জিয়ার জয়যাত্রা

সেরাঙ্গুনে বাঙালি ট্রাভেল এজেন্টের কাছে জানতে চাইলাম, সিঙ্গাপুর থেকে ঢাকায় মৃতদেহ নেওয়া যায় কী করে? তরুণ কর্মচারী খুব মনোযোগ দিয়ে কী যেন লিখছিলেন। আমার কথা শুনে চমকে গেলেন। মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কে, কে মারা গেছে?’
বললাম, ‘না, কারও মৃত্যু হয়নি।’
এবার তাঁর অবাক হওয়ার পালা। আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত ভালো করে দেখে নিলেন। তারপর খুব শান্ত গলায় বললেন, ‘তাহলে এসব নিয়ে কেন ভাবছেন?’
তাঁর কথা শুনে বের হয়ে আসি। মোস্তফা সেন্টারের দিক থেকে গরম বাতাসের ঝাপটা এসে মুখে লাগে। চুলগুলো সেই বাতাসে এলোমেলো হয়ে যায়। নিজেকে উদ্ভ্রান্তের মতো লাগে। ঘাড়ের পেছনে ব্যথা করছে। মনে হয় রক্তচাপ বেড়ে গেছে। আনমনে হাঁটতে থাকি সিটি স্কয়ারের দিকে। ভূতলের টিউব স্টেশন (এমআরটি) ‘ফেরার পার্ক’। সেখান থেকে ট্রেনে করে ‘দবিঘট’। তারপর ৭ নম্বর বাসে ‘নেপিয়ার স্টেশন’। এর উল্টো দিকেই গ্লেনইগলস হাসপাতাল—পার্কওয়ে গ্রুপের বিশেষায়িত হাসপাতাল।

সিঙ্গাপুরে আশার আলো
ঝকঝকে ট্রেন। ছোটে চোখের নিমেষে। কিন্তু আমার পা যেন পাথর হয়ে গেছে। কোনো গতি নেই। হঠাৎ ফোন বেজে ওঠে। গ্লেনইগলস হাসপাতাল থেকে ফোন করেছেন বাঙালি চিকিৎসক তৌফিক ইসলাম। আমি যেন দ্রুত হাসপাতালে আসি। আমার ‘রোগীর’ অবস্থার উন্নতি হচ্ছে। জোরে একটা নিশ্বাস ছেড়ে ফোন রাখি। গলা ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করে। মনে হয় বৃষ্টি নেমেছে। আমার কান্না দেখে অবাক হয়ে যায় ট্রেনের মানুষ। পড়িমরি করে হাসপাতালে ছুটে আসি।
আইসিইউর স্বয়ংক্রিয় গেটের কাছে দাঁড়িয়ে মনোযোগ দিয়ে কী যেন দেখছিলেন গ্লেনইগলস হাসপাতালের নামকরা নিউরোসার্জন ত্রিমাতি লি। আমাকে দেখেই হাসিমুখে বললেন, ‘তোমার জন্য ভালো খবর আছে। জিয়া ইসলামের সবকিছু উন্নতির দিকে। প্রেশার একেবারেই স্বাভাবিক। মনে হচ্ছে তোমরা তাঁকে ফিরে পাবে।’

আমি ডাক্তারের মুখের দিকে তাকাই। যে লোকটি আগের দিনও বাঁচার আশা ক্ষীণ বলে জানিয়েছিলেন, আজ তিনি কী বললেন! আমার বুক থেকে পাথর নেমে যায়। মাটিতে বসে পড়তে ইচ্ছে করে। গলাটা শুকিয়ে যায়।

সিঙ্গাপুরে নেওয়ার পরও প্রথম আলোর প্রধান আলোকচিত্র সাংবাদিক জিয়া ইসলাম যে সুস্থ হয়ে উঠবেন, সেই আশাই ছেড়ে দিয়েছিলেন চিকিৎসকেরা। আমাকে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন মানসিক প্রস্তুতি নিতে। অজানা আশঙ্কায় ট্রাভেল এজেন্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করছিলাম।
দুঃসহ অস্থির সেই রাত
জিয়ার জীবন নিয়ে অনিশ্চয়তা শুরু হয়েছিল ঢাকা থেকেই। ৯ জানুয়ারি রাত সাড়ে ১১টার পর জিয়াকে ধাক্কা দিয়েছিল একটি প্রাইভেট কার। মামলায় অভিযোগ করা হয়, ওই গাড়িটি চালাচ্ছিলেন একজন মডেল। সে রাতে তখন সবে অফিস থেকে ফিরে খাবার টেবিলে বসেছি। ফোন এল পরিচিত এক সাংবাদিকের। জিয়া দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন, তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে। একটু দানাপানি মুখে পুরেই ছুটলাম ঢাকা মেডিকেলে। ছুটে গেলেন অফিসের অনেক সহকর্মী আর জিয়ার বন্ধু-স্বজনেরা। রাতভর অনেক মানুষ ঢাকা মেডিকেলের আইসিইউর সামনে। জরুরি রক্ত দেওয়ার জন্য লাইন পড়ে যায়। সবার চাওয়া—যে করে হোক, জিয়াকে বাঁচাতে হবে।
রাত পেরিয়ে সকাল হতেই জিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছিল। কোনো কিছুই করতে পারছিলেন না চিকিৎসকেরা। মাথায় রক্তক্ষরণ হচ্ছে। দ্রুত অপারেশন করতে হবে। আমরা রাতভর রাজধানীর নামকরা কয়েকটি হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। কিন্তু অবস্থা শুনে কেউ রাজি হলেন না। এক হাসপাতাল মুখের ওপর জানিয়ে দিল, তাদের কোনো শয্যা খালি নেই। অবশেষে ঢাকা মেডিকেল থেকে নেওয়া হলো অ্যাপোলো হাসপাতালে।
১০ জানুয়ারি ছিল একটি রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি। ঢাকা মেডিকেল এলাকার রাস্তায় ব্যারিকেড। কিন্তু জিয়ার কথা শুনে ব্যারিকেড তুলে পথ করে দিলেন পুলিশ কর্মকর্তারা। শত শত মোটরসাইকেল আর গাড়ির বহর নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছাল অ্যাপোলো হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসকেরা মাথায় অপারেশন করলেন কিন্তু কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারলেন না। উৎকণ্ঠা আরও বেড়ে গেল।

যখন আমরা জিয়াকে নিয়ে হাসপাতালের পথে, প্রথম আলো সম্পাদক তখন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে। সেখানে বসেই তিনি জ্যেষ্ঠ কর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করলেন। ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হলো, উন্নত চিকিৎসার জন্য যা যা দরকার করতে হবে। স্থির হলো জিয়াকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হবে। পার্কওয়ে গ্রুপের বাংলাদেশি পরিচালক জাহিদ হাসান খান এগিয়ে এলেন। ব্যবস্থা হলো ঝোড়ো গতিতে। ১৩ জানুয়ারি সিঙ্গাপুর থেকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে উড়ে এলেন ডাক্তার শাহরিল আর সিস্টার জুবাইদা বিনতে জুরি।

উৎকণ্ঠা আর অপেক্ষা
অ্যাপোলোতে নেওয়ার পর আমাদের কিছুই করার ছিল না। আমরা সবাই দল বেঁধে হাসপাতালের লবিতে গিয়ে গভীর বেদনা নিয়ে বসে থাকতাম। রাতে পালা করে হাসপাতালে থাকতেন আমাদের আলোকচিত্র সাংবাদিকেরা। ডাক্তারদের সঙ্গে যোগাযোগ যা করার সব করতেন ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটের আবাসিক সার্জন হোসাইন ইমাম ও আমাদের সহকর্মী শিশির মোড়ল। দুর্ঘটনার পর থেকে শুরু করে বিমানবন্দরে নেওয়া পর্যন্ত জিয়ার সঙ্গে প্রায় সব সময়ই ছিলেন হোসাইন ইমাম। ট্রান্সকম গ্রুপের চেয়ারম্যান লতিফুর রহমান একদিন হাসপাতালে এলেন। গ্রুপের আরেক পরিচালক সিমিন হোসেন এলেন ছেলে যারেফ আয়াত হোসেনকে সঙ্গে নিয়ে। লতিফুর রহমান জিয়ার স্ত্রী সুমাইয়া খানের মাথায় হাত রেখে সস্নেহে বললেন, ‘আমার মেয়ের জন্য যা করতাম, তোমার জন্যও তার সবই করব।’
১২ জানুয়ারি বিকেলে ফোন এল সহযোগী সম্পাদক আনিসুল হকের। বললেন, জিয়ার সঙ্গে সিঙ্গাপুরে যেতে হবে। সম্পাদক সেদিন হাসপাতাল ছেড়ে বাসায় এলেন। সেই অবস্থায় বাসায় ডেকে নিয়ে সব বুঝিয়ে দিলেন, কী কী করতে হবে। ব্যবস্থাপনা সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ পুরো প্রক্রিয়াটি দেখভাল করলেন।
১৩ জানুয়ারি রাতে পাখির মতো একটি ছোট বিমানে করে জিয়াকে নিয়ে উড়াল দিলাম সিঙ্গাপুরে।

যেনউড়ন্ত আইসিইউ
বিমানে বসে সিস্টার জুবাইদা বিনতে জুরি আমার পরিচয় জানতে চাইলেন। সহকর্মী বলতেই খুব অবাক হয়ে গেলেন। বললেন, মানুষের ভালোবাসা পাওয়া এ রকম রোগী জীবনে দেখেননি। হাসপাতালে ছিল মানুষের ভিড়। গাড়ি আর মোটরবাইক তাঁকে পাহারা দিয়ে যেভাবে হাসপাতাল থেকে বিমানবন্দরে এনেছে, সেটা দেখে তিনি বিস্মিত। জুরি বললেন, তিনি সবার চোখে পানি দেখেছেন। ১৬ বছরের চাকরি জীবনে এটা তাঁর নতুন অভিজ্ঞতা।

এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ভ্রমণ করার অভিজ্ঞতা আমার এটাই প্রথম। বিমানের ভেতরটা দেখতে অনেকটা ছোট আকারের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) মতো। ভেতরে আসন মাত্র পাঁচটি। তার সঙ্গে নানা ধরনের যন্ত্রপাতি লাগানো। সামনের সারিতে বসেছেন জুরি, তাঁর কোলের কাছে ছোট আকারের দুটি মনিটর। ডাক্তার শাহরিল বসেছেন জিয়ার পায়ের কাছের আসনে, তাঁর হাতে আরও দুটি মনিটর। আমি পেছনের সিটে। ঢাকা থেকে ওড়ার ২৫ থেকে ৩০ মিনিট পরই যন্ত্রপাতি থেকে নানা ধরনের শব্দ আসা শুরু হলো। আমি ডাক্তার আর সিস্টারের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি তাঁদের মুখ শুকনো। কী ব্যাপার জানতে চাইলে জুরি বললেন, ‘রোগীর অবস্থা খুব খারাপ। প্রেশার নেমে যাচ্ছে। কী হবে বুঝে উঠতে পারছি না। ডাক্তার শাহরিলও খুব উদ্বিগ্ন।’ কিন্তু আমাকে অভয় দিয়ে বললেন, ‘এটা কোনো ব্যাপার না। তুমি স্বাভাবিক থাকো।’ প্রায় দুই ঘণ্টা এভাবে চলে গেল। অবশেষে রক্তচাপ স্বাভাবিক হতে শুরু করল। চার ঘণ্টায় আমরা পৌঁছালাম সিঙ্গাপুরে।
সিঙ্গাপুরে সাধারণ যাত্রীরা যে পথে ইমিগ্রেশন পার হন, সেসব ধরাবাঁধা আনুষ্ঠানিকতা কিছুই করতে হয় না এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের যাত্রী ও রোগীকে। বিমান থেকে নামার আগেই অ্যাম্বুলেন্স এসে দাঁড়িয়ে থাকে রানওয়েতে। ইমিগ্রেশন শেষ হয় দু-তিন মিনিটে। সব শেষ করে ঝড়ের গতিতে আমরা যখন গ্লেনইগলস হাসপাতালে পৌঁছালাম, তখন রাত তিনটা।

বিদেশি রোগীর আলাদা রেজিস্ট্রেশন। রাতে হাসপাতালে একজন মাত্র নারী কর্মী এসব করছেন। তিনি জানতে চাইলেন, রোগী আমার কে? সহকর্মী বলতেই খুব অবাক হয়ে বললেন, কোনো অথরাইজেশন আছে? বললাম, না। তিনি বললেন, ‘সহকর্মী হলে অনেক দাপ্তরিক ঝামেলায় পড়তে হবে। ভিসাতেও জটিলতা হতে পারে। তুমি কি “ভাই” হতে পারো?’ সেই থেকে হাসপাতালের কাগজপত্রে আমি জিয়ার ভাই হয়ে গেলাম।
সিঙ্গাপুরে মেডিকেল বোর্ড
গ্লেনইগলস হাসপাতালের নিউরোসার্জন ত্রিমাতি লির অধীনে ভর্তি ছিলেন জিয়া। লি একা কুলিয়ে উঠতে পারছিলেন না। একদিন পর বললেন, তিনি সিঙ্গাপুরের বড় বড় ডাক্তারদের নিয়ে বোর্ড করতে চান। এর জন্য অনুমতি লাগবে। এর সঙ্গে খরচের বিষয়টিও জড়িত। ফোন দিলাম প্রথম আলো সম্পাদককে। সব শুনে তিনি বললেন, ‘জিয়াকে বাঁচানোর জন্য যা যা দরকার তা–ই করেন।’
শুরু হলো বোর্ড করে জিয়ার চিকিৎসা। ডাক্তার ধরম সিং, জেমস লি, অং সিন উই, ফং কি সুই, সোফি চোয়া আর বাংলাদেশি তৌফিক ইসলাম যুক্ত হলেন দলে। ১০ দিনের মাথায় জিয়ার শারীরিক অবস্থা বিপদমুক্ত ঘোষণা করা হলো। কিন্তু তখনো তাঁকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হতো। জিয়া চোখ মেলে তাকালেন ১৫ দিন পরে। ডাক্তার বললেন, ‘পেশেন্ট ইজ আ গুড ফাইটার। ইমপ্রুভিং অল (রোগী একজন লড়াকু। অবস্থার উন্নতি হচ্ছে)।
হাসপাতালে মুমূর্ষু রোগীর স্বজনদের অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। গ্লেনইগলস হাসপাতালের লবিতে বসে অপেক্ষা করতে করতে আমার কেটেছে ১৭ দিন। ক্যালেন্ডারের হিসাবে হয়তো ১৭ দিন কিছুই নয়। কিন্তু মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন—এমন একজন মানুষের বেঁচে ওঠার জন্য এই প্রতীক্ষা কেবল দীর্ঘই নয়, বড়ই কঠিন। কিন্তু আরও কঠিন প্রতীক্ষায় ছিলেন জিয়ার স্ত্রী সুমাইয়া খান। মুহূর্তের খবর চলে যেত তাঁর ফোনে। অজানা আশঙ্কায় দুই চোখের পাতা এক করতে পারতেন না তিনি। গভীর রাতে টেক্সট করে জানতে চাইতেন অবস্থা কী? জিয়ার বড় ভাই রায়হানুল ইসলাম ফোন করেই কেঁদে ফেলতেন। আমার ভাই বাঁচবে তো? আমি প্রায়ই ডাক্তার ইসলামের উদাহরণ দিতাম। তিনি বলতেন, গ্লেনইগলস হাসপাতালে মৃত মানুষ এসে হেঁটে বেরিয়ে যায়।’

