জীবদ্দশায় যাঁরা বাংলাদেশের ডাকটিকিটে

বাংলাদেশের ডাকটিকিটে সাধারণত জীবিত ব্যক্তিকে বিষয় করা হয় না। ভারত, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অনেক দেশের ডাক বিভাগই জীবিতদের ডাকটিকিট প্রকাশ না করার এ রীতি দীর্ঘদিন ধরে অনুসরণ করেছে বা করছে। যেসব দেশে এখনো রাজতন্ত্র রয়েছে, সেসব দেশে ডাক প্রকাশনায় জীবিত রাজা-রানির প্রতিকৃতি দেখা যায়। তার নজির মিলবে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে উপমহাদেশে প্রচলিত ডাকটিকিটে। পাকিস্তান আমলের ডাকটিকিটে স্বৈরশাসক মুহাম্মদ আইয়ুব খান এবং কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিষয় হয়েছিলেন তাঁদের জীবদ্দশাতেই।

অবশ্য, সামরিক স্বৈরাচার জেনারেল মুহাম্মদ আইয়ুব খান নির্লজ্জ রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ থেকে নিজেকে ডাকটিকিটে নিয়ে এলেও কবি নজরুলকে ডাকটিকিটে বিষয় করা হয়েছিল মূলত ভারতের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার জের ধরে। উর্দু ভাষার কবি মির্জা গালিবকে (১৭৯৭-১৮৬৯) নিয়ে ভারত ডাকটিকিট প্রকাশ করায় সে সময়ে ভারতে বসবাসরত বাকরুদ্ধ কবি নজরুলকে (১৮৯৯-১৯৭৬) নিয়ে ১৯৬৮ সালে আকস্মিকভাবেই ডাকটিকিট প্রকাশ করে পাকিস্তান।

শেখ মুজিবুর রহমান

১৯৭১ সালের ২৯ জুলাই প্রবাসী ‘মুজিবনগর সরকার’ প্রকাশিত বাংলাদেশের প্রথম ডাকটিকিটগুলোর একটিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
১৯৭১ সালের ২৯ জুলাই প্রবাসী ‘মুজিবনগর সরকার’ প্রকাশিত বাংলাদেশের প্রথম ডাকটিকিটগুলোর একটিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

১৯৭১ সালের ২৯ জুলাই বাংলাদেশের ‘প্রবাসী মুজিবনগর সরকার’ কর্তৃক প্রকাশিত বাংলাদেশের প্রথম আটটি ডাকটিকিটের মধ্যে একটি ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। তিনি তখন পশ্চিম পাকিস্তানে কারাবন্দী। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর, ২০ ডিসেম্বর ‘BANGLADESH LIBERATED’ বা ‘বাংলাদেশের মুক্তি’ কথাটি সেই ডাকটিকিটগুলোতে ‘অতি ছাপ’ দেওয়া হয়। পরের বছর মহান ভাষা আন্দোলনকে বিষয় করে প্রকাশ হয় স্বাধীন বাংলাদেশের নিজস্ব নকশায় প্রথম ডাকটিকিট। নতুন রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ক্ষমতায় বহাল থাকলেও কোনো ডাকটিকিটে জীবদ্দশায় নিজেকে উপস্থাপন করে যাননি।

ব্রিটিশ রাজপরিবার

ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের সিংহাসনে আসীন হওয়ার ২৫তম বার্ষিকীতে (১৯৭৭) বাংলাদেশ ডাক বিভাগ প্রকাশিত তিনটি ডাকটিকিটের একটি।
ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের সিংহাসনে আসীন হওয়ার ২৫তম বার্ষিকীতে (১৯৭৭) বাংলাদেশ ডাক বিভাগ প্রকাশিত তিনটি ডাকটিকিটের একটি।


ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের সিংহাসনে আসীন হওয়ার ২৫তম বার্ষিকীতে (১৯৭৭) বাংলাদেশ ডাক বিভাগ তিনটি ডাকটিকিট ও একটি স্মারক পাতা (স্যুভেনির শিট) প্রকাশ করে। পরের বছর ডাক বিভাগ আরও চারটি ডাকটিকিট ও একটি স্মারক পাতায় বিষয় করে ব্রিটিশ রাজপরিবারকে। ১৯৮১ সালে ‘রানি মাতা’র ৮০তম জন্মদিন উপলক্ষেও বাংলাদেশ দুটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে।

স্বাধীন বাংলাদেশের ডাকটিকিটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ব্রিটিশ রাজপরিবারের বাইরে এ দেশের চার ব্যক্তিত্বকে খুঁজে পাওয়া যায়, জীবিত অবস্থাতেই যাঁরা কোনো না-কোনোভাবে ডাকটিকিটে এসেছেন।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ

‘গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ প্রদানের প্রথম বার্ষিকী’ উপলক্ষে ১৯৮৭ সালে স্বৈরশাসক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের এ ডাকটিকিট প্রকাশ করে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ।
‘গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ প্রদানের প্রথম বার্ষিকী’ উপলক্ষে ১৯৮৭ সালে স্বৈরশাসক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের এ ডাকটিকিট প্রকাশ করে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ।

বলা হয়ে থাকে ডাকটিকিট বহির্বিশ্বে একটি দেশের কূটনীতিকের ভূমিকা পালন করে বা ওই দেশকে প্রতিনিধিত্ব করে। হয়তো এই সুযোগই নিতে চেয়েছিলেন সাবেক স্বৈরশাসক এরশাদ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বা পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান জীবদ্দশায় নিজের কোনো ডাকটিকিট প্রকাশ না করলেও রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে এরশাদই বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো এই রীতি ভাঙেন। ১৯৮৬ সালের বিতর্কিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরের বছর ওই ডাকটিকিটটি প্রকাশ করা হয়। ১৯৮৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর প্রকাশিত ১০ টাকা সমমূল্যের ওই স্মারক ডাকটিকিটে দেখা যায় তত্কালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ জাতীয় সংসদে ভাষণ দিচ্ছেন। কেউ কেউ হয়তো ডাকটিকিটটি দেখে থাকলেও ‘গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ প্রদানের প্রথম বার্ষিকী’ উপলক্ষে এরশাদের সেই ভাষণের চেয়ে সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে দেশব্যাপী তখন অনেক বেশি উচ্চারিত হয়েছিল ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ’।

