযোগ মিলবে না। দ্বীপে ঘুরে বেড়াতে গিয়ে আমাদের তো বন্ধুত্বই হয়ে গেল নায়া ও সাবাহ নামের দুই শিশুর সঙ্গে। বিকেলে হাঁটতে গেলে ওদের সঙ্গে বসে গল্প হতো। তাদের দিবেহি ভাষার কিছু শব্দও তাঁরা আমাদের শিখিয়েছে। রাতে রিসোর্টেই ডিনার। আবার সমুদ্রের পারে গিয়ে বসা। তবে রাতে আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল হোয়াইট রিফ শার্ক আর স্টিং রে। রিসোর্টের রেস্তরাঁর সামনের বাতি সমুদ্রে গিয়ে পড়ে, রাত হলেই সেখানে ঘুরে বেড়ায় হোয়াইট রিফ শার্ক আর স্টিং রে। সেই সঙ্গে ছোট ছোট অসংখ্য মাছের ঝাঁক। এই প্রকৃতির অ্যাকুয়ারিয়ামের দিকে তাকিয়ে ঘণ্টা পার করে দেওয়া যায়।

default-image

ছয় রাত কেটে গেল এভাবেই। এর মধ্যে থার্টিফার্স্টও ছিল। আইন-কানুনে মালদ্বীপ বেশ কড়া মুসলিম দেশ। লোকাল আইল্যান্ডে বিধিনিষেধের কারণে থার্টিফার্স্ট খুব জমে না। পরদিন আমাদের ফিরে আসার পালা, গন্তব্য মালে।

যাওয়ার সময় মালে দেখা হয়নি। ফেরার পথ এক রাতের জন্য এখানে আসা। কোভিড টেস্ট করাতে হবে। ভ্রমণের উত্তেজনায় ভুলেই গিয়েছিলাম। হঠাৎ ভয় হলো: যদি পজিটিভ হয়! সকালে মালে এসে স্যাম্পল দিয়েছি, রাতে রেজাল্ট পাব। পজেটিভ হলে পরদিন ঢাকায় ফেরা নিশ্চিতভাবেই আটকে যাবে। ভাবলাম যা হওয়ার হবে, দিনটা আছে, মালে শহর ঘুরে দেখি। ঢাকা নিয়ে আমার আগ্রহের কারণে দেশের বাইরে গেলে যে কোনো শহরকে সব সময় ঢাকার সঙ্গে তুলনা করি। মালে ঘনবসতির শহর, ছোট শহর, জায়গার সংকট আছে, রাস্তা সরু, তবুও শৃঙ্খলা আছে। মানুষ নিয়ম মেনে চলে। শহরটি পরিচ্ছন্ন। মালে শহরে হাটি আর আমাদের এত ‘উন্নত’ ঢাকার জন্য আমার কষ্ট বাড়তে থাকে।

সন্ধ্যায় করোনার নেগেটিভ সনদ আমাদের স্বস্তি দেয়। সেই খুশিতে রাতে আবার মালে শহরে ঘুরতে বের হই। ঘুরতে ঘুরতে নৌ-ঘাটের কাছে একটি ফুড কোর্টে আসি। খোলা জায়গা। রাত তখন ১২টা। এত রাতেও জমজমাট। ছেলে মেয়েরা সময় কাটাচ্ছে। শহরটি কতটা নিরাপদ সেটা টের পাওয়া যায়। আবারও ভাবি আমাদের ঢাকায় কি এমন কল্পনা করা যায়!

জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন