বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

নারীপ্রধান পরিবার বেশি দরিদ্র

ইউনিসেফের সহায়তায় ‘সিলেট বিভাগের চা–বাগানের নারী ও শিশুদের সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা জোরদারে করণীয়’ শীর্ষক একটি গবেষণা পরিচালনা করেছে রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র‌্যাপিড)। এ–বিষয়ক একটি প্রতিবেদন এ বছরের মার্চে প্রকাশ করেছে তারা। দেশে চা–কর্মীর সংখ্যা ১ লাখ ৪০ হাজার। এর মধ্যে অস্থায়ী কর্মী ৩৬ হাজার। মোট চা–কর্মীর ৫০ শতাংশ নারী। দেশে নিবন্ধিত চা–বাগানের সংখ্যা ১৬৬। এর মধ্যে সিলেট বিভাগেই আছে ১৩৫টি, যার মধ্যে ৩৫টি বাগানের দুই হাজারের বেশি চা–কর্মী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেছে র‌্যাপিড। প্রতিবেদন বলছে, ৬১ শতাংশ চা–কর্মী ও তাঁদের পরিবার দরিদ্র, যা জাতীয় দারিদ্র্য হারের ৩ গুণ বেশি। চা–বাগানে চরম দারিদ্র্যের হার প্রায় ৪৩ শতাংশ। আবার পুরুষপ্রধান পরিবারে চরম দারিদ্র্যের হার ৪২ শতাংশ হলেও নারীপ্রধান পরিবারে এ হার ৪৭ শতাংশ।

গবেষণার সঙ্গে সম্পৃক্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক আবু ইউসুফ বলেন, ‘চা–বাগানের পুরুষদের অনেকে এই কাজের ফাঁকে অন্য কাজ করে বাড়তি উপার্জন করেন। নারীরা চা–বাগানের কাজের পর সংসারের কাজ ও সন্তান দেখভালের জন্য বাড়তি কিছু করতে পারেন না। ফলে স্বল্প আয়েই তাঁদের চলতে হয়।’ তিনি জানান, স্থায়ী কর্মীদের চেয়ে অস্থায়ী কর্মীদের অবস্থা আরও নাজুক। স্থায়ী কর্মীরা রেশন বাবদ সপ্তাহে তিন কেজি আটা বা চাল আড়াই টাকা কেজি দরে কিনতে পারেন। থাকার জন্য ঘর পান, বাগানের স্কুলে বিনা মূল্যে শিশুদের পড়ানো ও সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা পান। সপ্তাহে এক দিন ছুটি পান। অস্থায়ী কর্মীরা এসব সুবিধার কোনোটিই পান না।

চা–কর্মী ভাসানী কালিন্দী বললেন, যখন পাতা তোলার মৌসুম থাকে না, তখন বাগানের আগাছা পরিষ্কার বা অফিস ঝাড়পোঁছ করেন। মজুরি ওই একই। সংসারে দুই শিশুপুত্র শ্যামল ও রাজ। বাগানের মালিকপক্ষের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত স্কুলে চতুর্থ ও প্রথম শ্রেণিতে পড়ছে তারা। বাগান থেকে বরাদ্দ পাওয়া তাঁর বাড়িটি আঙুল দিয়ে দেখিয়ে ভাসানী বললেন, পাতা তোলার জন্য কাজের জায়গায় হেঁটে আসতে তাঁর আধঘণ্টা লাগে।

অপুষ্ট দেহ, অস্বাস্থ্যকর বাস

১ হাজার ২০০ একরের চা–বাগানটিতে ভাসানীর চেয়ে কয়েক কিলোমিটার দূরত্বে কাজ করেন আলন্তী ১। আলন্তী নামে আরও একজন নারী কর্মী থাকায় তাঁকে নম্বর দিয়ে আলাদা করা হয়েছে। পুরো নাম আলন্তী কল (৫০)। পাতা তোলার ফাঁকে কথা বলতে প্রচণ্ড অনীহা প্রকাশ করছিলেন শীর্ণ গড়নের আলন্তী। প্রচণ্ড রোদ আড়াল করতে মাথায় ভাঁজ করে রাখা কাপড়ের পরত। এর ওপরে চা–পাতা রাখার বড় ঝোলা পিঠ বেয়ে নেমে গেছে। জানালেন, তাঁর স্বামীও চা–পাতা তোলেন। তিন ছেলেমেয়ে। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। মেয়েরা তাঁর মতো চা–কর্মী হোক চাননি, তাই বিয়ে দিয়েছেন বাগানের বাইরে।