চোখ ভিজে যায়
হাসপাতালে যাঁরা জিয়াকে দেখতে আসতেন, তাঁরা বের হতেন ভেজা চোখ নিয়ে। বাংলাদেশে ক্যাননের পরিবেশক আবদুল্লাহ এইচ কাফি একদিন হাসপাতালে এসে নিজেকে সামলে নিতে পারেননি। আমাদের সাবেক সহকর্মী সাইফুল আজিমের শ্বশুর-শাশুড়ি এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন। সিঙ্গাপুরপ্রবাসী রেজাউল আলম নিয়মিত খোঁজ নিতেন। জিয়ার ফুফাতো বোন শিখা, তাঁর স্বামী মাহফুজ আর স্ত্রীর চাচাতো ভাই কামরুল খান হাসপাতালে এসে আইসিইউর কাচের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে চোখের পানি ফেলতেন। প্রথম আলো সম্পাদক একবার জিয়াকে দেখতে গিয়ে নিজেকে সামলে নিতে পারেননি। একটি অসাড় দেহ মিশে আছে বিছানার সঙ্গে, প্রাণচঞ্চল জিয়ার সঙ্গে এ দৃশ্য কেউ মেলাতে পারেন না। ১৭ দিন অবস্থানের পর আমি চলে আসি ঢাকায়। জিয়ার দেখাশোনার দায়িত্ব নেন তাঁর স্বজনেরা। একে একে যান জিয়ার শ্যালক খালেকুজ্জামান খান, ভাই রায়হানুল ইসলাম এবং ৪ মার্চ সিঙ্গাপুর যান জিয়ার স্ত্রী সুমাইয়া খান। তবে ঢাকায় ফিরেও সিঙ্গাপুরের সঙ্গে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে প্রতিদিন যোগাযোগ অব্যাহত রাখি।
কতকাণ্ড!
জিয়াকে সিঙ্গাপুরে নেওয়ার সময় তাঁর মাথার খুলির খুব ছোট একটি অংশ ঢাকার অ্যাপোলো হাসপাতালে রাখা ছিল। হাসপাতাল সেটা তাদের কাগজপত্রে জানিয়েছিল। সেই খুলি সিঙ্গাপুরে পাঠানো নিয়ে কতই না ঝক্কি–ঝামেলা হলো। সহকর্মী জসিম উদ্দিন ও পল্লব মোহাইমেন আরেকটি এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে সেটা পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন। আরেক সহকর্মী খায়রুল কবীর চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে গিয়ে তা এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে পৌঁছে দিলেন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম একদিন জানতে চাইলেন জিয়ার শারীরিক অবস্থার কথা। তিনি সিঙ্গাপুরের হাইকমিশনকে খোঁজখবর নিতে বললেন। এরপর হাইকমিশনার মোস্তাফিজুর রহমান কয়েকবার নিজে এলেন জিয়াকে দেখতে। একজন প্রটোকল অফিসার রোজ খোঁজ নিতেন। সিঙ্গাপুরের স্বাস্থ্য দপ্তর থেকে খোঁজ নেওয়া হলো জিয়ার ব্যাপারে। জিয়া হয়ে গেলেন হাসপাতালের ভিআইপি রোগী।
হাসপাতাল ছাড়ার সময়ও জিয়া সেই মর্যাদা পেয়েছেন। হাসপাতালের সব কর্মী তাঁকে বিদায় জানিয়েছেন উপহার দিয়ে। দামি গাড়িতে করে তাঁকে বিমানবন্দরের ভিআইপি টার্মিনালে আনা হয়েছে। পার্কওয়ের কর্মীরা তাঁকে বিমানে তুলে দিয়েছেন।
মৃত্যুঞ্জয়ীর ফিরে আসা
আড়াই মাস পর ২৮ মার্চ সন্ধ্যায় ঢাকার মাটিতে নামেন জিয়া। ইমিগ্রেশন লাইনের আগে হুইলচেয়ারে বসা জিয়া আমাকে দেখেই হাউমাউ করে কেঁদে ফেললেন। সঙ্গে স্ত্রী ও বড় ভাইও। আমি সান্ত্বনা দিই। চার ঘণ্টার ভ্রমণক্লান্তিতে অবসন্ন শরীর। কিন্তু বিমানবন্দরে নেমেই গোঁ ধরলেন, প্রিয় প্রথম আলোতে একটু উঁকি না দিয়ে বাড়িতে যাবেন না। গাড়িতে বসে অনেক বোঝানো হলো। জিয়া অনড়। অবশেষে জিয়াকে বহন করা মাইক্রোবাসটি এসে থামল প্রথম আলোর সামনে। গাড়ির দরজা খুলতেই বয়ে গেল আবেগের একটা ঢেউ। অনেক দিন পর প্রিয় সহকর্মীদের দেখে জিয়ার চোখে আলো খেলে গেল। পরক্ষণেই সেখানে অশ্রুধারা। সবার সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন আর অস্ফুটে বলছেন, ‘আমি ফিরে এসেছি। আমি ফিরে এসেছি।’ হুইলচেয়ারটা ভেতরে ঢুকতেই করতালি দিয়ে জিয়াকে স্বাগত জানালেন সবাই। কারও মুখে কোনো ভাষা নেই। আবেগের ঢেউ আবার ভাসিয়ে নিয়ে গেল তাঁকে।
আমার মনে পড়ে ডাক্তার তৌফিক ইসলামের কথা। জিয়ার অসাড় দেহের সঙ্গে লাগানো আধুনিক যন্ত্রপাতিগুলো দেখিয়ে তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘যতক্ষণ প্রাণ আছে লড়ে যাব।’
আসলে প্রাণই এক আশ্চর্য সম্পদ, ক্ষয়হীন আশা, মৃত্যুহীন মর্যাদা।