খালেদা জিয়া

‘খাল খনন’ কর্মসূচি নিয়ে ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত ডাকটিকিট যুগলের একটিতে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।
‘খাল খনন’ কর্মসূচি নিয়ে ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত ডাকটিকিট যুগলের একটিতে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।


সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বাংলাদেশের ডাকটিকিটে সরাসরি বিষয় হিসেবে আসেননি। তবে, কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের ‘খাল খনন’ কর্মসূচি নিয়ে ১৯৯৩ সালের ৩১ মার্চ প্রকাশিত ডাকটিকিট যুগলের একটিতে তাঁর ছবি দেখা যায়। দুই টাকা মূল্যের এ ডাকটিকিটে দেখা যায় তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া একটি খাল কাটা কর্মসূচিতে গিয়ে নিজেও কোদাল হাতে শ্রমিকদের সঙ্গে খাল কাটছেন।

মুহাম্মদ ইউনূস

ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং গ্রামীণ ব্যাংকের নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রাপ্তি উপলক্ষে ২০০৭ সালে বাংলাদেশ ডাক বিভাগের স্মারক ডাকটিকিট।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং গ্রামীণ ব্যাংকের নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রাপ্তি উপলক্ষে ২০০৭ সালে বাংলাদেশ ডাক বিভাগের স্মারক ডাকটিকিট।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং গ্রামীণ ব্যাংকের ২০০৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রাপ্তি উপলক্ষে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ ২০০৭ সালের ২৯ আগস্ট একটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে। বাংলাদেশের ডাকটিকিটে এই প্রথম রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বাইরের কাউকে জীবদ্দশায় দেখা গেল।

১৯৭৯ সালে মাদার তেরেসার শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তিতেও ভারতীয় ডাক বিভাগ ১৯৮০ সালের ২৭ আগস্ট তাঁর জীবদ্দশায়ই তাঁকে নিয়ে ডাকটিকিট প্রকাশ করেছিল। আর ২০১৩ সালের ১৪ নভেম্বর ডাকটিকিটে নিজেকে দেখলেন শচীন টেন্ডুলকার।

শেখ হাসিনা

২০০৯ সালে বিশ্ব খাদ্য দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত ডাকটিকিটে বিষয় করা হয় তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশ্ব খাদ্য সংস্থার ‘সেরেস মেডেল’ প্রাপ্তি। ডাকটিকিটটি প্রকাশের এক দশক আগে তিনি ওই পদক পেয়েছিলেন।
২০০৯ সালে বিশ্ব খাদ্য দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত ডাকটিকিটে বিষয় করা হয় তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশ্ব খাদ্য সংস্থার ‘সেরেস মেডেল’ প্রাপ্তি। ডাকটিকিটটি প্রকাশের এক দশক আগে তিনি ওই পদক পেয়েছিলেন।


সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া যেমন পরোক্ষভাবে ডাকটিকিটে এসেছেন, তেমনি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এসেছেন পরোক্ষভাবেই। ১৯৯৯ সালে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘সেরেস মেডেল’ প্রদান করে বিশ্ব খাদ্য সংস্থা। কিন্তু এ বিষয়টিই ১০ বছর পর ডাকটিকিটে আসে। বিশ্ব খাদ্য দিবস-২০০৯ উপলক্ষে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ চারটি ডাকটিকিট প্রকাশ করে। এই সেটের প্রথম ডাকটিকিটে বিষয় হয়েছে বিশ্ব খাদ্য সংস্থার (এফএও) ‘সেরেস মেডেল’। এই মেডেলটিতে শেখ হাসিনার প্রতিকৃতি আঁকা রয়েছে। তিন টাকা সমমূল্যের এই ডাকটিকিটে লেখা হয়েছে ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ১৯৯৯ সালে দেওয়া সেরেস মেডেল’। বাংলাদেশের কোনো ডাকটিকিটে এই প্রথম সরকারপ্রধানের কথা এমন ‘লিখিতভাবে’ উপস্থাপন করা হয়।

বিশ্বের অনেক দেশই অবশ্য এখন জীবিতদের ডাকটিকিট প্রকাশ না করার এ রীতি থেকে বেরিয়ে আসছে। ডাকটিকিটে জীবদ্দশায়ই সম্মানিত করছে কীর্তিমানদের। অস্ট্রেলিয়া, গ্রিস, ব্রিটেনসহ বিশ্বের অনেক দেশই খেলাধুলা ও অন্যান্য ক্ষেত্রে অবদানের জন্য ডাকটিকিটে স্থান দিচ্ছে জীবিত ব্যক্তিদের।

সূত্র:
পোস্টেজ স্ট্যাম্পস অব বাংলাদেশ (২০০২-২০০৭), বাংলাদেশ ডাক বিভাগ, স্কট ২০০৭, স্ট্যান্ডার্ড পোস্টেজ স্ট্যাম্পস ক্যাটালগ, স্ট্যানলি গিবন্স স্ট্যাম্পস অব দ্য ওয়ার্ল্ড ক্যাটালগ (৪৫তম সংস্করণ), ফিফটি ইয়ার্স অব পাকিস্তান স্ট্যাম্পস, জাহেদি, করাচি