স্বাস্থ্য এত খারাপ কেন? আলন্তীর হয়ে পাশ থেকে খেদের সুরে প্রশ্নের জবাব দিলেন মীনা কর নামের আরেক কর্মী, ‘আমরা সারা দিন চা–বাগানে কাজ করি। এখানে যেমন থাকার তেমনই আছি। আমাদের স্বাস্থ্য এমনই।’

দারিদ্র্য প্রান্তিক নারীদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে কতটা কোণঠাসা করতে পারে, তার একেকটি উদাহরণ যেন ভাসানী, আলন্তীরা। র‍্যাপিডের গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, ২০ শতাংশ পরিবার এখনো উন্মুক্ত স্থানে মলমূত্র ত্যাগ করে। কর্মস্থল থেকে বাড়ি কয়েক কিলোমিটার দূরে। আবার বাগানের ভেতর শৌচাগার না থাকায় কাজের সময়ে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার প্রয়োজন হলে খোলা স্থানেই সারতে হয়। কেউ কেউ চেপে রাখেন। মাসিকের দিনগুলোতে দীর্ঘ সময় ন্যাকড়া পরিবর্তন না করেই থাকতে হয়।

শ্রীমঙ্গলের একটি বাগানের কর্মী মণি রায় (৩৭)। তাঁর সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হয়েছিল। ১৪ বছর বয়সে মা-বাবার সঙ্গে প্রথম চা–পাতা তোলা শুরু করেন। আপন রায়ের সঙ্গে বিয়ে হয়ে ভিন্ন বাগানে আসেন। শ্বশুরবাড়ির মোট আটজন চা–কর্মী। তবে মণিদের অবস্থা অন্যদের চেয়ে নাজুক। কারণ, তাঁরা অস্থায়ী কর্মী। মণি রায় বললেন, শাশুড়ির মৃত্যুর পর তাঁর স্থায়ী কাজটি পেয়েছেন বড় জা। বছরে ১০ জনের মতো কর্মী স্থায়ী হওয়ার সুযোগ পান। কিন্তু ১৪ বছর ধরে বাগানে কাজ করেও তিনি বা তাঁর স্বামী স্থায়ী হতে পারছেন না। অস্থায়ী হওয়ার কারণে অন্যদের চেয়ে ভোগান্তি তাঁর বেশি। বললেন, বাগানের স্থায়ী এক কর্মীর ঘরের পাশে কোনোরকমে এক কক্ষের একটি ঘর তুলেছেন। এক কক্ষেই স্বামী ও ১৫, ১০ ও ৫ বছর বয়সী তিন মেয়েকে নিয়ে বাস করেন। স্থায়ী কর্মীরা তাঁদের শৌচাগার ব্যবহার করতে দেন না। বাধ্য হয়ে বাগানের ভেতর খোলা জায়গায় কাজটা সারেন তাঁরা। ২০ মিনিট পথ হেঁটে খাবার পানি সংগ্রহ করেন। কাজে যাওয়ার সময় দুপুরে খাবারের জন্য আটার রুটি ও আলু সেদ্ধ নিয়ে যান। খাবার আগে আগে সেই আলু ডলে ভর্তা করে নেন। কাজের ফাঁকে সতেজ থাকার জন্য চা বানিয়ে ঠান্ডা করে বোতলে নিয়ে যান। আয়ের কথা বলতে গিয়ে বললেন, মৌসুমে সপ্তাহে ১ হাজার ৫০০ টাকা মজুরি পান। তবে এখন পাতা যথেষ্ট নেই, অল্প তুলতে পারেন। মজুরি পান সপ্তাহে ৭০০ টাকা।

সাত মাসের গর্ভ নষ্ট হওয়ার মাস দুয়েক পরই আবার সন্তান ধারণ করেন আরেক চা–বাগানের কর্মী রুনু ভূমির স্ত্রী সুমিতা ভূমি। পুষ্টি আর সুচিকিৎসার অভাবে দুর্বল দেহ আরও দুর্বল। সুমিতা মুঠোফোনে বললেন, এখন তাঁর গর্ভের সন্তানের বয়স আট মাস। তাঁর স্বামী অস্থায়ী কর্মী, তাই বাগানের ভেতরের বিনা মূল্যের চিকিৎসাসুবিধা তিনি পাননি। যতটুকু পেরেছেন, নিজের অর্থে বাগানের বাইরে চিকিৎসা করেছেন।

হাসপাতাল, চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত ধাত্রীসেবা, আট সপ্তাহের মাতৃত্বকালীন ছুটি প্রভৃতি সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে নারী কর্মীদের স্বাস্থ্যসেবার দিকে বিশেষ নজর রাখা হয়েছে বলে এক অনুষ্ঠানে জানান চা–বাগানমালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) চেয়ারম্যান শাহ আলম। তিনি বলেন, কর্মী ছাড়া চা–বাগান চলবে না। সেটি বিবেচনায় রেখেই মালিকেরা কর্মীদের দেখাশোনা করেন।

প্রান্তিক হয়েও সুরক্ষা কর্মসূচির বাইরে

প্রান্তিক জনগোষ্ঠী হয়েও চা–বাগানের কর্মীদের বড় একটা অংশ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বাইরে থেকে যাচ্ছে। র‍্যাপিডের গবেষণা প্রতিবেদন অনুসারে, জাতীয় পর্যায়ে ২৮ শতাংশ পরিবার সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির অন্তত একটির আওতায় থাকলেও চা–বাগানের ১২ শতাংশের কম কর্মী এর আওতায় আছেন। অন্তঃসত্ত্বা মা ও দুগ্ধদানকারী মায়েদের সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় রয়েছেন চা–বাগানের মাত্র ১২ শতাংশ মা। মাতৃত্বকালীন ভাতা ও কর্মজীবী দুগ্ধদানকারী মায়েদের ভাতা একীভূত করে ‘মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি’ বাস্তবায়ন করছে মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর। গর্ভধারণ ও শিশু জন্মের পর পর্যন্ত এক হাজার দিন পর্যন্ত ওই মায়েদের মাসে ৮০০ টাকা করে দেওয়া হয়।

তবে শর্ত পূরণ করতে না পারায় বেশির ভাগ চা–কর্মী এ কর্মসূচির সুবিধা ভোগ করতে পারেন না, জানিয়েছেন র‍্যাপিডের চেয়ারম্যান আবদুর রাজ্জাক। তিনি বলেন, চা–বাগানের মেয়েদের বাল্যবিবাহ হয় এবং বেশির ভাগেরই দুইয়ের অধিক সন্তান, যা এ ভাতার শর্তবিরোধী। চা–বাগানের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত স্কুলের শিক্ষার্থীরা সরকারের শিশুশিক্ষা উপবৃত্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অনেক বাগান ঠিকঠাক মাতৃত্বকালীন ছুটি দেয়। তবে অনেক বাগানের ব্যবস্থাপনা তত ভালো নয়। ফলে চাকরি হারানোর ভয়ে অনেক নারী কর্মী মাতৃত্বকালীন ছুটি নেন না। চা–বাগানের কর্মীদের জীবনমান উন্নয়নে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক কর্মসূচির আওতা আরও বাড়ানোর সুপারিশ করেন তিনি।

চা–বাগানের নারী ও শিশুদের প্রতি সরকারের নজর রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ চা বোর্ডের সদস্য (অর্থ ও বাণিজ্য) যুগ্ম সচিব নাজনীন কাউসার চৌধুরী। তিনি বলেন, ২৪ কেজি চা–পাতা তোলার জন্য একজন কর্মী দৈনিক ১২০ টাকা পান। তবে মৌসুমে একজন কর্মী বেশি চা পাতা তুলতে পারেন এবং দৈনিক ৫০০ টাকা পর্যন্তও মজুরি পান। চা-বাগানে ‘মাদার্স ক্লাব’ আছে। এর মাধ্যমে মা ও শিশু স্বাস্থ্য, নারীর প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়।

জীবনযাপন থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন